–তাঁর বয়স তো সত্তর বৎসর?
সকলে অবাক হয়ে ভাবতে লাগল।
সুশীলার প্রবেশ। সেই সুমধুর কণ্ঠে সে বললে, বাবা ও ঘরে খাবার দেওয়া হয়েছে।
মনোহর এতক্ষণ পরে একটু হেসে বললেন, চলুন! এই বিজন বনে আপনারা খাবারের মধ্যে কোনও বিশেষত্ব পাবেন না।
সুশীলা বললে, বাড়িতে যা ছিল তাই দিতে পেরেছি। স্যান্ডউইচ শিককাবাব, রুটি মাখন, চা আর মিষ্টান্ন।
মানিক বললে, ললিতা দেবী, চায়ের বৈঠক যে ভুরিভোজনের আসরে পরিণত হল। এই বিজন বনে শিককাবাব বানালেন কী দিয়ে? বাঘের মাংস দিয়ে নয় বোধ হয়।
–খেলেই বুঝতে পারবেন।
–আসুন, সুন্দরবাবু।
–ভায়া আজ যা দেখলুম, আর শুনলুম, আমার পিলে অত্যন্ত চমকে গিয়েছে। খাওয়ার চিন্তা মোটেই জাগছে না!
–আপনার পিলে নির্বোধ নয়। একখানা স্যান্ডউইচ উদরসাৎ করলেই যে আবার অত্যন্ত শান্ত হয়ে পড়বে! আপনার ধাত জানতে আমার বাকি নেই? চলুন মধুরেণ সমাপয়েৎ করে আসি।
কিং কং (উপন্যাস)
এক । চিন-সমুদ্রের টাইফুন
জাহাজের নাম ইন্ডিয়া। আমেরিকা থেকে জাপান হয়ে আসছিল ভারতবর্ষের দিকে। হঠাৎ চিনা সমুদ্রে টাইফুনজেগে উঠল। চিনা সমুদ্রে ভীষণ এক ঝড় ওঠে, তার নাম হচ্ছে টাইফুন। খুব সাহসী নাবিকরাও এই টাইফুন-কে ভয় করে যমের মতো। টাইফুন এর পাল্লায় পড়ে আজ পর্যন্ত কত হাজার হাজার জাহাজ যে অতল পাতালে তলিয়ে গিয়েছে, সে হিসাব কেউ রাখতে পারেনি।
ঝড় গোঁ গোঁ করে গর্জন করছে–চারিদিক অন্ধকার! ঝড়ের আঘাতে সমুদ্র প্রচণ্ড যাতনায় আর্তনাদ করতে লাগল–পৃথিবীতে এখন ঝড়ের হুঙ্কার আর সমুদ্রের কান্না ছাড়া আর কিছুই শোনা যায় না। যেন ঝড়ের কবল থেকে মুক্তিলাভ করবার জন্যেই বিরাট এক ভীত জন্তুর মতো সমুদ্র বারংবার আকাশে লাফ মারতে লাগল।
ঝড়ের তোড়ে ইন্ডিয়া জাহাজ অন্ধকারে কোথায় যে বেগে ছুটে চলেছে, কেউ তা জানে না! জাহাজের ইঞ্জিন যখন ইন্ডিয়াকে আর সামলাতে পারলে না, কাপ্তেন ঈঙ্গলহর্ন তখন হাল ছেড়ে দিয়ে হতাশভাবে বললেন, ভগবান আমাদের রক্ষা করুন!
আকাশে চাঁদ নেই, তারা নেই–পৃথিবীর কোথাও এতটুকু আলো আভাস নেই! জাহাজ ছুটে চলেছে যেন মৃত্যুর মুখে!
টাইফুন-এ প্রতি বৎসরে চিনা সমুদ্রে কত জাহাজই ডোবে, হয়তো ইন্ডিয়া জাহাজও আজ ডুববে, কিন্তু কেবল সেই কথা বলবার জন্যেই আজ আমরা এই গল্প লিখতে বসিনি।
ইন্ডিয়া জাহাজের দুটি যাত্রীর জন্যেই আমাদের যত দুর্ভাবনা।..কারণ তাঁরা বাঙালি। একজনের নাম শ্রীযুক্ত শোভনলাল সেন, আর একজন হচ্ছেন তারই ভগ্নী কুমারী মালবিকাঁদেবী। ভাই-বোনে আমেরিকা বেড়িয়ে দেশে ফিরছেন।
শেষ রাতে ঝড় থামল, সমুদ্রও শান্ত হল।
কাপ্তেন ঈঙ্গলহর্ন বললেন, ভগবানকে ধন্যবাদ! এ যাত্রা আমরা রক্ষা পেলুম!
