কাপ্তেন ঈঙ্গলহর্ন এতক্ষণ দুই চক্ষু মুদে পাইপ টানতে টানতে সমস্ত কথাবার্তা শুনছিলেন। এখন তিনি চোখ খুলে পাইপটা হাতে নিয়ে গম্ভীর স্বরে বললেন, আপনারা বিশ্বাস করবেন কি না জানি না, তবে আপনাদের আমি বিশ্বাস করতেও বলি না, কারণ অনেকদিন আগে আমি এমন একটা গল্প শুনেছিলুম, যা বিশ্বাস করবার মতো নয়। গল্পটা শুনেছিলুম আমি এক বুড়ো নাবিকের মুখে। তাদেরও জাহাজ নাকি চিন-সমুদ্রে টাইফুন-এ পথ হারিয়ে এক অজানা দ্বীপে গিয়ে পড়েছিল। সে দ্বীপের বাসিন্দারা অসভ্য। তাদের রাজা নাকি এক দানবের মতো প্রকাণ্ড গরিলা। সে গরিলা এমন প্রকাণ্ড যে, কুকুর নিয়ে আমরা যেমন খেলা করি, বড় বড় হাতি নিয়ে তেমনি অবহেলায় সে খেলা করতে পারে। দ্বীপের বাসিন্দারা নাকি প্রতি বৎসর তাদের গরিলা-রাজাকে একটি করে বালিকা উপহার দেয়–সেই বালিকাকে তারা রাজার বউ বলে।
শোভন বললে, শুনেছি, আদিমকালে যখন মানুষের জন্ম হয়নি, তখন পৃথিবীতে সত্তর আশি ফুট উঁচু অতিকায় সব জীবজন্তু ছিল। পণ্ডিতরা মাটির ভিতর থেকে তাদের অনেক কঙ্কাল আবিষ্কার করেছেন। কিন্তু সেসব জন্তু এখন পৃথিবী থেকে লুপ্ত হয়ে গেছে। সুতরাং হাতি নিয়ে ছোট কুকুরের মতন খেলা করতে পারে, এমন প্রকাণ্ড গরিলার কথা বিশ্বাস করি কেমন করে?
কাপ্তেন আবার তার দুই চক্ষু মুদে ফেলে বললেন, আপনাকেও বিশ্বাস করতে বলি না, আমি নিজেও বিশ্বাস করি না! আমি একটা গল্প শুনেছিলুম, আজ কেবল সেইটেই আপনাদের কাছে বললুম।
ডেনহাম বলল, ও দানব-গরিলাটার কথাটা নিশ্চয় আজগুবি কথা। কিন্তু পৃথিবীর কোনও-কোনও জায়গায় এখনও যে আদিম কালের অতিকায় জীবজন্তু জ্যান্ত অবস্থায় বিচরণ করছে, মাঝে মাঝে তাও শোনা যায়, আর অনেক পণ্ডিত সেকথা বিশ্বাস করেন।
শোভন বললে, আমারও কিন্তু ওইরকম অতিকায় জন্তুদের স্বচক্ষে দেখতে সাধ হয়।
মালবিকা বললে, আমারও।
হঠাৎ দুই চোখ খুলে ধড়মড় করে উঠে বসে কাপ্তেন বললেন, ডেনহাম! শুনছ?
কী?
হতভাগা বনমানুষগুলো আবার ঢাক-ঢোল বাজাতে শুরু করেছে।
হুঁ। দেখ-দেখ; কাল দ্বীপ ছিল ঘুটঘুটে অন্ধকার, আজ কিন্তু ওখানে শত শত মশাল জ্বলছে। ব্যাপার কী, অত আলো জ্বেলে ওরা কী করছে?
কৌতুক-হাস্য করে মালবিকা বললে, বোধহয় গরিলা-রাজার বউকে সাজানো হচ্ছে।
শোভন উঠে দাঁড়িয়ে বললে, মালবিকা, বাইরের ঠান্ডা হাওয়ায় আর থেকো না, চলো, ভেতরে চলো।
.
পরের দিন সকালে কাপ্তেন ঈঙ্গলহন জাহাজের ডেকে পায়চারি করছেন, এমন সময়ে শোভন ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে ছুটতে এসে বললে, মি. ঈঙ্গলহর্ন। আমার ভগ্নীকে আপনি দেখেছেন? তাকে কেবিনের ভেতরে পাওয়া যাচ্ছে না!
