তার দিকে করুণ মমতা-ভরা চোখে তাকিয়ে একটি কালো মেয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে, মালবিকা তাকেও চিনতে পারলে! এই মেয়েটি সকালে ফুলের মুকুট ফুলের গয়না পরে মাচার ওপরে বসে ভয়ে থরথর করে কাঁপছিল। এখন তার আর সে মুকুট ও গয়না নেই, এখন তার সাজগোজ এখানকার অন্য অন্য মেয়েদেরই মতো!
একটুপরেই তার কারণও বুঝতে পারলে। তাকে উঠে বসতে দেখেই জনকয় লোক এসে তার মাথায় ফুলের মুকুট, গলায় ও হাতে ফুলের গয়না পরিয়ে দিলে।
পুরুত চিৎকার করে উঠল–হেডো মেডো গেডো!
অমনি কয়েকজন লোক এসে মালবিকাকে ধরে শূন্যে তুলে সেই উঁচু মাচার ওপরে গিয়ে উঠল। তারপর তাকে মাচার ওপরে বসিয়ে দিয়ে নীচে নেমে গেল! মাচার সিঁড়ির ধাপে-ধাপে অন্যান্য পুরোহিতেরা দাঁড়িয়ে উচ্চ স্বরে মন্ত্রপাঠ শুরু করে দিলে–গরিলাবেশে বারোজন লোক ঢাকের তালে-তালে তাণ্ডব নাচ নাচতে লাগল!…আজ সকালেও সে এইরকম দৃশ্য দেখে গিয়েছিল।
মালবিকার এখন আর কোনও ভয় হচ্ছে না–তার মন এখন দুঃখ-ভয়-ভাবনার বাইরে গিয়ে পড়েছে, মন্ত্রমুগ্ধ ও স্বরাচ্ছন্ন জীবের মতন মাচার ওপরে সে বসে রইল–সামনে মূর্তিমান যমকে দেখলেও বোধহয় এখন সে চমকে উঠবে না!
সেইখানে বসে বসে সে নির্বিকারভাবে দেখতে লাগল, খানিক তফাতে একদল লোক গিয়ে উচ্চ প্রাচীরের প্রকাণ্ড ফটকটা খুলে ফেললে সঙ্গে-সঙ্গে বড় বড় কসর ও ঝাঁঝরের আওয়াজে আকাশ-বাতাস পরিপূর্ণ হয়ে উঠল–ঢং, ঢং, ঢং, ঢং, ঢং।
কোনও পথ দিয়ে নিচেকার সমস্ত জনতা হইচই তুলে সেই দেড়শো ফুট উঁচু পাঁচিলের ওপরে গিয়ে উঠল–প্রত্যেকের হাতে এক-একটা মশাল–চারিদিকের দৃশ্য দিনের বেলার মতো স্পষ্ট।
রাজা হঠাৎ চেঁচিয়ে বললেন–কং! কং! কং! টাস্কো!
অমনি কয়েকজন যোদ্ধা এসে আবার মালবিকাকে মাচা থেকে তুলে নামিয়ে নিয়ে গেল এবং তারপর সেই প্রকাণ্ড ফটকের ভিতরে প্রবেশ করল।
ফটকের ভিতর ঢুকলে প্রথমেই নজরে পড়ে ছোটখাটো একটা প্রান্তর,তারপরেই যেদিকে তাকানো যায়–নিবিড় অরণ্য ও ভয়াবহ অন্ধকার এবং তারই ভিতর থেকে আকাশের দিকে উঠে গেছে সেই মড়ার মাথার খুলির মতো অদ্ভুত পাহাড়ের চূড়াটা।
প্রাচীরের ওপর থেকে বিপুল জনতা সমস্বরে মন্ত্রপাঠ করছে!–ঢাক বাজছে দুম দুম দুম দুম,কাঁসর-ঝাঁঝর গর্জন করছে ঘং ঘং ঘং ঘং!
প্রান্তরের ওপরেও একটা উঁচু পাথরের বেদিতার দু-ধারে বড় বড় থাম। যোদ্ধারা মালবিকাকে নিয়ে সেই বেদির ওপর গিয়ে উঠল এবং দুই থামের মাঝখানে তাকে দাঁড় করিয়ে থামের সঙ্গে তার দুই হাত বেঁধে দিলে। তারপর ভূতের ভয়ে লোকে যেমন করে পালায়, তেমনিভাবে সবাই আবার প্রাচীরের ওপারে পলায়ন করলে এবং সেইসঙ্গে সেই সুবৃহৎ ফটকটাও তাড়াতাড়ি বন্ধ হয়ে গেল।
পাহাড় ও অরণ্যের ভিতর থেকে একটা অত্যন্ত অস্বাভাবিক ও অপার্থিব মেঘ গর্জনের মতন গম্ভীর আওয়াজ জেগে উঠল!
