হরিহরের আগেই জয়ন্ত সেই জমির ওপরে গিয়ে দাঁড়াল–তার পিছনে-পিছনে যদুবাবু এবং আর সবাই।
জমির সব জায়গাই তখনও ভিজে রয়েছে। জয়ন্ত বললে, যদুবাবু আমার পাশে-পাশে আসুন। মাটির ওপরে সাবধানে পা ফেলুন, চোরের পায়ের ছাপ মাড়িয়ে ফেললে হরিহরবাবু মহা খাপ্পা হয়ে উঠবেন।
তারা তিনকড়িবাবুর বৈঠকখানার গরাদ খোলা জানলাটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। একদিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে জয়ন্ত বললে, মাটির ওপরে ওই দেখুন চোরের পায়ের ছাপ। বেশ বোঝা যায়, সে বাঁশের বেড়া টপকে যেদিক থেকে এসেছে, আবার চলে গিয়েছে সেই দিকেই।
যদুবাবু বললেন, চোরটা কি বোকা! এতবড় একটা সূত্র পিছনে রেখে গিয়েছে।
জয়ন্ত হেসে বললে, চোরটা হচ্ছে কাঁচা, নইলে সে সাবধান হত।
এমন সময় তিনকড়ি প্রভৃতিকে নিয়ে হরিহর এসে পড়লেন। তিনি তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে পায়ের ছাপগুলোর দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।
তিনকড়ি বললেন, জুতো পরা পায়ের ছাপ। হরিহরবাবু, আমার বামুন আর চাকর জুতো পরে না।
হরিহর বললেন–হয়তো বাইরের চোরের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ আছে। রুলের গুঁতো খেলেই পেটের কথা বেরিয়ে পড়বে।
জয়ন্ত বললে, হরিহরবাবু, পায়ের ছাপগুলো দেখে কি বুঝলেন?
যা বোঝবার তা বুঝেছি। আপনাকে বলব কেন?
জয়ন্ত হাস্যমুখে বললে, বেশ, আপনি কি বুঝেছেন জানতে চাই না। কিন্তু আমি যা বুঝেছি, বলব কি?
হরিহর তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললেন, বলতে ইচ্ছা করেন, বলতে পারেন। আমার শোনার আগ্রহ নেই।
জয়ন্ত বললে, প্রত্যেক পায়ের দাগের মাঝখানের ব্যবধানটা লক্ষ্য করুন। এটা আপনাকে মনে করিয়ে দেওয়া বাহুল্য যে ঢ্যাঙা লোক পা ফেলে বেশি তফাতে-তফাতে আর খাটো লোক পা ফেলে কম তফাতে-তফাতে। এখানে পায়ের দাগের ব্যবধান দেখে কি মনে হয়?
হরিহর মাটির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, এগুলো নিশ্চয়ই কোনও ছোট ছেলে–অর্থাৎ বালকের পায়ের ছাপ!
ধরলাম তাই। এইবারে তিনকড়িবাবুর বৈঠকখানার দৃশ্যের কথা ভেবে দেখুন। তাঁর নোটগুলো ছিল আলমারির ওপর তাকে। মাথায় ছোট চোরের হাত উঁচুতে পৌঁছায়নি। তাই সে টেবিলের সামনে থেকে চেয়ারখানা আলমারির সামনে টেনে নিয়ে গিয়ে তার ওপরে উঠে দাঁড়িয়ে নোটগুলো হস্তগত করে। তারপর তাড়াতাড়ি পালাবার সময়ে তার পায়ের ধাক্কা লেগে চেয়ারখানা উলটে পড়ে যায়। এ ব্যাপারটা গোড়াতেই আমি আন্দাজ করতে পেরেছিলুম। এদিকে আপনারও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলুম। কিন্তু অধীনের কথা আপনি গ্রাহ্যের মধ্যেও আনতে রাজি হননি!
অপ্রতিভভাবে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন হরিহর।
তিনকড়ি বললেন, বালক চোর? কী আশ্চর্য!
যদুবাবু দুই চক্ষু বিস্ফারিত করে বললেন, একটা পুঁচকে ছোকরা বিশ হাজার টাকা হাতিয়ে লম্বা দিয়েছে। আজব কাণ্ড!
মাধববাবু বললেন, কালে কালে হল কি?
.
