যদুবাবু আপত্তি করে বললেন, আমরা এখানে মজা দেখতে আসিনি, বন্ধুর দুঃখে সহানুভূতি জানাতে এসেছি।
মাধববাবু বললেন, আমরা ভেবেছিলুম, আপনি যখন এসেছেন তখন চোর ধরা পড়তে দেরি লাগবে না।
জয়ন্ত হাসতে-হাসতে বললে, পুলিশ যদি চোরকে ধরতে পারে তাহলে দেখবেন, চোর আপনার মতো মাথায় ছফুট উঁচু নয়।
মাধববাবু সবিস্ময়ে বললেন, বলেন কি? কেমন করে জানলেন?
–সেকথা বলবার আর সময় হবে না। ওই পুলিশ এসে পড়েছে।
.
পাঁচ
ইনস্পেকটর হরিহরবাবু একজন সহকারীকে নিয়ে গটগট করে ঘরের ভিতরে প্রবেশ করলেন। বয়সে প্রৌঢ়, মোটাসোটা দেহ, মুখে উদ্ধত ভাব।
রুক্ষস্বরে তিনি বললেন, ঘরে এত ভিড় কেন? বাড়ির কর্তা কে?
তিনকড়ি এগিয়ে এসে বললেন, আজ্ঞে আমি।
–আপনারই টাকা চুরি গিয়েছে?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
–ওঁরা কে?
–এঁরা আমার বন্ধু। আর উনি হচ্ছেন বিখ্যাত শৌখিন গোয়েন্দা জয়ন্তবাবু।
কৌতূহলী চোখে হরিহর একবার জয়ন্তের মুখের পানে তাকালেন। তারপর বললেন, শুনেছি ইনস্পেকটর সুন্দরবাবুকে মাঝে-মাঝে আপনি কোনও কোনও মামলায় সাহায্য করেন।
জয়ন্ত বিনীতভাবে বললে, আজ্ঞে, ঠিক সাহায্য করি বলতে পারি না, তবে সাহায্য করার চেষ্টা করি বটে।
মুখ টিপে হেসে হরিহর বললেন, এখানেও কি সেই চেষ্টা করতে এসেছেন?
–আজ্ঞে না। মশায়ের চেহারা দেখেই বুঝেছি আপনার কাছে আমার চেষ্টা নগণ্য।
–ঠিক। সুন্দরবাবুর সঙ্গে আমার মত মেলে না। আমার মত হচ্ছে, শখের গোয়েন্দার কাছে পেশাদার গোয়েন্দার শেখবার কিছুই নেই।
জয়ন্ত বললে, আপনার মত অভ্রান্ত। আমিও ওই মত মানি।
হরিহর বললেন, এইবার মামলার বৃত্তান্তটা আমি শুনতে চাই।
তিনকড়ি আবার সব কথা বলে গেলেন একে একে।
হরিহর সব শুনে বললেন, যে লোক এই বাজারে বিশ হাজার টাকা রাখে বৈঠকখানার কেতাবের আলমারিতে, তাকেই আমি অপরাধী বলে মনে করি। এ হচ্ছে চোরকে নিমন্ত্রণ করা আর খামকা পুলিশের কাজ বাড়ানো।
তিনকড়ি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন কঁচুমাচু মুখে।
জয়ন্ত বললে, টাকা ছিল ওই আলমারির ভিতরে।
হরিহর বললেন, টাকা যখন লোপাট হয়েছে, তখন আলমারিটা হাতড়ে আর কোনও লাভ হবে না।
–ওই যে চেয়ারখানা আলমারির সামনে উলটে পড়ে রয়েছে, ওখানা ছিল ওই টেবিলের সামনে।
বসবার জন্য চোর ওখানা টেনে এনেছিল আর কী!
হতেও পারে; না হতেও পারে!
–না হতেও পারে কেন?
–চোর চটপট কাজ হাসিল করে সরে পড়তে চায়। সে চেয়ার পেতে বসে বিশ্রাম করে না। আর করলেও সে টেবিলের সামনেই গিয়ে বসতে পারত, চেয়ারখানা এত দূরে। টেনে আনত না। বিশ্রাম করবার জন্য এখানে ঢালা বিছানাও রয়েছে, তবে চেয়ার নিয়ে টানাটানি কেন?
