তা ছাড়া আর কি?
জয়ন্ত পকেট থেকে রূপোর ছোট্ট ডিপে বার করে নস্য নিতে নিতে (এটা হচ্ছে তার আনন্দের লক্ষণ–নিশ্চয়ই সে কোনও উল্লেখযোগ্য সূত্র আবিষ্কার করেছে) বললে, বটে, বটে, বটে। আপনার সেই জাল কেতাবে পুরে আসল নোটগুলো আলমারির কোনও তাকে রেখেছিলেন?
তিনকড়ি থতমত খেয়ে বললেন, জাল কেতাব?
–হ্যাঁ, জাল কেতাব। অর্থাৎ যা কেতাবের মতো দেখতে, কিন্তু কেতাব নয়।
–ও, বুঝেছি। সেই কেতাব-বাক্সটা ছিল আলমারির সব-উপর তাকে।
যা ভেবেছি তা বলতে-বলতে জয়ন্ত আলমারির কাছে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর আলমারিটা পরীক্ষা করতে করতে আবার বললে, আলমারির কলে যে চাবিটা লাগানো রয়েছে সেটা কি আপনার?
তিনকড়ি বললেন, আজ্ঞে না। ওটা নিশ্চয়ই চোরের সম্পত্তি।
–তাহলে এ চোর পেশাদার চোর নয়।
কী করে বুঝলেন?
–পেশাদার চোরের কাছে প্রায়ই চাবির গোছা থাকে, এরকম একটি মাত্র চাবি থাকে না। এখানে চোর এসেছিল একটি মাত্র চাবি নিয়ে। তার মানে সে জানত, এই একটি মাত্র চাবি দিয়েই সে কেল্লা ফতে করতে পারবে। যদি বলেন, সে এতটা নিশ্চিত হয়েছিল কেন? তবে তার উত্তর হচ্ছে, সে আগে থাকতেই যে-কোনও সুযোগে এই আলমারির কলে একটা। মোমের বা অন্য কিছুর ছাঁচ তুলে নিয়ে বিশেষ একটি চাবি গড়ে তবে এখানে এসেছিল। চুরি তার ব্যবসা নয়, এ চাবি পরে তার কোনও কাজে লাগবে না, তাই চাবিটাকে সে এখানে পরিত্যাগ করেই প্রস্থান করেছে। তিনকড়িবাবু, দেখছি ওই জানলাটার একটা গরাদ নেই। চোর কি ওইখান দিয়েই ঘরের ভিতরে প্রবেশ করেছিল?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
জয়ন্ত জানলাটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর জানলাটা ভালো করে পরীক্ষা করে ফাঁক দিয়ে গলে বাইরে গিয়ে লাফিয়ে পড়ল।
মাটির ওপর কিছুক্ষণ হুমড়ি খেয়ে বসে কি পর্যবেক্ষণ করলে! তারপর উঠে বললে, মানিক কাল রাত্রে কখন বৃষ্টি থেমেছিল, তুমি তা জানো তো?
মানিক বললে, হ্যাঁ, আমি তখনও জেগেছিলুম। বৃষ্টি থেমেছিল রাত দুটোর সময়ে।
–তাহলে এখানে চোরের আবির্ভাব হয়েছে রাত দুটোর পর।
সদাশিব শুধোলেন, একথা কেমন করে জানলে?
জয়ন্ত বললে, খুব সহজেই। ভিজে মাটির ওপরে রয়েছে কয়েকটা স্পষ্ট পায়ের দাগ। নিশ্চয়ই চোরের পদচিহ্ন। কালকের প্রবল বৃষ্টিপাতের ভিতরে চোর এখানে এলে সব পায়ের দাগ ধুয়ে মুছে যেত। হ্যাঁ, পায়ের দাগেও বেশ বিশেষত্ব আছে!
তিনকড়ি সাগ্রহে বললেন, কি বিশেষত্ব?
যথাসময়ে প্রকাশ্য, বলতে-বলতে জয়ন্ত আবার জানালার ফাঁক দিয়ে গলে ঘরের ভেতরে এসে দাঁড়াল। তারপর নিম্নস্বরে আবার বললে, তিনকড়িবাবু, একটা কথা জিজ্ঞাসার আছে।
আজ্ঞ করুন।
–আপনি আলমারির ভিতর থেকে জাল কেতাবখানা মাঝে মাঝে বার করতেন?
