চতুর্থ দিনের প্রভাতী চায়ের আসরে সুন্দরবাবু যথারীতি উপস্থিত।
টেলিফোনের ঘণ্টি বেজে উঠল। রিসিভার ধরে জয়ন্ত বলল, হ্যালো! হ্যাঁ, আমি জয়ন্ত। নমস্কার। কী বললেন? যাকে খোঁজা হচ্ছে, তাকে পেয়েছেন? অতিশয় সুসংবাদ। তার নাম কী? রামলাল? বেশ, বেশ তাকে আজ দুপুরেই আমার কাছে পাঠিয়ে দিতে পারবেন? আচ্ছা, ধন্যবাদ।
সুন্দরবাবু শুধোলেন, কীসের সুসংবাদ জয়ন্ত?
জয়ন্ত বলল, সুন্দরবাবু, আজ বৈকালে অনন্তবাবুর বাড়ির সকলেই যেন এক জায়গায় হাজির থাকে, এমনকী পাঁচক পর্যন্ত।
কৌতূহল-প্রদীপ্ত মুখে সুন্দরবাবু বললেন, কেন জয়ন্ত, কেন?
সকলের সঙ্গে আমি রামলাল নামে এক ব্যক্তির পরিচয় করিয়ে দিতে চাই।
–কে রামলাল?
ব্যস, এখন আর কোনও প্রশ্ন নয়। এই বলে জয়ন্ত একেবারে বোবা হয়ে গেল।
.
বৈকাল। অনন্তবাবুর বাড়ির সবাই বৈঠকখানায় হাজির। টেবিলের সামনের চেয়ারখানা দখল করেছেন সুন্দরবাবু।
জয়ন্ত ও মানিকের আবির্ভাব। তাদের পিছনে আর একজন লোক। তার খালি পা, কোমর-বাঁধা কাপড়, গায়ে গেঞ্জি, জাতে সে বোধহয় বিহারি!
জয়ন্ত বলল, সুন্দরবাবু, এই লোকটির নাম রামলাল?
–হুম!
–নবীনবাবু, ঘটনার দিন আপনি কোথায় রাত্রিবাস করেছেন বলবেন না?
নবীন কাঁচুমাচু মুখে বলল, আমাকে মাপ করুন।
–বেশ, আপনাকে তা আর বলতে হবে না, কারণ আমি আপনার গুপ্তকথা জানতে পেরেছি।
নবীনের মুখ হয়ে উঠল উদ্বিগ্ন।
জয়ন্ত বলল, রামলাল, সে রাত্রে এই নবীনবাবু কি তোমার নৌকো ভাড়া করেছিলেন?
রামলাল বলল, না হুজুর!
–তবে?
রামলাল অঙ্গুলিনির্দেশে দেখিয়ে দিল সুবোধকে।
জয়ন্ত বলল, সুবোধবাবু, ঘটনার দিন রাত্রে আপনি রামলালের নৌকো ভাড়া করে কলকাতায় এসেছিলেন কেন?
সুবোধের চেহারা তখন আর নিরীহের মতো দেখাচ্ছিল না। সে গর্জন করে বলে উঠল, মিথ্যে কথা!