প্রাচীরের ওপরে হাজার হাজার মশাল নাচিয়ে হাজার হাজার কণ্ঠে চিৎকার উঠল– কিং! কং! কং! কং! কং! কং!
মালবিকার প্রায়-মূৰ্ছিত দেহ তখন এলিয়ে পড়েছে নির্বাকভাবে, বিস্ফারিত নেত্রে সে দেখলে, জঙ্গলের গর্ভ থেকে অন্ধকারের চেয়ে কালো একটা ভয়ংকর ছায়া-দানব দুলতে-দুলতে এগিয়ে আসছে! কী বৃহৎ তার দেহ! যেন একটা চলন্ত পর্বত!
দানবটা পায়ে-পায়ে এগিয়ে এসে প্রাচীরের উপরের জনতার দিকে চেয়ে কয়েকবার ক্রুদ্ধ হুঙ্কার দান করলে! তারপর নিচু ও হেঁট হয়ে বেদির দিকে তাকিয়ে দেখতে লাগল।
তার চোখ দুটো ফুটবলের মতন বড় এবং তাদের ভিতর থেকে যেন আগুন ঠিকরে পড়ছে। তার এক-একটা দাঁত হাতির দাঁতের মতন লম্বা। তার এক-একখানা বাহু বটগাছের গুঁড়ির মতন মোটা। সেই বিভীষণ মূর্তি দেখে মালবিকা আর পারলে না–পরিত্রাহি চিৎকার করতে করতে একেবারে অজ্ঞান হয়ে গেল।
এই তাহলে কং–রাজা কং! এখানকার সমস্ত লোক এই বিরাট গরিলা-রাজার প্রজা! মালবিকা হবে আজ এই গরিলা-দানবের মানুষ-বউ!
কং যেন মালবিকাকে দেখে অত্যন্ত বিস্মিত হল। বৎসরে-বৎসরে সে অনেক বন্ধু উপহার পেয়েছে, কিন্তু তাদের গায়ের রং তো এই নতুন বউয়ের মতন ধবধবে সাদা নয়!
কং হাত বাড়িয়ে পট পট করে দড়ি ছিঁড়ে মালবিকাকে তুলে নিলে। মানুষের হাতে চড়ুই-পাখিকে যেমন দেখায়, কঙের হাতের মুঠোর ভিতরে মালবিকাকেও দেখাতে লাগল তেমনি ছোট্টটি।
হাতের মুঠোর মালবিকাকে নিয়ে কং আবার পর্বত ও অরণ্যের দিকে অগ্রসর হল– তখন ভোরের আলো ফুটে উঠেছে।
এমন সময়ে প্রাচীরের ওপার থেকে গুডুম গুডুম করে বন্দুকের আওয়াজ ও বহু কণ্ঠের আর্তনাদ জেগে উঠল এবং সঙ্গে সঙ্গে সেই সুবৃহৎ ফটক আবার খুলে গেল।
কং কিন্তু একবারও পিছন ফিরে চেয়ে দেখলে না, মস্ত এক লাফ মেরে পাহাড়ের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল!
.
সুবৃহৎ ফটকের ভিতর দিয়ে তিরের মতন বেগে প্রথমে শোভন, তারপর কাপ্তেন সাহেব, ডেনহাম ও নাবিকেরা সেই প্রান্তরের ওপরে এসে দাঁড়াল।
তাদের বন্দুকের গুলি খেয়ে প্রাচীরের ওপর থেকে ততক্ষণে মশালধারী অসভ্যগুলো কোথায় অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে।
শোভন সর্বপ্রথমে এসেছিল বলে কেবল সেই-ই কঙের বিরাট দেহটা দেখতে পেয়েছিল– মাত্র এক পলকের জন্যে।
শোভন চেঁচিয়ে বলে উঠল, দানবটা ওই পথে গেছে। আমি তাকে দেখেছি। এখানে দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট করলে আমার বোনকে আর পাওয়া যাবে না। তোমরা কে কে আমার সঙ্গে যাবে, এসো।
