নয় ঘণ্টা ধরে যুদ্ধ চলল অশ্রান্তভাবে। অসংখ্যের বিরুদ্ধে মাত্র দুইজনের আত্মরক্ষার এমন কাহিনি কোনও ইতিহাসেই লেখা নেই।
রাত চারটের সময়ে বন্দুক, রিভলভার ও কলের কামানের অগ্নিবৃষ্টিতে ক্ষতবিক্ষত সেই ছোট বাড়িখানা ডিমাইটের মুখে প্রায় ভেঙে গুঁড়ো হয়ে গেল।
কিন্তু তখনও তার ভিতর থেকে আর একবার বুলেটের ঝড় ছুটে এল–সেই শেষবার। তারপর সব চুপচাপ। পুলিশ ও সৈন্যগণ সেখানে গিয়ে পেলে কেবল গার্নিয়ার ও ভ্যালেটের মৃতদেহ। অসংখ্য গুলির চোটে তাদের দেহ ঝুঁজরা হয়ে গেছে।
কিছুদিনের ভিতরেই বোনোট-সম্প্রদায়ের আর-সব লোকও ধরা পড়ল। অনেকের যাবজ্জীবন জেল হল এবং অনেকে গিলেটিনে প্রাণ দিলে। কেউ করলে আত্মহত্যা।
কিন্তু বোনোটের দলের কেউ কম যায় না। ক্যারুয়ি নামে বোনোটের এক সঙ্গীকে পুলিশ গ্রেপ্তার করলে। কিন্তু পাছে সে আত্মহত্যা করে, এই ভয়ে তাকে উলঙ্গ অবস্থায় জেলখানায় বন্ধ করে রাখা হল। তবু একদিন সে ফাঁক পেয়ে বানরের মতো দেওয়াল বেয়ে পাঁচতলার ছাদের উপরে গিয়ে উঠল এবং চিৎকার করে বললে, ঘড়িতে যেই বারোটা বাজবে, অমনি আমি এখান থেকে লাফিয়ে পড়ে প্রাণ বিসর্জন দেব!
জেলের কর্তা কাকুতিমিনতি করে বললেন, ছিঃ অমন কাজ কি করতে আছে? লক্ষ্মী ছেলেটির মতন নীচে নেমে এসো!
ক্যারুয়ি সেকথা আমলেই আনলে না।
জেলের কর্তা তখন পাঁচতলার ছাদে লোক পাঠিয়ে তাকে ধরবার উদ্যোগ করলেন। ক্যারুয়ি তখন কাকুতিমিনতি করে বললে, ছিঃ, অমন কাজ কি করতে আছে? বেলা বারোটার আগে কারুকে ওপরে পাঠিও না, তাহলে আমার প্রতিজ্ঞাভঙ্গ হবে যে।
জেলের কর্তা তার কথা আমলেই আনলেন না, তাকে ধরবার জন্যে লোক পাঠালেন। কিন্তু সে লোক উপরে আসবার আগেই ক্যারুয়ি ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে প্রাণত্যাগ করলে!
এই বোনোট ও তার দলের কথা যখন মাঝে মাঝে ভাবি তখন মনে হয় যে, বিপথে চালিত হয়ে এদের এমন অতুলনীয় বীরত্বও ব্যর্থ হয়ে গেল। নিজেদের সাহস ও শক্তির অপব্যবহার না করলে পৃথিবীর শ্রদ্ধা-পূজা লাভ করে আজ হয়তো তারা নিত্য স্মরণীয় হতে পারত।
হিংসুক পশুজীবন যাপন করে বলেই বাঘ-সিংহকে কেউ বীর বলে ডাকে না।
একখানা উলটে-পড়া চেয়ার (উপন্যাস)
এক
সদাশিব মুখোপাধ্যায়। যখন জয়ন্ত ও মানিককে গোয়েন্দা বলে কেউ জানত না, তিনি তখন থেকেই বন্ধু।
জমিদার মানুষ। বাস করেন শিবপুরের গঙ্গার ধারে মস্ত এক বাড়িতে। জয়ন্ত ও মানিক আজ তার কাছে এসেছে সান্ধ্যভোজের নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে।
