যুবক বললে, আমি হচ্ছি কোনও দয়ালু মস্ত ধনীর সেক্রেটারি। আমার মনিব তার নাম প্রকাশ করতে রাজি নন। তিনি এক হাজার গরিব পরিবারকে কয়লা দান করতে চান। কিন্তু আজ রাত্রের মধ্যেই সমস্ত কয়লা পাঠাতে হবে। যাদের কাছে পাঠাতে হবে, আমি এখনি তাদের ঠিকানা দিচ্ছি। কিন্তু আজকের এত কয়লা পাঠাতে পারবে কি?
ব্যবসায়ী বললে, কেন পারব না? কিন্তু এত কয়লার দাম যে, অনেক হাজার টাকা।
যুবক তাচ্ছিল্যের সঙ্গে নোটের তাড়া বের করে বললে, দাম নিয়ে তোমার মাথা ঘামাবার দরকার নেই।
ব্যবসায়ী কয়লা পাঠাবার ব্যবস্থা করলে। যুবক সমস্ত দাম চুকিয়ে দিয়ে চলে গেল!
রাত হয়েছে বলে ব্যবসায়ী নোটের তাড়া ব্যাঙ্কে জমা দিতে পারলে না। লোহার সিন্দুকে নোটগুলো পুরে দোকান বন্ধ করলে। একদিনেই এই আশাতীত লাভে তার মুখে হাসি আর ধরে না।
সে-রাত্রে ভিয়েনার এক হাজার দরিদ্র পরিবারের মধ্যেও হাসিখুশির ধুম পড়ে গেল। দাতার দানে ঘরে ঘরে কয়লা পুড়ছে, শীতের চোটে প্রাণের ভয় আর নাই।
.
তিন
পরদিন প্রভাতে ব্যবসায়ীর মুখের হাসি শুকিয়ে গেল।
স্তম্ভিত চক্ষে সে দেখলে, তার লোহার সিন্দুক খোলা, কাল রাতে পাওয়া সেই নোটের তাড়া তো নেই-ই, সঙ্গে-সঙ্গে আরও অনেক টাকা অদৃশ্য হয়েছে! সে তখনি পুলিশে খবর দিতে ছুটল।
গোটা শহরে মহা উত্তেজনার সৃষ্টি হল। কাগজে কাগজে অজানা দাতার এই অদ্ভুত দান ও অজানা চোরের এই অদ্ভুত চুরির কাহিনি এবং লোকের মুখে মুখে কেবল তারই আলোচনা!
কে এই দাতা? কে এই চোর?
ইউরোপে ভিয়েনার পুলিশের ভারি সুনাম! কিন্তু সে সুনামে আজ কোনও ফল হল না। এই বিস্ময়কর চোর এমন সুচতুর ও সাবধানী যে, ধরা পড়বার কোনও সূত্রই পিছনে রেখে যায়নি!
দু-চারদিন যেতে না-যেতেই উত্তেজনার উপরে আবার নতুন উত্তেজনা। ভিয়েনার শত শত খবরের কাগজে এই পত্রখানি বেরুল :
ব্যবসায়ীর লোহার সিন্দুক থেকে আমি যা নিয়েছি, তা হচ্ছে আমার নিজের টাকা। ওই নীচ ব্যবসায়ী এই শীতে অকারণে কয়লার দাম বাড়িয়ে গরিবদের অনেক কষ্ট দিয়েছে। তাই তার এই শাস্তি।
ব্যবসায়ীর বাকি যে টাকাগুলো নিয়েছি, তা হচ্ছে আমার পারিশ্রমিক। ইতি–
রবিনহুড
বলা বাহুল্য, আসলে এই আধুনিক রবিনহুড আমাদের পূর্বপরিচিত হুগো ছাড়া আর কেউ নয়।
তারপরে প্রায়ই ভিয়েনা শহরে বড়-বড় চুরির মহা ধূম পড়ে গেল! ধনীদের সুরক্ষিত অট্টালিকা, কৃপণের লোহার দরজা, দুর্ভেদ্য ইস্পাতের সিন্দুক, চোরের কাছে সমস্তই যেন নগণ্য হয়ে উঠল!
