তিনকড়ি করুণস্বরে বললেন, সদাশিববাবু, আমার মতন লোকের কাছে এ চুরি সাধারণ চুরি নয়। ওই বিশ হাজার টাকার দাম আমার কাছে কত, আপনি তা জানেন? আপনি যদি দয়া করে আমার জন্যে জয়ন্তবাবুকে একটু অনুরোধ করেন
সদাশিববাবু বললেন, বেশ, তা করছি। জয়ন্ত, আমারও ইচ্ছা–
জয়ন্ত বাধা দিয়ে বললে, আর বলতে হবে না, তোমার ইচ্ছা কি বুঝেছি। কিন্তু নিমন্ত্রণ খেতে এসে চুরির মামলা নিয়ে জড়িয়ে পড়বার ইচ্ছা আমার মোটেই নেই। বড়জোর তিনকড়িবাবুর মুখে চুরির বিবরণ শুনে ঘটনাস্থলে একবার চোখ বুলিয়ে আসতে পারি। তার বেশি আর কিছু পারব না।
তিনকড়ি আশান্বিত হয়ে বললে, আমার পক্ষে তাই হবে যথেষ্ট।
.
তিন
জয়ন্ত শুধোলে, আপনার টাকাগুলো কোথায় ছিল?
–একতলায়, আমার পড়বার ঘরে বইয়ের আলমারির ভিতরে।
বলেন কি, অত টাকা রেখে দিয়েছিলেন বইয়ের আলমারির ভিতরে!
–দোতলার ঘরে আমার লোহার সিন্দুক আছে বটে, কিন্তু বছর চারেক আগে আর একবার চোর এসে সিন্দুক থেকে তিন হাজার টাকা নিয়ে গিয়েছিল, তাই তার ভিতরে আর দামি কিছু রাখতে ভরসা হয় না।
টাকাগুলো ব্যাঙ্কে জমা রাখেননি কেন?
–তাই তো রেখেছিলুম জয়ন্তবাবু। কিন্তু গেল বছরে ভিতরে ভিতরে খবর পাই, আমার ব্যাঙ্ক লালবাতি জ্বালবার আয়োজন করছে। তাড়াতাড়ি টাকা তুলে আনলুম আর তার দিন। ছয়েক পরেই ব্যাঙ্ক দরজা বন্ধ করলে, অনেক হতভাগ্যের সর্বনাশ হল। ব্যাপার দেখে আমি এমন নার্ভাস হয়ে গেলুম যে, টাকাগুলো আর কোনও ব্যাঙ্কেই জমা রাখতে পারলুম না।
–আপনার বাড়িতেই যে অত টাকা আছে, এ-খবর আর কেউ জানত?
–আমি তো জন-প্রাণীর কাছে ও-টাকার কথা বলিনি।
–কিন্তু ব্যাঙ্ক থেকে যে আপনি টাকা তুলে এনেছেন এটা তো অনেকেই জানে।
–তা জানে বটে।
–আর নতুন কোনও ব্যাঙ্কে আপনি টাকা জমা রাখেননি এ খবরটাও তো কেউ কেউ রাখতে পারে?
–তাও পারে বটে। কিন্তু চোর কেমন করে জানবে যে এত জায়গা থাকতে আমি বইয়ের আলমারির ভিতরেই অত টাকা লুকিয়ে রেখেছি?
–তিনকড়িবাবু এ হচ্ছে সন্ধানী চোর। সে কেমন করে আপনার পড়বার ঘরে ঢুকেছে।
–সেটা, খালি আমার পড়বার ঘর নয়, আমার বৈঠকখানাও। তার দক্ষিণ দিকে হাত আস্টেক চওড়া আর বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা একটুখানি জমি আছে, তার পরেই সরকারি রাস্তা। চোর সেই বেড়া টপকে এসেছে। প্রথমে খড়খড়ির পাখি তুলে ফাঁক দিয়ে আঙুল গলিয়ে জানলা খুলেছে। তারপর কোনও তীক্ষ্ণ অস্ত্র বা বাটালি দিয়ে একটা গরাদের গোড়ার দিককার কাঠ খানিকটা কেটে ফেলে গরাদটা সরিয়ে ফেলেছে। তারপর ঘরে ঢুকে নিজের চাবি দিয়ে আলমারি খুলে টাকা নিয়ে সরে পড়েছে। কিন্তু এখনও আমি এই ভেবেই আশ্চর্য হচ্ছি যে টাকা সে আবিষ্কার করলে কেমন করে?
