দারোয়ানই কি কড়া নাড়া শুনে অপরাধীকে দরজা খুলে দিয়ে পরে তার দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে? এ প্রশ্নেরও জবাব পাবার উপায় নেই। কারণ দারোয়ান এখনও অজ্ঞান হয়ে হাসপাতালে পড়ে আছে।
সমস্ত শুনে জয়ন্ত মুখে কিছু বলল না। বাড়ির বাইরে গিয়ে খানিকক্ষণ এদিকে ওদিকে ঘোরাঘুরি করে, আবার ফিরে এসে সদর দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলল, সুন্দরবাবু, আপনি ঠিকই বলেছেন। বাইরে থেকে এ বাড়ির ভিতরে আসবার কোনও উপায় নেই।
–তাহলে অপরাধী বাড়ির ভেতরে এল কেমন করে?
–এই সদর দরজা দিয়ে।
দরজা তো ভেতর থেকে বন্ধ ছিল।
জয়ন্ত জবাব দিল না। নিচের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ সে উবু হয়ে বসে পড়ল। তারপর মাটির ওপর থেকে কী একটা তুলে নিয়ে চোখের কাছে এনে পরীক্ষা করল। তারপর পকেটের ভিতর থেকে এক টুকরো কাগজ বার করে জিনিসটা মুড়ে রাখল।
সুন্দরবাবু শুধোলেন, কী ওটা?
জয়ন্ত উঠে দাঁড়িয়ে বলল, একরত্তি মাটি। সে নতমুখে এদিকে-ওদিকে চোখ বুলোতে বুলোতে অগ্রসর হল। উঠোনের ওপরে আবার বসে পড়ল। আবার কী তুলে নিয়ে মোড়কের ভিতরে রেখে উঠে দাঁড়াল।
সুন্দরবাবু বললেন, আবার কী পেলে হে!
আবার একরত্তি মাটি।
–খালি খালি মাটি কুড়িয়ে ছেলেখেলা করছ কেন? কাজের কথা বলো।
–দোতলায় চলুন। যে ঘর থেকে টাকা চুরি গিয়েছে সেইখানে।
কিন্তু সেখানে নতুন কিছুই আবিষ্কৃত হল না।
জয়ন্ত বলল, এ মামলায় একটা মস্ত সূত্র হচ্ছে নবীনের রক্তাক্ত লাঠিগাছা।
–হুম, আরও দুটো বড় সূত্র আছে। প্রথম, নবীনের কাছে ছিল দরজার আর সিন্দুকের চাবি। দ্বিতীয়, কাল কোথায় রাত্রিবাস করেছিল, সে কথা বলতে নারাজ কেন?
জয়ন্ত মাথা নেড়ে বলল, উঁহু, ওর চেয়ে বড় সূত্র হচ্ছে ওই লাঠিগাছা।
হ্যাঁ, ওই সূত্র ধরে আমি নবীনকে গ্রেফতার করতে পারি।
আপাতত সে চেষ্টা করবেন না।
–যদি সে পালায়?
–আমি নবীনের মুখ দেখেছি। বুদ্ধিমানের মুখ। বোকার মতন এখন পালিয়ে গিয়ে সে নিজের পায়ে কুড়ুল মারবে না।
–ওই নবীন আর সুবোধ এইদিকে আসছে। ওদের কিছু জিজ্ঞাসা করবে কি?
নবীন ও তার পিছনে-পিছনে সুবোধ এসে দাঁড়াল জয়ন্তর সামনে। নবীনের মুখশ্রী, দেহের গঠন ও গায়ের রং চমৎকার। চোখের চাহনি শিশুদের মতন সরল। কিন্তু কারুর মুখ। দেখে পুলিশ ভোলে না। কারণ, এমন অপরাধীর সংখ্যাও অল্প নয়, যাদের মতো দেববাঞ্ছিত চেহারা পেলে মুনি-ঋষিরাও নিজেদের ভাগ্যবান মনে করতেন।
সুবোধের চেহারাও নিরীহ গোছের, শ্যামবর্ণ, দোহারা দেহ, মাথায় মাঝারি, মুখ হাসি। হাসি। চেহারায় কোনও বৈশিষ্ট্য না থাকলেও মানুষটিকে মন্দ বলে মনে হয় না।
জয়ন্ত বলল, আসুন নবীনবাবু। বলতে পারেন দারোয়ানের দেহের পাশে আপনার লাঠিগাছা পাওয়া গেছে কেন?
