মাচার ডানদিকে আর একটা কাঠের বেদি, তার ওপরেও ভূতের মতন কালো একটি লম্বা-চওড়া মূর্তি, তার মাথায় পালকের টুপি, পরনে জন্তুর চামড়া, গলায় মড়ার মাথার মালা। সেও দু-হাত ঊর্ধ্বে তুলে চেঁচিয়ে কী মন্ত্র পড়ছে! বোধহয় সে প্রধান পুরোহিত।
মাচার বাঁ-দিকেও একটা বেদি এবং তার ওপরেও জমকালো পোশাক পরা আর একটি মূর্তি। তার মাথায় মুকুট, হাতে দণ্ড! বোধহয় সে এখানকার রাজা।
নিচের চারিদিকে কাতারে কাতারে লোক স্ত্রী, পুরুষ, শিশু, যুবা, বৃদ্ধ! দলে-দলে যোদ্ধা, হাতে বর্শা, কোমরে তরবারি, পিঠে তিরধনুক! শত শত বাজনদার বড় বড় ঢাকে কাঠি পিটছে। প্রত্যেক মূর্তিই প্রায় উলঙ্গ, কোমরে কেবল কপনির মতো এক এক টুকরো ন্যাকড়া ঝুলছে!
হঠাৎ পুরুত মন্ত্র পড়া বন্ধ করে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। অমনি ভিড়ের ভিতর থেকে জন-বারো মূর্তি বেরিয়ে এসে যে মাচাটার ওপরে সেই ভীত মেয়েটি বসে আছে, তারই চারপাশ ঘিরে লাফাতে লাফাতে তাণ্ডব নাচ শুরু করে দিলে! সে মূর্তিগুলোর প্রত্যেকের মুখেই ভীষণ মুখোশ, গায়ে বড় বড় লোমওয়ালা চামড়া।
ডেনহাম বললে, গরিলা! ওরা গরিলা সেজে নাচছে! এত জীব থাকতে ওরা গরিলা সাজল কেন?
এতক্ষণ ওরা এমন ব্যস্ত হয়েছিল যে, কাপ্তেনসাহেবের অস্তিত্বের কথা কেউ জানতেও পারেনি। কিন্তু এখন রাজদণ্ডধারী মূর্তিটার দৃষ্টি আচম্বিতে নতুন আগন্তুকদের ওপর গিয়ে পড়ল। সঙ্গে-সঙ্গে সে দাঁড়িয়ে উঠে চেঁচিয়ে উঠল–বেডো! বেডো! ড্যামা পেটি ভেগো!
অমনি সমস্ত ঢাক-ঢোল, মন্ত্র পড়া, চিৎকার ও নৃত্য যেন কোনও মায়ামন্ত্রেই একসঙ্গে থেমে গেল! চারিদিক এমনি স্তব্ধ হল যে, একটা আলপিন পড়ার শব্দও শোনা যায়!
সমস্ত লোক হতভম্বের মতো কাপ্তেনসাহেবের দলের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল! এবং শিশু ও স্ত্রীলোকরা একে একে ভিড়ের ভিতর থেকে নীরবে সরে পড়তে লাগল।
ডেনহাম এস্তকণ্ঠে বললে, দেখ, দেখ! স্ত্রীলোক আর শিশুরা পালিয়ে যাচ্ছে। গতিক সুবিধার নয়, আমাদেরও এখান থেকে অদৃশ্য হওয়া উচিত!
কাপ্তেন বললেন, আর পালানো চলে না। ওরা আমাদের দেখে ফেলেছে। বুক ফুলিয়ে দাঁড়াও, আমরা যে ভয় পেয়েছি সেটা ওদের জানতে দেওয়া হবে না।
রাজা ও পুরুত বেদির ওপর থেকে নেমে পায়ে-পায়ে এগিয়ে আসতে লাগল, তাদের পিছনে-পিছনে আসছে একদল যোদ্ধা। ভিড়ের ভিতরে এখন আর একজনও শিশু কি স্ত্রীলোক নেই।
ডেনহাম্ বললে, এই বনমানুষগুলো এগিয়ে আসছে কেন?
রাজার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখে কাপ্তেন বললেন, জানি না।
মালবিকা বললে, হ্যাঁ দাদা, ওরা কি আমাদের আক্রমণ করবে?