–আজ্ঞে হ্যাঁ, করতুম। দেখতুম নোটগুলো যথাস্থানে আছে কিনা!
–তখন নিশ্চয়ই ঘরের ভিতরে আপনি একলা থাকতেন।
–সেকথা জিজ্ঞাসা করাই বাহুল্য।
জানলার ভিতর দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে জয়ন্ত নিজের মনে কি ভাবতে লাগল কিছুক্ষণ। তারপর শুধোলো, রাস্তার ওপারে ওই যে লাল রঙের বাড়ি রয়েছে, ওখানা কার বাড়ি?
যদুবাবুর। আমার এক বিশেষ বন্ধু।
–তার পাশের ওই হলদে বাড়িখানা?
–মাধববাবুর। তিনিও আমার বিশেষ বন্ধু।
–আচ্ছা, অনেকক্ষণ থেকে লক্ষ করছি, একটি ছোটখাটো ভদ্রলোক বারবার দরজার ওপাশ থেকে উঁকিঝুঁকি মারছেন, উনি কে?
তিনকড়ি বললেন, আমিও দেখেছি। ওঁরই নাম যদুবাবু।
যদুবাবুও জয়ন্তের প্রশ্ন শুনতে পেলেন। দরজার সামনে এসে তিনি বললেন, জয়ন্তবাবু ক্ষমা করবেন। আমি আমার কৌতূহল সংবরণ করতে পারছিলুম না। কে না জানে, আপনি হচ্ছেন এক আশ্চর্য জাদুকর গোয়েন্দা। আজ এখানে এসে আবার কি জাদু সৃষ্টি করেন, তাই দেখবার জন্যে আমার আগ্রহের আর সীমা নেই।
জয়ন্ত সহাস্যে বলল, ব্যাপারটা এতই স্পষ্ট যে, কোনও জাদু সৃষ্টি করবার দরকার নেই। আমার যা জানবার তা জেনেছি। এখন আপনারা সকলেই ঘরের ভিতরে আসতে পারেন।
-তাই নাকি? তাই নাকি? বলতে-বলতে ও হাসতে-হাসতে সর্বপ্রথমেই ঘরের ভিতরে পর্দাপণ করলেন যদুবাবু। ছোটখাটো বললেই তার চেহারার বর্ণনা করা হয় না, ভগবানের দয়ায় তিনি বামন হতে হতে বেঁচে গিয়েছেন কারণ তার দেহের দৈর্ঘ্য সাড়ে চার ফুটের চেয়ে বেশি নয়, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সেই অনুসারেই মানানসই–যদিও তার দেহখানি ছোটর ভিতরেই দিব্যি নাদুসনুদুস।
যদুবাবুর পর দেখা দিলেন মাধববাবু, দস্তুরমতো দশাসই চেহারা,–উচ্চতাতেও ছয় ফুটের কম হবে না। এলেন আরও জনচারেক ভদ্রলোক।
তিনকড়ি একে-একে সকলের সঙ্গে জয়ন্তের আলাপ করিয়ে দিয়ে বললেন, আমার তাস দাবা খেলার সঙ্গী হচ্ছেন এঁরাই।
জয়ন্ত মুখে কিছু বললে না, কেবল একবার করে চোখ বুলিয়ে প্রত্যেকের মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখে নিলে।
মাধববাবু বললেন, বলেন কি জয়ন্তবাবু, ব্যাপারটা এখনই আপনার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে?
আজ্ঞে হ্যাঁ। খুব স্পষ্ট।
–কিন্তু আমরা তো স্পষ্ট কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।
–এখানে কাল রাতে চুরি হয়ে গিয়েছে।
–তাই তো শুনছি।
–চোর ওই গরাদ খুলে এই ঘরে ঢুকেছে।
তাই তো দেখছি।
–তাহলে ব্যাপারটা কি স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না?
উঁহু! চোর কে?
–সেটা পুলিশ এসে আবিষ্কার করবে। আমি এখানে চোর ধরতে আসিনি, আপনাদের মতো মজা দেখতে এসেছি।
