দোষ কিছুই নেই। কিন্তু কাল রাত থেকে শুনেছি ওখানে কারা ঢাক-ঢোল বাজাচ্ছে, এ রহস্যময় দ্বীপে কারা বাস করে, তা জানি না। ওরা যদি অসভ্য নরখাদক হয়? যদি আমাদের আক্রমণ করে?
ঠিকই বলেছ ডেনহাম। বেশ, আমরা দলে ভারী আর সশস্ত্র হয়েই যাব। দুখানা বোট নামাতে বলো। ত্রিশজন নাবিক আমাদের সঙ্গে যাবে। সকলেই যেন বন্দুক নেয়।
শোভন আর মালবিকা দাঁড়িয়ে কাপ্তেনের হুকুম শুনলে।
মালবিকা বললে, আমি কখনও অসভ্য মানুষ দেখিনি! দাদা, আমারও ওই দ্বীপে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে।
শোভন বললে, এ প্রস্তাব মন্দ নয়, মালবিকা। ফাঁকতালে একটা নতুন দেশ দেখার সুযোগ ছাড়ি কেন? রোসো, কাপ্তেনসাহেব কী বলেন শুনে আসি।
কাপ্তেন প্রথমটা নারাজ হলেন। তারপর শোভনের অত্যন্ত উৎসাহ দেখে বললেন, আচ্ছা, আমাদের সঙ্গে আপনারা যেতে পারেন, কিন্তু না গেলেই ভালো হত।
মালবিকাকে বোটে উঠতে দেখে চার-পাঁচজন মেমও দ্বীপে যাবার জন্যে আগ্রহ প্রকাশ করলে। কিন্তু দ্বীপে অসভ্য নরখাদক থাকতে পারে শুনেই তাদের সমস্ত আগ্রহই ঠান্ডা হয়ে গেল।
দুখানা বোট দ্বীপের দিকে অগ্রসর হল।
ঢাক-ঢোল তখনও বাজছে।
বোট দুখানা খানিকদূর অগ্রসর হতেই দেখা গেল, দ্বীপের জঙ্গল আর সমুদ্রতীরের মাঝখানে প্রকাণ্ড উঁচু একটা পাঁচিল এদিক থেকে ওদিক পর্যন্ত দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে গেছে।
শোভন সেইদিকে কাপ্তেনের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে।
কাপ্তেন বিস্মিত স্বরে বললেন, অত বড় পাঁচিল দিয়ে জঙ্গলটা আড়াল করে রাখা হয়েছে কেন? এ কী ব্যাপার!
ডেনহাম বললে, এ যে চিনের প্রাচীরের মতন ব্যাপার। চিনারা পাঁচিল তুলেছিল তাতার দস্যুদের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাবার জন্যে। কিন্তু এখানে কাদের আক্রমণ ঠেকাবার জন্যে এমন পাঁচিল তোলা হয়েছে?
শোভন বললে, আমরা দ্বীপের এত কাছে এসে পড়েছি, তবুও তো ওখানে জনপ্রাণীকে দেখতে পাচ্ছি না!
মালবিকা বললে, কিন্তু ঢাকের বাদ্যির তো বিরাম নেই।
কাপ্তেন বললেন, আর একটা দুটো নয়, শত শত ঢাক বাজছে। আমার বোধহয়, দ্বীপে আজ কোনও মহোৎসব হচ্ছে, বাসিন্দারা সবাই সেখানে গিয়ে জুটেছে।
বোট দুখানা দ্বীপের যত কাছে আসে, সেই আশ্চর্য প্রাচীরের উচ্চতা ততই বেড়ে ওঠে।
শোভন বললে, পাঁচিলটা দেড়শো ফুটের চেয়ে কম উঁচু হবে না! দেখুন, বড় বড় গাছগুলো পর্যন্ত পাঁচিলের কত নীচে রয়েছে।
কাপ্তেন বললেন, যাদের ভয়ে অত উঁচু পাঁচিল দেওয়া হয়, তাদের প্রকৃতি নিশ্চয়ই ভয়ংকর! মিঃ সেন, আপনার ভগ্নীকে আমাদের সঙ্গে না আনলেই ভালো করতুম!
মালবিকা হেসে বললে, আমার কিন্তু একটুও ভয় করছে না। মিঃ ঈঙ্গলহর্ন!