কাপ্তেন বললেন, মিস্ সেন এদিকে তো আসেননি! বোধহয় জাহাজের অন্য কোথাও আছেন।
শোভন আকুল স্বরে বললে, আমি সমস্ত জাহাজ খুঁজে দেখেছি–আমার বোন কোথাও নেই।
কাপ্তেন হঠাৎ চকিত দৃষ্টিতে শোভনের হাতের দিকে তাকিয়ে বললেন, মি. সেন। আপনার হাতে ওটা কী?
শোভন বললে, আমার বোন যে কেবিনে ছিল, তারই দরজার কাছে আমি এই বর্শার ফলাটা কুড়িয়ে পেয়েছি।
বর্শার ফলাটা হাতে করে কাপ্তেন বললেন, দ্বীপের যোদ্ধাদেরও বর্শার ফলা এইরকম। মি. সেন, চলুন–চলুন, জাহাজটা আমরা-আর একবার খুঁজে আসি। মিস্ সেনকে পাওয়া যাচ্ছে না–তাও কি হতে পারে?
কিন্তু অনেক খোঁজাখুঁজি করেও মালবিকার সন্ধান মিলল না।
কাপ্তেন ঈঙ্গলহর্ন হুঙ্কার দিয়ে বলে উঠলেন, কী! আমার জাহাজ থেকে মহিলা চুরি! এর পরে সভ্য সমাজে আমি মুখ দেখাব কেমন করে? ডেনহাম–ডেনহাম। বোট নামাও, এখনি আমরা দ্বীপে যাব। সবাই অস্ত্র ধরো! বন্দুক, রিভলভার, বোমা, ডিনামাইট সব নিয়ে চলো। চিন-সমুদ্রের চিনে-বোম্বেটেদের ভয়ে সবরকম অস্ত্রই আমি জাহাজে রেখেছি। সেসবই নিয়ে বোটে ওঠো–এক মুহূর্তও দেরি নয়। এই বনমানুষের দেশ আজ আমি জ্বালিয়ে পুড়িয়ে শ্মশান করে দিয়ে যাব।
.
পাঁচ। কং
রাতের নিবিড় অন্ধকারে অসভ্যদের ছিপ তিরের মতো দ্বীপের দিকে ছুটে চলল।
তখনও তারা তাকে সজোরে চেপে আছে, মালবিকা অনেক চেষ্টা করেও সে-সব কঠিন হাতের নিষ্ঠুর বাঁধন একটুও আলগা করতে পারলে না! তার মুখও বাঁধা, চিৎকার করাও অসম্ভব!
সে কি দুঃস্বপ্ন দেখছে? এও কি সম্ভব–সে কি সত্য সত্যই অসভ্যদের হাতে বন্দিনি? এত বড় বিপদ যে তার কল্পনাতেও আসে না!
হঠাৎ একটা ধাক্কা লেগে নৌকাখানা থেমে গেল–সঙ্গে-সঙ্গে যারা তাকে চেপে ধরেছিল, তারা হাতের বাঁধন খুলে দিলে।
কিন্তু তারপরেই অন্ধকারে কে তাকে পিঠের ওপরে তুলে নিলে। অনুভবে সে বুঝলে, তাকে নিয়ে লোকটা নৌকা থেকে ডাঙায় লাফিয়ে পড়ল।
অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু শব্দ শুনে সে বুঝতে পারলে, তার আশেপাশে অনেক লোক আছে। এরা তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? …আর সে ভাবতে পারলে না, তার মাথা ঘুরতে লাগল, সে অজ্ঞান হয়ে গেল।
.
মালবিকার যখন জ্ঞান হল, তখন সে দেখলে, তার চারদিকে আলোয় আলো! সে। ধড়মড়িয়ে উঠে বসল।
এ যে সকালের সেই দৃশ্যটাই আবার তার চোখের সামনে জেগে উঠল। সেই দুই বেদির ওপরে রাজা আর পুরুত বসে আছে, চারদিকে সেই জনতা, গরিলা-বেশে নর্তকদের নৃত্য, মন্ত্রপাঠ, ঢাক-ঢোলের আওয়াজ! কেবল সকালে মশাল ছিল না, এখন শত শত মশাল জ্বলছে।