–কেন?
টাকাগুলো আমি সাধারণভাবে লুকিয়ে রাখিনি। দপ্তরিকে ফরমাজ দিয়ে আমি ঠিক কেতাবের মতো দেখতে একটি বাক্স তৈরি করিয়ে ছিলুম আর তারই ভিতরে রেখেছিলুম বিশ খানা হাজার টাকার নোট। আলমারির বাইরে দেখে দেখলে বাক্সটাকে সোনার জলে নাম লেখা একখানা সাধারণ বই ছাড়া আর কিছুই মনে করবার উপায় ছিল না।
–পড়বার ঘরই আপনার বৈঠকখানা? সেখানে তাস-দাবা-পাশার আসরও বসত?
–তা বসত বইকী, রোজ নয়–শনি-রবিবারে আর ছুটির দিন।
–সে আসরে নিয়মিতভাবে অনেকেই আসতেন?
–আমার বন্ধুর সংখ্যা বেশি নয় জয়ন্তবাবু। নিয়মিতভাবে আমাদের বৈঠকে যে ছয় সাত জন লোক আসেন, চুরির খবর পেয়ে তারা সকলেই আমার বাড়িতে ছুটে এসেছেন, আপনি সেখানে গেলেই তাদের দেখতে পাবেন।
–বেশ, তবে তাই হোক। পুলিশের আগেই আমি ঘটনাস্থলে হাজির হতে চাই।
.
চার
একখানা ছোটখাটো দোতলা বাড়ি। সামনে অপেক্ষা করছে জনকয়েক কৌতূহলী লোক। জয়ন্ত ও মানিক তাদের মধ্যে কারুকে কারুকে গতকল্য সন্ধ্যায় দেখেছিল সদাশিববাবুর বাড়িতেও।
তিনকড়ি বাড়ির ভিতরে ঢুকে তার পাঠগৃহের দরজার তালা খুলে ফেললেন।
জয়ন্ত গলা তুলে সকলকে শুনিয়ে বলল, তিনকড়িবাবু, বাইরে এঁদের এইখানেই অপেক্ষা করতে বলুন। আগে আমরা ঘরের ভিতরটা পরীক্ষা করে দেখি, তারপর অন্য কথা।
মাঝারি আকারের ঘর। মাঝখানে একখানা গালিচা বিছানো তক্তাপোশ। এদিকে একটি ছোট টেবিল ও দুখানা চেয়ার। আর একদিকে দুটি বই-ভরা আলমারি এবং আর একদিকেও পুস্তকপূর্ণ সেলফ। একটি আলমারির সামনে মেঝের ওপরে উলটে পড়ে রয়েছে একখানা চেয়ার। ঘরের এখানে-ওখানে যেখানে-সেখানেও ছড়ানো রয়েছে নানা আকারের কেতাব ও মাসিকপত্র প্রভৃতি। দেখলেই বোঝা যায় যে তিনকড়িবাবু হচ্ছেন দস্তুরমতো গ্রন্থকীট।
জয়ন্ত মিনিট-দুয়েক ধরে নীরবে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে ঘরের চারিদিকে দৃষ্টি সঞ্চালন করতে লাগল। তারপর জিজ্ঞাসা করলে, তিনকড়িবাবু, টাকা চুরি গিয়েছে কোন আলমারির ভিতর থেকে?
তিনকড়ি অঙ্গুলি নির্দেশ করে দেখিয়ে দিলেন।
–ওর সামনে একখানা চেয়ার উলটে রয়েছে কেন?
জানি না। তবে ওটা হচ্ছে চোরেরই কীর্তি। কারণ কাল রাত্রে আমি যখন এঘরের দরজা বন্ধ করে যাই, চেয়ারখানা তখন চার পায়ে ভর করে দাঁড়িয়েই ছিল।
–আপনি কাল যখন ঘর থেকে বেরিয়ে যান চেয়ারখানা তখন কোথায় ছিল?
–ওদিককার টেবিলের সামনে।
–তা হলে চোরই চেয়ারখানা আলমারির সামনে টেনে এনেছে?
