হ্যাঁ, ভালো কথা। যদুবাবুর ডানপাটির জুতোর তলাটা একবার পরীক্ষা করে দেখলে ভালো হয়।
পরীক্ষার ফল হল সন্তোষজনক। জুতোর তলায় যথাস্থানে ছিঁড়ে গিয়েছে খানিকটা চামড়া।
জয়ন্ত বললে, মানিক, এখন শেষকৃত্যের ভার পুলিশের হাতে সমর্পণ করে চলো আমরা এখান থেকে প্রস্থান করি। কিন্তু যাবার আগে একটি জিজ্ঞাসা আছে। হরিহরবাবু, শখের গোয়েন্দারা কি একেবারেই ঘৃণ্য জীব?
হরিহর অনুতপ্ত স্বরে বললেন, আমাকে ক্ষমা করবেন। আজ আমার চোখ ফুটল।
একরত্তি মাটি
প্রাতরাশের পর মানিক উচ্চস্বরে খবরের কাগজ পাঠ করতে লাগল এবং জয়ন্ত একমনে শুনতে লাগল খবরগুলো।
ভৃত্য মধুর প্রবেশ সঙ্গে তার এক পাহারাওয়ালা।
জয়ন্ত শুধোলে, ব্যাপার কী?
পাহারাওয়ালার মুখে শোনা গেল, ইনস্পেকটর সুন্দরবাবু এই পাড়ায় তদন্তে এসেছেন, জয়ন্তের সঙ্গে তিনি পরামর্শ করতে চান।
জয়ন্ত বলল, চলো মানিক, নিশ্চয় কোনও নতুন মামলা! একঘেয়ে কাগজ শোনার চেয়ে নতুন মামলা নিয়ে নাড়াচাড়া করা ভালো।
মানিক বললে, হ্যাঁ, তাতে আমাদের সময়ও কাটে, আর সুন্দরবাবুরও হাতযশ বাড়ে।
.
গঙ্গার ধার। রেল লাইনের সামনেই একখানা মাঝারি আকারের তিনতলা বাড়ি। সদর দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে এই পাহারাওয়ালা।
বৈঠকখানায় কয়েকজন লোকের সঙ্গে বসে আছেন সুন্দরবাবু। একগাল হেসে বললেন, এসো জয়ন্ত, এসো মানিক।
জয়ন্ত বলল, আবার কোনও নতুন মামলার হামলা সামলাতে এসেছেন বুঝি?
হুম, তা ছাড়া আর কি? সেই জন্যেই তো আজকে তোমাদের চায়ের আসরে যাওয়া হল না।
মানিক বলল, না গিয়ে ভালো করেননি। মধু আজ একটি চমৎকার খাবার বানিয়েছিল।
কী খাবার?
চকোলেট স্যান্ডউইচ।
সুন্দরবাবু ফোঁস করে একটা নিশ্বাস ফেললেন বিরসবদনে।
জয়ন্ত জিজ্ঞাসা করল, মামলাটা কীসের?
কাল এই বাড়ি থেকে পঁচিশ হাজার টাকা চুরি গিয়েছে, আর সঙ্গে-সঙ্গে হয়েছে হত্যার চেষ্টা।
–তাহলে সামান্য মামলা নয় দেখছি। গোড়া থেকে সব খুলে বলুন।
সুন্দরবাবু যা বললেন, মোটামুটি তা হচ্ছে এই—
অনন্তচন্দ্র পাইন হচ্ছেন বিখ্যাত লৌহ ব্যবসায়ী। তার দোকান কলকাতার লোহাপট্টিতে এবং তার বসতবাড়ি গঙ্গার ধারে। তিনি বিপত্নীক ও নিঃসন্তান।
তাঁর পিতার দুই বিবাহ। তিনি প্রথম পক্ষের পুত্র। দ্বিতীয় পক্ষের পুত্রের নাম নবীনমাধব, বয়স ছাব্বিশ বৎসর। তার পিতা পরলোকে। তার বিমাতা ইহলোকেই বিদ্যমান বটে, কিন্তু বাস করেন পিত্রালয়ে, কারণ অনন্তবাবুর সঙ্গে তার বনিবনা নেই। তবে সপত্নী-পুত্র তাকে মাসোহারা থেকে বঞ্চিত করেননি।