সাত
জয়ন্ত বললেন, হরিহরবাবু এই জুতো পরা পায়ের ছাপের আর একটা বিশেষত্ব লক্ষ করুন। চোর যে জুতো পরে এখানে এসেছিল, তার ডান পা-টার তলায় বাঁ-দিকের উপর-কোণের চামড়ার খানিকটা চাকলা উঠে গিয়েছে। এই দেখুন, প্রত্যেক ডান পায়ের ছাপেই তার স্পষ্ট চিহ্ন দেখা যাচ্ছে।
হরিহরের মুখের ওপর থেকে মুরুব্বিয়ানার ভাব মিলিয়ে গেল। তিনি বলে উঠলেন, তাই তো বটে, তাই তো বটে! তাকে পেলে তার বিরুদ্ধে মামলা সাজাতে আর কোনও কষ্ট হবে না। তার পরেই একটু থেমে মুষড়ে পড়ে তিনি আবার বললেন, কিন্তু তাকে আর পাব কি?
জয়ন্ত হাসতে-হাসতে বললে, চোর নিজেই আমাদের কাছে এসে ধরা দেবে। হরিহর সচমকে শুধোলেন, কি বললেন?
–চোরের খোঁজ আমি পেয়েছি।
–কোথায়, কোথায়?
–এইদিকে একটু এগিয়ে আসুন। এই পায়ের ছাপগুলো দেখে কি বুঝছেন?
–এও তো চোরেরই পায়ের ছাপ।
–কোনও তফাত নেই তো?
ভালো করে দেখে সন্দিগ্ধ স্বরে হরিহর বললেন, মনে হচ্ছে এ ছাপ যেন টাটকা!
জয়ন্ত বললে, ঠিক তাই। এগুলোর সৃষ্টি হয়েছে এইমাত্র। নির্বোধ চোর খেয়ালে আনেনি, কাল রাতের বিষম বৃষ্টির জন্যে মাটি এখনও ভিজে আছে। আরে, আরে, যদুবাবু খরগোশের মতো দৌড়ে কোথা যান? মানিক, হুশিয়ার!
সকলে বিপুল বিস্ময়ে দেখলে, যদুবাবুর বামনাবতারের মতো অতিখর্ব দেহখানি তীব্রবেগে দৌড় মেরেছে বাঁশের বেড়ার দিকে। কিন্তু বেড়া টপকাবার আগেই মানিক তাকে ছুটে গিয়ে গ্রেপ্তার করে ফেললে।
তিনকড়ি বিস্মিত স্বরে বললেন, যদু তুমি কার ভয়ে পালিয়ে যাচ্ছিলে?
জয়ন্ত বললে, পুলিশের ভয়ে। এখনি ওঁর বাড়ি খানা তল্লাশ করলে আপনার বিশ হাজার টাকার সন্ধান পাওয়া যাবে।
তিনকড়ি এ কথা যেন বিশ্বাস করতে পারলেন না। ফ্যাল ফ্যাল করে যদুবাবুর মুখের পানে তাকিয়ে রইলেন।
জয়ন্ত বললে, যখন চেয়ারের রহস্য আন্দাজ করলুম, পায়ের ছাপগুলো পরীক্ষা করলুম, আর স্বচক্ষে যদুবাবুর বালকের মতো খাটো মূর্তিখানা দর্শন করলুম, তখনি জেগে উঠেছিল আমার সন্দেহ। ওঁর আর তিনকড়িবাবুর সামনাসামনি বাড়ি। তিনকড়িবাবু যে বাড়িতে বিশ হাজার টাকা এনে রেখেছেন, ওঁর পক্ষে একথা জানা খুবই স্বাভাবিক। ওঁর বন্ধু যখন মাঝে মাঝে আলমারির ভিতর থেকে নোটগুলো বার করতেন, তখন সে দৃশ্য তিনি যে নিজের বাড়ি থেকেই দেখতে পেতেন, এইটুকুও অনুমান করা যায় খুব সহজেই। বৈঠকখানায় ছিল তার নিয়মিত আসা যাওয়া। আলমারির কলের ছাঁচ তোলার অবসর পেতে পারেন উনিই। সুতরাং অধিক বলা বাহুল্য। তবে একথা ঠিক যে, নিম্নশ্রেণির নির্বোধের মতো আজ যেচে ভিজে মাটি মাড়িয়ে উনি যদি আমার ফাঁদে পা না দিতেন, তাহলে এত তাড়াতাড়ি ওঁকে হরিহরবাবুর কবলে আত্মসমর্পণ করতে হত না।