হরিহর ঠাট্টার সুরে বললেন, কেন? তার জবাব আপনিই দিন না।
–আপনি না পারলে পরে আমাকে জবাব দিতে হবে বইকী।
হরিহর মুখভার করে বললেন, আপনার জবাব শোনবার জন্যে আমার কোনওই আগ্রহ নেই। তিনকড়িবাবু, আলমারির কলে একটা চাবি লাগানো রয়েছে দেখছি।
–ও চাবি আমার নয়।
–চোরের?
–সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।
–চাবিটা নতুন।
–আলমারিটা খোলবার জন্য চোর হয়তো এই চাবিটা গড়িয়েছিল।
–তাহলে সে আগে এখানে এসে লুকিয়ে কলের ছাঁচ তুলে নিয়ে গিয়েছে।
–তাই তো জয়ন্তবাবু বললেন, এ কোনও সন্ধানী চোরের কাজ।
জয়ন্তবাবু না বললেও এটুকু আমি বুঝতে পারতুম। তিনকড়িবাবু, আপনার বাড়িতে আপনি ছাড়া আর কে কে আছে?
আমার স্ত্রী। আমার ছেলে নেই, কেবল একটি বিবাহিত মেয়ে আছে। সে শ্বশুরবাড়িতে। এখানে একজন রাত-দিনের চাকর, বামুন আর ঠিকে ঝি আছে।
হরিহর ফিরে নিজের সহকারীকে বললেন, সুশীল, বামুন আর চাকরকে সেপাইদের হেপাজতে রেখে এসো।
তিনকড়ি বললেন, আপনি কি তাদের সন্দেহ করছেন? তারা যে খুব বিশ্বাসী।
হরিহর ধমক দিয়ে বললে, আরে রাখুন মশাই! জানেন তো সব। এরকম বেশিরভাগ চুরির জন্যে দায়ী গৃহস্থের বামুন-চাকররা। যাও সুশীল।
জয়ন্ত বললে, চোর ওই গরাদ খুলে ঘরের ভিতর ঢুকেছে।
হরিহর উঠে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। খোলা গরাদটা হাতে করে তুলে নিয়ে। পরীক্ষা করতে করতে বললেন, এর মধ্যে বিশেষ দ্রষ্টব্য কিছুই নেই।
না। কিন্তু জানলার বাইরে কর্দমাক্ত জমির ওপরে চোরের পায়ের ছাপ আছে।
বটে, বটে! সেগুলো তো দেখতে হয়!
–গরাদ খোলা জানালার ফাঁক দিয়ে গলে বাইরে গিয়ে ছাপগুলো আমি দেখে এসেছি। কিন্তু আপনি কি তা পারবেন?
প্রবল মস্তকান্দোলন করে হরিহর বললেন, মোটেই নয়, মোটেই নয়। ওইটুকু ফাঁক দিয়ে কিছুতেই আমার গতর গলবে না। আমার দেহ গলবার জন্যে দরকার একটা গোটা দরজার ফাঁক। তিনকড়িবাবু, ওই জমিতে যাবার জন্য পথ আছে তো?
–আছে। আসুন। এই বলে তিনকড়ি অগ্রবর্তী হলেন!
যদুবাবু চুপিচুপি বললেন, জয়ন্তবাবু, একটা আরজি জানাতে পারি?
জয়ন্ত বললে, নিশ্চয়ই পারেন।
–আমি গোয়েন্দার গল্প পড়তে ভারি ভালোবাসি। কিন্তু সত্যিকার গোয়েন্দারা কেমন করে কাজ করেন তা কখনও দেখি নি। শুনেছি, পায়ের ছাপ দেখে গোয়েন্দারা অনেক কথাই বলতে পারেন। আপনাদের কাজ দেখবার জন্যে আমার বড় আগ্রহ হচ্ছে।
–বেশ তো, আসুন না।
মাধববাবু বললেন, আমাদেরও আগ্রহ কম নয়। আমরাও যেতে পারি কি?
জয়ন্ত বললে, আপনারা সবাই আসুন।
.
ছয়
ছোট একফালি জমি লম্বায় পঁচিশ হাত, চওড়া আট হাত। দক্ষিণ দিকে বাঁশের বেড়া, তারপর রাজপথ।
