রিভলভারের শব্দে নীচে থেকে একজন পুলিশের লোক ছুটে এল। একটা দেশলাইয়ের কাঠি জ্বেলে সে দেখলে, ঘরের মেঝের উপরে রক্তগঙ্গার মাঝখানে তিন-তিনটে মৃতদেহ স্থির হয়ে পড়ে রয়েছে। তার পায়ের শব্দ পেয়ে বোনোটও মৃত্যুর ভান করে আড়ষ্ট হয়ে রইল!
পাহারাওয়ালাটা তাড়াতাড়ি খবর দেওয়ার জন্যে আবার নীচের দিকে ছুটল। সেই ফাঁকে উঠে পড়ে বোনোট জানলা খুলে বেরিয়ে ছাদে চড়ে চম্পট দিলে!
তিনদিন পরে বোনোট গ্রেনঘড নামে এক দপ্তরিকে আক্রমণ ও আহত করলে। সে মিথ্যা সন্দেহ করেছিল যে, ওই দপ্তরিই তার বিরুদ্ধে থানায় খবর দিয়ে এসেছে।
.
তিন
ডুবইস ছিল বোনোটের বিশেষ বন্ধু। গোয়েন্দারা খবর পেলে, বোনোট তার বন্ধুর মোটরগাড়ির কারখানায় লুকিয়ে আছে।
তখন পুলিশের ফৌজ সেইদিকে ছুটল!
বোনোট তখন কারখানার বাইরে একখানা মোটরবাইকে চড়বার চেষ্টা করছিল। হঠাৎ পুলিশের আবির্ভাব দেখেই সে বাড়ির বাইরের সিঁড়ি দিয়ে উপরে ছুটল এবং সঙ্গে সঙ্গে রিভলভারও ছুঁড়তে লাগল। দুজন ইনস্পেকটর তার অব্যর্থ লক্ষ্যে আহত হলেন। পুলিশের পল্টনও বাড়ি আক্রমণ করলে, কিন্তু অত্যান্ত গুলিবৃষ্টির চোটে সকলে আবার পিছিয়ে আসতে বাধ্য হল।
কারখানা বাড়িটা ছিল একেবারে খোলা জায়গায়। কোনও দিক দিয়েই লুকিয়ে তার কাছে এগুবার উপায় ছিল না।
চারিদিক থেকে খবর পেয়ে দলে দলে তোক বন্দুক প্রভৃতি নিয়ে ছুটে এল–পুলিশকে সাহায্য করবার জন্যে।
কিন্তু বোনোট ও তার স্যাঙাত ডুবইসের রিভলভারের ঘন-ঘন গর্জন শুনে কেউই আর বাড়ির কাছে ঘেঁষতে ভরসা করলে না!
বেলা দশটার সময় পুলিশসাহেব বুঝলেন, কেবল পাহারাওয়ালাদের সাহায্যে বোনোটকে বন্দি করা যাবে না। তখন খবর দিয়ে সৈন্যদের আনানো হল।
খড়ে-বোঝাই মালগাড়ির আড়ালে লুকিয়ে সৈন্যেরা ডিনামাইট দিয়ে বাড়ির দেওয়ালের খানিকটা উড়িয়ে দিলে।
কিন্তু তবু বিশেষ সুবিধা হল না। বরং, ভাঙা-দেওয়ালের ভিতর দিয়ে বোনোট ও ডুবইসের বন্দুক আরও বেশি গুলিবৃষ্টি করবার সুযোগ পেলে!
বৈকাল পর্যন্ত সমান যুদ্ধ চলল–একপক্ষে পুলিশবাহিনী, সৈন্যদল ও সারা শহরের বাসিন্দা, ও অন্যপক্ষে মাত্র দুটি প্রাণী। এমন যুদ্ধ কখনও হয়নি!