কাপ্তেন বললেন, আপনার ভয় না করতে পারে, কিন্তু আমি ভাবছি আমার দায়িত্বের জন্যে!
বোট ডাঙায় এসে লাগল। কিন্তু তখনও দ্বীপের কোনও মানুষকে দেখা গেল না– কেবল সেই শত-শত অশান্ত ঢাকের আওয়াজই জানিয়ে দিচ্ছিল যে, এখানে মানুষ বাস করে।
কাপ্তেন বোট থেকে নেমে নাবিকদের ডেকে বললেন, বন্দুকে টোটা পুরে তোমরা দুজন-দুজন করে সার বেঁধে অগ্রসর হও। মিঃ সেন, আপনার ভগ্নীকে নিয়ে আপনি আমাদের সঙ্গে মাঝখানে থাকুন!
যেদিক থেকে ঢাক-ঢোলের আওয়াজ আসছিল, সকলে পায়ে-পায়ে সেইদিকে এগুতে লাগল।
শোভন বললে, দেখুন মিঃ ঈঙ্গলহর্ন! পাঁচিলটা এখন আরও কত বড় দেখাচ্ছে। আর এ পাঁচিল যে একেলে নয়, অনেক শত বৎসরের পুরোনো, তাও বেশ বোঝা যাচ্ছে!
কাপ্তেন বললেন, পাঁচিলের গায়ে ওখানে যে একটা মস্তবড় ফটকও রয়েছে! তালগাছের সমান উঁচু ওই ফটকটা কীরকম মজবুত দেখেছেন।
এইবারে সকলে একটা বড় গ্রামের কাছে এসে পড়ল। সারি সারি কুঁড়েঘর, মাঝে মাঝে অলিগলি ও রাস্তা। গ্রামের আকার দেখে আন্দাজে বোঝা গেল, এখানে অন্তত চার পাঁচ হাজার লোক বাস করে। কিন্তু কোথায় তারা? সারা গ্রাম নিস্তব্ধ ও জনশূন্য, কোথাও জীবনের কোনও লক্ষণই নেই।
ঢাক-ঢোলের আওয়াজ তখন ভয়ানক বেড়ে উঠেছে-সঙ্গে-সঙ্গে মাঝে-মাঝে বহু কণ্ঠের গম্ভীর একতানও শোনা যাচ্ছে–যেন কারা অজানা ভাষায় স্তোত্র পাঠ করছে!
ডেনহাম বললেন, এতক্ষণে মানুষের গলার সাড়া পাওয়া গেল। গাঁ-সুদ্ধ লোক এখানে এসে জুটেছে। দেখা যাক এরা কারা?
গাছপালার ভিতর থেকে প্রায় সত্তর-আশি ফুট উঁচু একটা কাঠের বাড়ি জেগে উঠল।
শোভন বললে, গোলমালটা ওইদিক থেকেই আসছে। ওই কাঠের উঁচু বাড়িটা বোধহয় মন্দির, নয়তো রাজপ্রাসাদ!
সামনেই একটা জঙ্গল। সেটা পার হতেই সকলের চোখের সুমুখে যে দৃশ্য জেগে উঠল, তা যেমন অদ্ভুত, তেমনই বিচিত্র!
মালবিকা এতক্ষণ খুব স্ফুর্তির সঙ্গে পথ চলছিল, এখন সে আঁতকে উঠে পিছিয়ে পড়ে শোভনের গা ঘেঁষে দাঁড়াল।
কাপ্তেনসাহেব হাত তুলে ইশারা করে নাবিকদের হুঁশিয়ার হতে বললেন, নাবিকেরাও তখনি বন্দুক প্রস্তুত করে সাবধান হয়ে দাঁড়াল!
.
তিন । বেডো! বেডো!
মস্ত একটা কাঠের উঁচু মাচা। তার চারিদিকে কাঠের সিঁড়ি–নানান রকম জীবজন্তুর চামড়ায় ঢাকা!
সেই মাচার টঙে একটি বালিকা ভয়ে জড়সড় হয়ে হাঁটু গেড়ে বসে আছে কষ্টিপাথরের কালো মূর্তির মত! মেয়েটির মাথায় ফুলের মুকুট, সর্বাঙ্গে ফুলের গহনা!
কাঠের সিঁড়ির ধাপে-ধাপে দাঁড়িয়ে আছে কতকগুলো কালো কালো পুরুষ-মূর্তি, তারা সমস্বরে যেন কী মন্ত্র পড়ছে।