শোভন বললে, কেমন করে বলব? কিন্তু আমাদের আক্রমণ করলে ওদেরই বেশি বিপদ হবে। আমাদের বন্দুক আছে।
রাজা ও পুরুত সদলবলে এগিয়ে নাবিকদের সামনে এসে দাঁড়াল।
হঠাৎ পুরুতের চোখ পড়ল মালবিকার ওপরে! অত্যন্ত বিস্ময়ে খানিকক্ষণ নীরব থেকে আচম্বিতে শূন্যে এক লাফ মেরে সে কী বিকট স্বরে চিৎকার করে উঠল, ড্যামা সি ভেগো! ড্যামা সি ভেগো! কং! কং! কং! টাস্কো!
রাজাও মালবিকাকে দেখে সবিস্ময়ে চেঁচিয়ে উঠল, কং! কং! কং! টাস্কো!
তারপর চোখের পলক পড়তে না পড়তে যোদ্ধার দল ছুটে এসে মালবিকাকে ধরবার উপক্রম করলে।
মালবিকা সভয়ে আর্তনাদ করে উঠল–দাদা! দাদা!
কাপ্তেন বললেন, বন্দুক ছোড়ো!
একসঙ্গে অনেকগুলো বন্দুক গর্জন করে উঠল–পরমুহূর্তে সাত-আটজন যোদ্ধার দেহ মাটির ওপর পড়ে গড়াগড়ি দিতে লাগল।
এরা নিশ্চয়ই বন্দুকের নামও কখনও শোনেনি। কারণ ব্যাপারটা দেখে তারা সবাই বিস্ময়ে চক্ষু বিস্ফারিত করে অল্পক্ষণ সেখানে থ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, এবং তারপরেই মহাভয়ে তিরবেগে পলায়ন করতে লাগল। তারপর কেবল তারা নয়, সেখানকার সেই বিপুল জনতাও যেন কোনও যাদুমন্ত্রের মহিমায় কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল!
মালবিকা হাঁপাতে হাঁপাতে বললে, দাদা, ওই কেলে ভূতগুলো আমাকে ধরতে এসেছিল কেন?
মালবিকাকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে শোভন বললে, কী করে জানব বল? ওদের ভাষা তো বুঝি না!
কাপ্তেন হত ও আহত যোদ্ধাগুলোর দেহের ওপরে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললেন, আর দ্বীপ দেখে কাজ নেই যথেষ্ট হয়েছে। শিগগির জাহাজে চলো, হতভাগার যদি আবার দল বেঁধে আক্রমণ করে, তাহলে মুশকিলে পড়তে হবে।
.
চার । বিপদ
ইঞ্জিন মেরামত করবার জন্যে জাহাজখানা সেদিন সেইখানেই থেকে গেল।
সন্ধ্যার সময়ে জাহাজের ডেকে বসে কাপ্তেন ডেনহাম, শোভন, মালবিকা ও আরও কয়েকজন আরোহী আজকের ব্যাপার নিয়ে আলোচনা করছিল।
ডেনহাম বললে, ওরা কং কং করে অত চেঁচাচ্ছিল কেন? শোভন বললে, হয়তো কং ওখানকার কোনও দেবতার নাম।
ডেনহাম বললে, উঁচু মাচার ওপরে সেই মেয়েটির কথা মনে করো। আমি বেশ দেখেছি, তার মুখ মড়ার মতো ফ্যাকাসে, আর পুরুতরা যখন মন্ত্র পড়ছিল, সে তখন ভয়ে থরথর করে কাঁপছিল!–আর গরিলাবেশে সেই লোকগুলোর কথাও মনে করো। নাচতে নাচতে হাত বাড়িয়ে তারা যেন সেই মেয়েটাকেই পেতে চাইছিল!
মালবিকা বললে, মিঃ ডেনহাম! আমার কিন্তু সেই মেয়েটিকে দেখে বলির পশুর কথাই মনে হচ্ছিল।
শোভন বললে, আর সেই অদ্ভুত প্রাচীর। আমি দেখেছি, প্রাচীরের সেই প্রকাণ্ড ফটকটা এদিক থেকেই বন্ধ করা আছে। তার মানে, ফটকের ওদিকে এমন কোনও আতঙ্ক আছে, যাকে ওরা এদিকে ঢুকতে দিতে রাজি নয়। সে আতঙ্ক এমন ভয়ংকর যে, দেড়শো ফুট উঁচু প্রাচীর তুলতে হয়েছে। ওখানকার বাসিন্দারা সবাই প্রাচীরের এদিকে থাকে। সুতরাং বোঝা যাচ্ছে, প্রাচীরের এদিকটাকেই ওরা নিরাপদ ঠাই বলে মনে করে।