কিন্তু অসম্ভব কবে সম্ভব হয়? সৈন্যেরা ডিনামাইটের সাহায্যে বাড়ির আরও খানিকটা ভেঙে ফেলে তার চারিদিকে আগুন লাগিয়ে দিলে।
তারপর সকলে একসঙ্গে বাড়িখানাকে আক্রমণ করলে।
বাড়ির ভিতর থেকে আর কোনও সাড়া পাওয়া গেল না।
নীচের তলায় দেখা গেল, ডুবইসের মৃতদেহ পড়ে রয়েছে, তার গায়ে তিন-তিনটে গুলির চিহ্ন! উপর-তলার ভগ্নস্তূপের ভিতরে গিয়ে পুলিশসাহেব প্রথমটা কিছুই দেখতে পেলেন না।
তারপর দেখলেন, রাশিকৃত আজে-বাজে জিনিষের তলা থেকে একখানা হাত দেখা যাচ্ছে। এবং সেই হাতে রয়েছে একটা রিভলভার!
হাতসুদ্ধ রিভলভারটা কাঁপাতে কাঁপাতে উঠে আর-একবার অগ্নিবৃষ্টি করলে।
সেইসঙ্গে পুলিশসাহেবও রিভলভার ছুঁড়লেন।
হাতখানা নেতিয়ে মাটির উপরে লুটিয়ে পড়ল।
সেই হাত ধরে পুলিশসাহেব বোনোটকে টেনে বার করলেন।
বোনোটের তখন প্রায় অজ্ঞান অবস্থা। তার দেহের বারো জায়গায় ও মাথার তিন জায়গায় বুলেটের ক্ষতচিহ্ন!
শহরের বাসিন্দারা বোনোটের দেহকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলবার উপক্রম করলে। অনেক কষ্টে তাদের নিবারণ করে বোনোটকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হল। কিন্তু বিশ মিনিট পরেই তার প্রাণ বেরিয়ে গেল।
তার জামার ভিতরে পাওয়া গেল লেখাটুকুঃ
আমি আমারই মতো জীবনযাপন করব। প্রত্যেক লোকেরই বাঁচবার অধিকার আছে। কিন্তু তোমাদের ওই পাপী ও নির্বোধ সমাজ যখন আমাকে বাঁচতে দিতে রাজি নয়, তখন কি আর করা যায়? আমাকে মরতেই হল।
.
চার
ডাকাত সর্দার বোনোট মরল বটে, কিন্তু তার ডানহাত ও বামহাত এখনও বেঁচে আছে। তার দল এখনও ভাঙেনি।
গার্নিয়ার আর ভ্যালেট, এরাই ছিল বোনোটের ডানহাত আর বামহাতের মতো।
কিন্তু সারা দেশের চোখে তারা কতদিন ধুলো দিতে পারে? হস্তাদুয়েক পরে খবর পাওয়া গেল, তারা নদীর ধারে একখানা বাড়ি ভাড়া নিয়ে বাস করছে! কেবল তাই নয়, দরকার হলে লড়াই করবার জন্যে তারা এই বাড়িখানাকে কেল্লার রসদখানায় পরিণত করেছে এবং এ-বাড়িখানাও এমন জায়গায় আছে যে, কোনওদিক থেকেই লুকিয়ে তার কাছে ঘেঁষবার উপায় নেই।
তখনি বাড়িখানাকে অবরোধ করবার ব্যবস্থা হল। চোদ্দোখানা মোটর ভর্তি করে পুলিশের লোক ছুটল এবং তাদের সঙ্গে চলল শত-শত সৈন্য, কলের কামান-শ্রেণি ও অনেকগুলো সার্চলাইট! এ যেন কোনও দেশজয়ের আয়োজন!
আক্রমণকারীরা যথাস্থানে হাজির হয়ে সবিস্ময়ে দেখলে, খবর পেয়ে তাদের আগেই হাজার হাজার লোক শত-শত মোটরে চড়ে সেখানে গিয়ে উপস্থিত হয়েছে।
তখন রাতের বেলা। উজ্জ্বল সার্চলাইটগুলো কিন্তু রাতকেও দিন করে ফেললে। বড়-বড় লোহার থামের আড়ালে দেহ ঢেকে পুলিশ ও ফৌজ ডাকাতদের বাড়ি আক্রমণ করলে, কলের কামানগুলো চেঁচিয়ে লোকের কানে তালা ধরিয়ে দিতে লাগল, এবং চতুর্দিক কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগল, থেকে থেকে ডিনামাইটের গভীর গর্জনে!
গার্নিয়ার ও ভ্যালেটও হাত গুটিয়ে বসে রইল না, তাদেরও বন্দুকের গুলিতে আক্রমণকারীদের কেউ-কেউ হত ও আহত হল।