–কিন্তু রামলাল আপনাকে শনাক্ত করছে।
–ও ভুল দেখেছে।
–বেশ, আদালতে গিয়ে এই কথাই বলবেন। সকলে এখন আমার কথা শুনুন। জয়ন্ত বলতে লাগল ।
সুন্দরবাবু, আগেই আপনাকে বলেছিলুম, এ মামলার একটা মস্ত সূত্র হচ্ছে, নবীনবাবুর রক্তাক্ত লাঠিগাছা।
নবীনবাবু যদি লাঠি দিয়ে দারোয়ানকে আঘাত করতেন, তাহলে নিশ্চয়ই নিজের বিরুদ্ধে অতবড় প্রমাণটা নির্বোধের মতো ঘটনাস্থলে ফেলে রেখে যেতেন না।
এখানেই বোঝা যায় তাঁর বিরুদ্ধে হয়েছিল একটা নিষ্ঠুর চক্রান্ত।
নবীনবাবুর দিকে পুলিশের সন্দেহ আকৃষ্ট করে অপরাধী নিরাপদে বাস করতে চেয়েছে যবনিকার অন্তরালে। নবীনবাবুর রক্তাক্ত লাঠি পাওয়া গেছে ঘটনাস্থলে। ঘরের দরজার চাবিও ছিল তার কাছে। পুলিশ সহজেই ভ্রমে পড়তে পারত।
তার ওপর নবীনবাবু নিজেই ব্যাপারটাকে আরও ঘোরালো করে তুলেছিলেন। তিনি কিছুতেই বলতে রাজি নন, ঘটনার দিন রাত্রে তিনি ছিলেন কোথায়? সে গুপ্তকথা আমি জানতে পেরেছি তার মায়ের কাছে সন্ধান নিয়ে। তিনি ছিলেন তার মায়ের কাছে। অনন্তবাবু তার বিমাতাকে একেবারেই পছন্দ করতেন না। তার সঙ্গে মেলামেশা করলে নবীনবাবু সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হবেন, এই ছিল অনন্তবাবুর কঠিন নির্দেশ। নবীন রক্তের টানে দাদার অনুপস্থিতির সুযোগ গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু ভয়ে সেকথা স্বীকার করতে পারছিলেন না।
নবীনবাবুর সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ হয়ে আমি আর একটা সূত্র নিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগলাম। ঘটনাস্থলে বাড়ির সদর দরজার কাছে আর উঠানের ওপরে পেয়েছিলুম দু-টুকরো মাটি। পরীক্ষা করে বুঝতে পারলুম, তা গঙ্গামাটি ছাড়া আর কিছুই নয়। রঘু বেচারা বলল, ঘটনার দিন বাড়ির কেউ গঙ্গাস্নানে যায়নি। সে দু-বেলা বাড়ির উঠোন প্রভৃতি ঝাট দিয়ে ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করে রাখে, তবু ওখানে দু-টুকরো গঙ্গামাটি এল কেমন করে? তুচ্ছ মাটির টুকরো, কিন্তু সূত্র হিসাবে অসামান্য হয়ে উঠল।
করলুম কল্পনাশক্তি প্রয়োগ। মন বলল, অপরাধী এসেছে রাত্রে নৌকোয় চড়ে জলপথে। নদীতে তখন ভাটা ছিল, তাকে নামতে হল ভিজে মাটির উপরে। তার জুতোর তলায় লেগে গেল এঁটেল মাটি। সেই মাটির কিছু অংশ ঝরে পড়েছে ঘটনাস্থলে।
গঙ্গার অপর পারে ঘুষুড়িতে বাস করে সুবোধ। সে কেমন লোক? ঘুষুড়ির পুলিশ সন্ধান নিয়ে সে খবর আমাকে জানিয়েছে। সুবোধ হচ্ছে বিষম জুয়াড়ি। ঋণে সে ডুবে আছে। তার নৈতিক চরিত্রও ভালো নয়। হাতে পঁচিশ হাজার টাকা–অনন্তবাবু অনুপস্থিত, এ সুযোগ হয়তো সে ছাড়তে পারেনি। তার পক্ষে সিন্দুকের তালার দ্বিতীয় চাবি তৈরি করে নেওয়াও কিছুমাত্র কঠিন নয়। সে যদি নৌকো ভাড়া করে ঘুষুড়ি থেকে এসে থাকে, তবে নৌকোয় মাঝিরও সন্ধান পাওয়া যেতে পারে সেইখানেই। তাই পাওয়া গেল। ঘুষুড়ির পুলিশই খুঁজে বার করেছে মাঝি রামলালকে।
কিন্তু সুবোধ বাড়ির ভেতরে ঢুকল কেমন করে? আমার অনুমান রঘু বেয়ারাও এই ষড়যন্ত্রের মধ্যে আছে। সেই সুবোধকে সদর-দরজা খুল দিয়েছে। সে কাজ সেরে যখন সরে পড়ছে, সেই সময়েই দারোয়ানের ঘুম ভেঙে যায়। তার পরের কথা আপনারাই অনুমান করুন।
–সুন্দরবাবু, একরত্তি মাটি কি বড় ফ্যালনা?
সুন্দরবাবু বললেন, উহুম, উহুম!
কাচের কফিন (উপন্যাস)
এক । খুনের না মানুষ চুরির মামলা
বোলো না, বোলা না, আজ আমাকে চা খেতে বোলো না! ঘরে ঢুকেই বলে উঠলেন সুন্দরবাবু।
