মানিক সবিস্ময়ে শুধোলে, এ কী কথা শুনি আজ মন্থরার মুখে।
-না আজ কিছুতেই আমি চা খাব না।
–একেবারে ধনুর্ভঙ্গ পণ?
–হুম।
জয়ন্ত বললে, বেশ, চা না খান, খাবার খাবেন তো?
কী খাবার?
–টিকিয়া খাবার।
ও তাই নাকি।
তারপর আছে ভেন্ডালু!
–হংস মাংস?
–হ্যাঁ, বনবাসী হংস।
সুন্দরবাবু ভাবতে লাগলেন।
–খাবেন তো?
সুন্দরবাবু ত্যাগ করলেন একটি সুদীর্ঘ নিশ্বাস। তারপর মাথা নেড়ে করুণ স্বরে বললেন, উঁহুম! আজ আমাকে হংস-মাংস ধ্বংস করতে বোলো না।
মানিক বললে, হালে আর পানি পাচ্ছি না। হংস-মাংসেও অরুচি! সুন্দরবাবু এইবারে বোধ হয় পরমহংস হয়ে বৈরাগ্যব্রত গ্রহণ করবেন।
–মোটেই নয়, মোটেই নয়।
তবে গেরস্তের ছেলে হয়েও এ-খাব না ওখাব না বলছেন কেন?
আজ আমার উদর দেশের বড়ই দুরবস্থা।
–অমন হৃষ্টপুষ্ট উদর, তবুও
–আমার উদরাময় হয়েছে।
–তাই বলুন। তবে ওষুধ খান। আমি হোমিওপ্যাথি জানি! এক ডোজ মার্কসল ওষুধ দেব নাকি?
–থো করো তোমার হোমাপাথির কথা। আমি খাবার কি ওষুধ খেতে আসিনি। আমি এসেছি জরুরি কাজে।
–অসুস্থ দেহ, তবু কাজ থেকে ছুটি নেননি? কী টনটনে কর্তব্যজ্ঞান।
–হ্যাঁ, হ্যাঁ, তাই। স্বর্গবাসী চেঁকি ধান ভাঙে। পুলিশের আবার ছুটি কী হে? জয়ন্ত শুধোলে, নতুন মামলা বুঝি?
–তা ছাড়া আর কী?
কীসের মামলা?
বলা শক্ত। খুনের মামলা কি মানুষ চুরির মামলা, ঠিক ধরতে পারছি না।
একটু-একটু করে জাগ্রত হচ্ছিল জয়ন্তের আগ্রহ। সে সামনের চেয়ারের দিকে অঙ্গ লি নির্দেশ করে বললে, সুন্দরবাবু ওই চেয়ারে বসুন। ব্যাপারটা খুলে বলুন।
আসন গ্রহণ করে সুন্দরবাবু বললেন, এটাকে আজব মামলা বলাও চলে। রহস্যময় হলেও অনেকটা অর্থহীন। নাটকের পাত্র-পাত্রী হচ্ছেন তিনজন। একজন নারী আর দুজন পুরুষ। ওদের মধ্যে একজন পুরুষ হচ্ছেন আসামি। কিন্তু তিনজনেই অদৃশ্য হয়েছে।
–অদৃশ্য হবার কারণ?
–শোনো! বছর দেড়েক আগে সুরেন্দ্রমোহন চৌধুরী নামে এক ভদ্রলোক থানায় এসে অভিযোগ করেন, তাঁর পিতামহী সুশীলাসুন্দর দেবীর কোনও সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যাপারটা সংক্ষেপে এই। সুশীলা দেবী বিধবা। তিনি তার স্বামীর বিপুল সম্পত্তির একমাত্র অধিকারিণী। তার বয়স পঁচাত্তর বছর। স্বাস্থ্যভঙ্গ হওয়ার দরুন ডাক্তার মনোহর মিত্রের চিকিৎসাধীন ছিলেন। সুশীলা দেবী হঠাৎ একদিন একখানা ট্যাক্সি ডাকিয়ে এনে মনোহর মিত্রের সঙ্গে বাড়ির বাইরে চলে যান, তারপর ফিরে আসেননি। খোঁজাখুঁজির পর প্রকাশ পায়, অদৃশ্য হওয়ার দুদিন আগে সুশীলা দেবী ব্যাংক থেকে নগদ পনেরো লক্ষ টাকা তুলে আনিয়েছিলেন। সে টাকাও উধাও হয়েছে।
ডাক্তার মনোহর মিত্র নামে এক ভদ্রলোকের খ্যাতি আমি শুনেছি। পদার্থশাস্ত্রে তার নাকি অসাধারণ পাণ্ডিত্য।
–তিনিই ইনি। মনোহরবাবুকে তুমি কখনও চোখে দেখেছ?