দেশব্যাপী অভিযোগে ও ক্রমাগত ছুটাছুটি করে ভিয়েনায় বিখ্যাত পুলিশ বাহিনীও দস্তুরমতো কাহিল হয়ে পড়ল। কোনও চুরিতেই চোর সামান্য সূত্রও রেখে যায়নি। চোরেরা হঠাৎ এমন অসম্ভব চালাক হয়ে উঠল কেমন করে?
কিছুকাল পরে পুলিশ অনেক সন্ধান দিয়ে আবিষ্কার করলে যে, এক-একটা বড় চুরি হওয়ার পরেই শহরের গরিব লোকরা অজানা দাতার কাছ থেকে বহু টাকা পুরস্কার পায়।
পুলিশ মাথা ঘামিয়ে বুঝতে পারলে যে, এসব চুরি বহু চোরের কীর্তি নয়, সব চুরির মূলেই আছে নিশ্চয়ই সেই অদ্ভুত রবিনহুড!
কিন্তু এই আবিষ্কারেও কোনও লাভ হল না। কে এই রবিনহুড? কোথায় সে থাকে?
.
চার
কিছুতেই যখন রবিনহুডের ঠিকানা পাওয়া গেল না, তখন তাকে ফাঁদে ফেলবার জন্যে পুলিশ এক নতুন উপায় অবলম্বন করলে।
নানান খবরের কাগজে এক হঠাৎ ধনী মাংস-ব্যবসায়ীর কথা প্রকাশিত হল। তার টাকাকড়ি, হিরা-জহরতের নাকি অন্ত নেই! সে নাকি এখন মাংস ব্যবসায় ছেড়ে দিয়ে শৌখিন ধনীর মতো শহরের নবাবি করতে এসেছে।
নানা থিয়েটারে ও উৎসবের আসরে তাকে সপরিবারে প্রায়ই দেখা যেতে লাগল। তার বউ ও মেয়েদের গায়ে এত জড়োয়ার গয়না যে, চোখ যেন ঝলসে যায়!
কিন্তু বাড়িতে ফিরে তারা নাকি খুব সকাল-সকাল ঘুমিয়ে পড়ে। রাতদুপুরের আগেই তাদের বাড়ির সব আলো নিবে যায়!
একরাত্রে বাড়ির সব আলো নিবে গেছে এবং সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে।
যে-ঘরে তাদের গয়নার সিন্দুক থাকে সেই ঘরে কেমন একটা অস্পষ্ট শব্দ শোনা গেল। যেন ইঁদুরেরা কুট কুট করে কি কাটছে!
অন্ধকারে হঠাৎ আলো জ্বলে উঠল এবং চারজন ডিটেকটিভ দৌড়ে গিয়ে দেখলে যে লোহার সিন্দুকের সামনে একটি যুবক বসে আছে। রবিনহুড পা দিয়েছে পুলিশের ফাঁদে!
হুগো কিন্তু পুলিশের চেয়ে ঢের বেশি চটপটে!
এক মুহূর্তে তার হাতের রিভলভার ঘন-ঘন গর্জন করে উঠল এবং আলোগুলো গুলির চোটে ভেঙে গুঁড়ো হয়ে গেল!
আবার আলো জ্বেলে দেখা গেল, ঘরের মেঝের উপরে এক ডিটেকটিভ আহত ও আর-একজন নিহত হয়ে রয়েছে এবং রবিনহুড হয়েছে অদৃশ্য!
কিন্তু এত করেও হুগো পালাতে পারলে না।
অন্ধকার জানলা দিয়ে বেরিয়ে, দড়ি বেয়ে সে পথে গিয়ে নামতে না-নামতেই একদল পুলিশের লোক এসে তাকে চারিদিক থেকে জড়িয়ে ধরলে!
মহাবলবান হুগো দানবের মতো যুদ্ধ করতে লাগল, শত্রুর পর শত্রুকে বার-বার কাবু করে ফেললে, কিন্তু তবু রক্ষা পেলে না! পুলিশের দল বড়ই ভারি, হাতে হাতকড়া পরে এতদিন পরে তাকে কারাগারেই যেতে হল!
.
পাঁচ
পরদিন সন্ধ্যাবেলায় বন্দি হুগো কারাকক্ষের রক্ষীকে ডেকে বললে, ওহে, আজ বোধহয় সমস্ত খবরের কাগজেই আমার কীর্তির কথা বেরিয়েছে?