তখন সন্ধ্যার শাঁখ বাজেনি। সদাশিববাবুর সাজানো গুছানো লম্বাচওড়া বৈঠকখানায় বসে জয়ন্ত ও মানিক গল্প করছে সকলের সঙ্গে। সকলে মানে, সদাশিববাবু ও তার কয়েকজন প্রতিবেশী বন্ধু। তারা আকৃষ্ট হয়েছেন ভূরিভোজনের লোভে নয়, জয়ন্তের নাম শুনেই। জয়ন্তের মুখে তার কোনও কোনও মামলার কথা শুনবেন, এই তাঁদের আগ্রহ।
কিন্তু জয়ন্তর আগ্রহ জাগ্রত হচ্ছে না নিজের মুখে নিজের কথা ব্যক্ত করবার জন্যে।
ভদ্রলোকেরা তবু নাছোড়বান্দা। তাদের মধ্যে সবচেয়ে কৌতূহলী হচ্ছেন আবার তিনকড়িবাবু, তিনি সদাশিববাবুর বাড়ির খুব কাছেই থাকেন। আগে কোনও সরকারি অফিসের কর্মচারী ছিলেন, এখন কাজ থেকে অবসর গ্রহণ করেছেন। বয়সে ষাট পার হয়েছে। বিপত্নীক ও নিঃসন্তান।
অবশেষে অনুরোধ উপরোধের ঠেলায় পড়ে জয়ন্ত বলতে বাধ্য হল? আচ্ছা, তাহলে এমন কোনও কোনও মামলার কথা বলতে পারি, যেগুলো আমি হাতে নিয়ে ব্যর্থ হয়েছি।
তিনকড়িবাবু বললেন, না-না, তাও কি হয়! আমরা আপনাদের সফলতার ইতিহাসই শুনতে চাই। ব্যর্থ মামলা তো অসমাপ্ত গল্প।
জয়ন্ত শেষে নাচার হয়ে বললে, মানিক, আমাকে রক্ষা করো ভাই! আমি নিজের গুণকীর্তন করতে পারব না কিছুতেই। তুমিই হয় ওঁদের দু-একটা মামলার কথা শোনাও।
তাই হল। জয়ন্তের কাহিনি নিয়ে মানিক ঘণ্টা দুই সকলকে মাতিয়ে রাখলে।
তারপর সদাশিবাবু ঘোষণা করলেন, আর নয় এইবার খাবার সময় হয়েছে।
আসর ভাঙল।
কিন্তু খেতে বসতে না বসতেই আকাশ বলে ভেঙে পড়ি। বজ্রের হুঙ্কার, ঝড়ের চিৎকার, গঙ্গার হাহাকার। বিদ্যুতের পর বিদ্যুতের অগ্নিবাণের আঘাতে কালো আকাশ যেন খানখান হয়ে গেল। তারপর ঝড় কাবু হতে না হতেই শুরু হল বৃষ্টির পালা। আর সে কি যে সে বৃষ্টি। দেখতে-দেখতে মাটির বুক হয়ে গেল জলে জলে জলময়!
সদাশিববাবু বললেন, জয়ন্ত, মানিক। আজ আর বাড়ি যাবার নাম মুখে এনো না। বাড়িতে ফোন করে দাও, আজ এখানেই তোমরা রাত্রিবাস করবে।
.
দুই
সকালে সদাশিববাবু, বললেন, যাবার আগে চা পান করে যাও।
মানিক বললে, সাধুপ্রস্তাব।
অনতিবিলম্বে চায়ের সঙ্গে এল আরও কিছু। এবং চায়ের পেয়ালায় দু-একটা চুমুক দিতে না দিতেই হন্তদন্তের মতো ছুটে এসে তিনকড়িবাবু বললেন, আমার সর্বনাশ হয়েছে!
সদাশিববাবু বললে, ব্যাপার কি তিনকড়িবাবু?
–চোরে আমার বিশ হাজার টাকা নিয়ে পালিয়েছে।
জয়ন্ত বললে, থানায় খবর পাঠিয়েছেন।
–পাঠিয়েছি। পুলিশ এখনও আসেনি। কিন্তু পুলিশ আসবার আগে আপনাকে আমি চাই।
জয়ন্ত সবিস্ময়ে বললে, আমাকে!
আজ্ঞে হ্যাঁ। পুলিশের চেয়ে আপনার উপরেই আমার বেশি বিশ্বাস।
–আমাকে মাপ করবেন। এসব সাধারণ চুরির মামলা নিয়ে আমি মাথা ঘামাতে চাই না। পুলিশ অনায়াসেই এরকম মামলার কিনারা করতে পারবে।