না!
–আমিও দেখিনি, তবে তার চেহারার হুবহু বর্ণনা পেয়েছি।
কীরকম?
–মনোহরবাবুর দীর্ঘতা পাঁচ ফুট চার ইঞ্চির বেশি হবে না, কিন্তু তার দেহ রীতিমতো চওড়া। তাঁর মাথায় আছে প্রায় কাঁধ পর্যন্ত ঝুলে পড়া সাদা ধবধবে চুল, মুখেও লম্বা পাকা দাড়ি। তার বয়সও ষাটের কম নয়। কিন্তু শরীর এখনও যুবকের মতো সবল। রোজ সকালে সূর্য ওঠবার আগে পদব্রজে অন্তত চার মাইল ভ্রমণ করে আসেন। তাঁর চোখ সর্বদাই ঢাকা থাকে কালো চশমায়। টিকলো নাক। শ্যামবর্ণ। সাদা পাঞ্জাবি, থান কাপড় আর সাদা ক্যাম্বিসের জুতো ছাড়া অন্য কিছু পরেন না। বর্মা চুরোটের অত্যন্ত ভক্ত। তার মুখ সর্বক্ষণই গম্ভীর। ডান কপালের ওপরে একটা এক ইঞ্চি লম্বা পুরোনো কাটা দাগ আছে। হাতে থাকে একগাছা। রূপাপাবাঁধানো মোটা মলাক্কা বেতের লাঠি।
জয়ন্ত বললে, আরে মশাই, এ বর্ণনার কাছে যে আলোকচিত্রও হার মানে। এর পর বিপুল জনতার ভিতর থেকেও মনোহরবাবুকে আবিষ্কার করতে পারব।
সুন্দরবাবু দুঃখিত কণ্ঠে বললেন, আমি কিন্তু দেড় বৎসর চেষ্টা করেও তার টিকিও আবিষ্কার করতে পারলুম না।
-কেন?
–তিনিও অদৃশ্য হয়েছেন!
–তাঁর বাড়ি কোথায়?
বালিগঞ্জে নিজের বাড়ি। সেখানে গিয়েছিলুম। কিন্তু বাড়ি একেবারে খালি।
–মনোহরবাবুর পরিবারবর্গ?
–মাথা নেই, তার মাথাব্যথা। তিনি বিবাহই করেননি।
–অন্য কোনও আত্মীয়-স্বজন?
কারুর পাত্তা পাইনি। পাড়ার লোকের মুখে শুনলাম মনোহরবাবু জনচারেক পুরাতন আর বিশ্বস্ত ভৃত্য নিয়ে ওই বাড়িতে বাস করতেন বটে, কিন্তু হঠাৎ একদিন সকলকে সঙ্গে নিয়ে কোথায় চলে গিয়েছেন।
জয়ন্ত খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বললে, আপনি বললেন, সুশীলা দেবী ট্যাক্সিতে চড়ে মনোহরবাবুর সঙ্গে বাইরে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। তার কি নিজের মোটর নেই?
–আছে বইকী! একখানা নয়, তিনখানা।
–তাহলে মেনে নিতে হয়, সুশীলা দেবীর নিজেরও ইচ্ছা ছিল, তিনি কোথায় যাচ্ছেন কেউ জানতে না পারে।
–হয় তোমার অনুমান সত্য, নয় তিনি ট্যাক্সি ভাড়া করেছিলেন মনোহরবাবুর পরামর্শেই!
–আপনি ট্যাক্সিখানার সন্ধান নিয়েছেন?
নিয়েছি বইকী! ট্যাক্সিচালককে খুঁজে বের করেছি। সে আরোহীদের হাওড়া স্টেশন পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছে। আর কিছুই সে জানে না।
তা হলে মনোহরবাবুর সঙ্গে সুশীলা দেবী বোধ হয় কলকাতার বাইরে চলে গিয়েছেন। কিন্তু কলকাতার বাইরে কোথায়?