শুষ্ককণ্ঠে নবীন বলল, কেমন করে বলব মশাই; আমার নিজের মনেও বার বার জাগছে। ওই প্রশ্নই। আমি হতভম্ব হয়ে গেছি।
সুবোধের দিকে ফিরে জয়ন্ত বলল, শুনলুম আপনার বাড়ি ঘুষুড়িতে। আপনি রোজ সেখান থেকে আনাগোনা করেন, না কলকাতাতেও কোনও বাসা রেখেছেন?
সুবোধ বলল, গঙ্গার এপারে কলকাতা, ওপারে ঘুষুড়ি। দূর তো বেশি নয়, তাই ঘুষুড়ি থেকেই আনাগোনা করি।
–অনন্তবাবু আপনাকে অত্যন্ত বিশ্বাস করেন?
সুবোধ ভাঙা-ভাঙা গলায় বলল, কিন্তু কালকের ঘটনার পরও তিনি কি আর আমাকে। বিশ্বাস করবেন?
নবীন বলল, আমিও কেমন করে দাদার কাছে মুখ দেখাব জানি না।
জয়ন্ত বলল, আপনাদের বেয়ারা রঘুকে একবার আসতে বলুন।
রঘু এলে জয়ন্ত জিজ্ঞাসা করল, তোমাদের সদর দরজা থেকে উঠোন পর্যন্ত রোজ ধোয়া-মোছা, আঁট দেওয়া হয়?
রঘু হাত জোড় করে বলল, হ্যাঁ হুজুর, দুবেলাই। কর্তাবাবু কোথাও এক তিল ধুলো দেখলে রেগে আগুন হয়ে ওঠেন।
সদরের জানলা দিয়ে গঙ্গার দিকে তাকিয়ে জয়ন্ত বলল, এত কাছে গঙ্গা, তোমরা নিশ্চয়ই রোজ গঙ্গাস্নান করো?
না হুজুর, গঙ্গায় স্নান করতে যাই কালে-ভদ্রে।
কাল সকালে কি বৈকালে তোমাদের কেউ গঙ্গাস্নান করতে যায়নি?
–না, হুজুর।
সুন্দরবাবু, আমার আর কিছু জিজ্ঞাসা নেই। এসো মানিক।
জয়ন্ত ও মানিকের সঙ্গে সুন্দরবাবুও নীচে নেমে শুধোলেন, কী হে ভায়া, উঠোন ঝট দেওয়া, গঙ্গাস্নান করার সঙ্গে টাকা চুরির সম্পর্কটা কোনখানে?
–এখন বুঝবেন না।
–নতুন কোনও সূত্র পেয়েছ বুঝি?
–পেয়েছি। সবচেয়ে বড় সূত্র।
সূত্রটা কী?
–একরত্তি মাটি।
জয়ন্তর দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে সুন্দরবাবু বললেন, হুম, তুমি একটি আস্ত বাতুল।
পথ দিয়ে যেতে-যেতে মানিক বলল, আমিও একরত্তি মাটির মানে বুঝলাম না। তুমি এখন কী করবে?
তথ্যানুসন্ধান। আমার বিশ্বাস এটা জটিল মামলা নয়। চোর ধরা পড়তে বেশি বিলম্ব হবে না।
কারুকে তুমি সন্দেহ করেছ?
কারুকে না, কারুকে না। অর্থাৎ সকলকেই। নবীন, সুবোধ থেকে শুরু করে এ বাড়ির পাঁচক, দারোয়ান, বেয়ারা, দাসী, সকলকেই। অথচ চোর হচ্ছে কোনও অজ্ঞাত ব্যক্তি, কিন্তু তা হলেও বাড়ির কেউ না কেউ যে তাকে কোনও সাহায্য করেছে, সে বিষয়ে সন্দেহ নাস্তি। আর কোন দিক থেকে সে এসেছে, তা-ও আমি বুঝতে পেরেছি।
কী দেখে বুঝলে?
–একরত্তি মাটি।
জয়ন্ত, তোমার নাগাল পাওয়া ভার।
.
এক, দুই, তিনদিন কেটে গেল। জয়ন্ত মাঝে-মাঝে বেরিয়ে যায়, ফিরে আসে, কিন্তু মুখে কিছু বলে না।