তার সহকারী কর্মচারী বললেন, কিন্তু জাহাজ যে কোথায় এসে পড়েছে, সেটা তো কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।
কাপ্তেন বললেন, না। তবে আমরা যে এখনও পৃথিবীতেই টিকে আছি, এইটুকুই হচ্ছে ভাগ্যের কথা। বেঁচে যখন আছি, তখন জাহাজ নিয়ে আবার ডাঙায় গিয়ে উঠতে পারব।
কর্মচারী বললেন, ও কীসের শব্দ?
কাপ্তেন খানিকক্ষণ কান পেতে শুনে বললেন, অনেকগুলো জয়ঢাক বাজছে! বোধহয় আমরা কোনও দ্বীপের কাছে এসে পড়েছি। চারিদিকে যে অন্ধকার, কিছুই দেখা যাচ্ছে না। হয়তো ওখানে কোনও উৎসব হচ্ছে..আচ্ছা, আগে রাতটা পুইয়ে যাক, সকালে সবই বুঝতে পারব!
দুম দুম দুম, দুম দুম দুম, দুম দুম দুম! জয়ঢ়াকগুলো অশান্ত স্বরে বেজেই চলেছে। শোভনলাল আর মালবিকা ডেকে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে সেই রহস্যময় বাজনা শুনতে লাগল।
খানিক পরে মালবিকা বললে, দেখ দাদা, কেন জানি না, আমার মনে হচ্ছে যেন ও বাজনা আমাকেই ডাকছে।
শোভনলাল হেসে ঠাট্টা করে বললে, দূর পাগলি!
.
দুই । খুলি-পাহাড়ের দ্বীপ
ঢাক-ঢোল একটানা বেজে চলেছে–এ ঢাক-ঢোল যেন থামতে শেখেনি!
পূর্বদিকে আলো-নদীর একটি উজ্জ্বল ধারা বয়ে যাচ্ছে কিন্তু এখনও তার নিচেই দুলছে অন্ধকারের পর্দা।
আলো-নদীর দুই তীরে ধীরে-ধীরে রক্তরাঙা রঙের রেখা ফুটে উঠেছে।
ক্রমে অন্ধকারের পরদা পাতলা হয়ে এল এবং তারই ভিতর থেকে অস্পষ্ট ও ছায়াময় সব দৃশ্য দেখা যেতে লাগল!
ভোর। সূর্যের কিরণ-ছটা দেখা গেল।
শোভন ও মালবিকা বিস্মিত চক্ষে দেখলে, তাদের সামনেই একটি অর্ধচন্দ্রাকার দ্বীপ আত্মপ্রকাশ করেছে। দ্বীপের মাঝ থেকে মস্তবড় একটা পাহাড় মাথা তুলে আকাশের অনেকখানি ঢেকে ফেলেছে। সে পাহাড়ের ওপরটা দেখতে ঠিক মড়ার মাথার খুলির মতো–সেখানে গাছপালা বা সবুজ রঙের চিহ্নমাত্র নেই।
কিন্তু পাহাড়ের নিচেই গভীর জঙ্গল। আর সেই জঙ্গলের ভিতর থেকে তখনও কারা মহা-উৎসাহে ঢাক-ঢোল বাজাচ্ছে!
কাপ্তেনসাহেব তার প্রধান কর্মচারী ডেনহামকে ডেকে বললেন, মিঃ ডেনহাম! এ কোন দ্বীপ? আমরা কোথায় এসেছি?
ডেনহাম বললে, আমারও জ্ঞান আপনার চেয়ে বেশি নয়! এখানে মড়ার মাথার খুলির মতন একটা আশ্চর্য পাহাড় রয়েছে। এ দ্বীপের কথা কখনও শুনেছি বলে মনে হচ্ছে না।
জাহাজের ইঞ্জিনচালক এসে খবর দিলে, ইঞ্জিন খারাপ হয়ে গেছে। সারাতে সময় লাগবে।
কাপ্তেন বললেন, হয়তো আজ আমাদের এইখানেই থাকতে হবে। ডেনহাম, সময়ই যখন পাওয়া গেল, এই অজানা দ্বীপটা একবার তদারক করে আসতে দোষ কী?