অনন্তবাবুর সম্পত্তি সোপার্জিত এবং তার অবর্তমানে সেই সম্পত্তির অধিকারী হবে নবীনমাধবই। বিমাতার সঙ্গে না বলেও অনন্তবাবু তার বৈমাত্রেয় ভাইটিকে ভালোবাসেন যার পর নাই এবং এনে রেখেছেন নিজের কাছেই।
অনন্তবাবুর ম্যানেজারের নাম সুবোধকুমার বসু, লোহার কারবারে তিনিই তার দক্ষিণ হস্তের মতো। দশ বছরের বিশ্বাসী লোক, প্রভুর অনেক টাকা নিয়ে নাড়াচাড়া করেন।
ঘটনার দিন কাৰ্যসূত্রে অনন্তবাবুকে যেতে হয়েছিল আসানসোলে। সেইদিন সন্ধ্যার সময়ে দোকান বন্ধ করে সুবোধ পঁচিশ হাজার টাকা নিয়ে অনন্তবাবুর বাড়িতে আসে এবং দোতলার ঘরে লোহার সিন্দুকে টাকাগুলি রাখে। তারপর ঘরের দরজায় তালা দিয়ে সিন্দুকের ও দরজায় চাবি নবীনমাধবের হাতে অর্পণ করে নিজের বাসায় চলে যায়। সে বাস করে গঙ্গার অপর পারে ঘুষুড়িতে।
নবীন সন্ধ্যার পর বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়, ফিরে আসে ভোরবেলায়। রাত্রিবেলায় বাড়িতে ছিল একজন দারোয়ান, একজন ভৃত্য। আরও একজন দারোয়ান ও একজন ভৃত্য অনন্তবাবুর সঙ্গেই আসানসোলে গিয়েছিল। পাঁচক ও দাসী ঠিকা, তারা রাত্রে বাড়িতে থাকে না।
সকালে নবীন বাড়ি ফিরে আসবার আগেই ভৃত্য রঘুর নিদ্রাভঙ্গ হয়। সে বাইরে এসে দেখে, উঠোনের ওপরে পড়ে আছে দারোয়ানের অচৈতন্য দেহ, তার মাথায় প্রচণ্ড আঘাতের চিহ্ন, মাটির ওপরে রক্তের ধারা। আর একগাছা রুপো-বাঁধানো, মোটা রক্তাক্ত লাঠি!
তার চিৎকারে যখন লোকজন জড়ো হয়েছে, সেই সময়েই নবীন বাড়িতে ফিরে আসে। তারপর দেখা যায়, দোতলায় অনন্তবাবুর ঘরের দরজা খোলা, লোহার সিন্দুকেরও দরজা খোলা, পঁচিশ হাজার টাকা অদৃশ্য। নবীন তৎক্ষণাৎ পুলিশে খবর দেয়।
পুলিশ-তদন্তে এই তথ্যগুলি প্রকাশ পেয়েছে।
দরজায় ও লোহার সিন্দুকের চাবি কাল থেকে আজ পর্যন্ত নবীন একবারও কাছছাড়া করেনি। অথচ দরজায় তালা ও সিন্দুকটা যে চাবি দিয়েই খোলা হয়েছে, সে বিষয়ে কোনওই সন্দেহ নেই।
রাত্রে সে কোথায় ছিল, এই প্রশ্নের উত্তরে নবীন বলে, এক বন্ধুর বাড়িতে। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও তার কাছ থেকে বন্ধুর নাম ও ঠিকানা আদায় করা যায়নি।
দারোয়ানের দেহের পাশে যে মোটা লাঠিগাছা পাওয়া গিয়েছে, তার অধিকারী যে স্বয়ং নবীন সেটাও প্রমাণিত হয়েছে।
ভৃত্য রঘু বলে, রাত্রে সে কোনও শব্দ শোনেনি। দারোয়ান তাকে সিদ্ধি খাইয়ে দিয়েছিল। সিদ্ধি খেতে সে অভ্যস্ত নয়, ঘুমিয়ে একেবারে বেহুশ হয়ে পড়েছিল।
অপরাধী যে কেমন করে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করেছিল, এ সমস্যার কোনওই সমাধান হয়নি। সদর দরজা রঘু নিজের হাতে বন্ধ করেছিল। বাইরে থেকে বাড়ির ভিতর প্রবেশ করবার দ্বিতীয় কোনও উপায়ই নেই।
