বিমল তার বুকে হাত দিয়ে দেখে বললে, ধরণী এ-জীবনে আর আমাদের মগজ নিয়ে পরীক্ষা করতে পারবে না।
তারপর আবার রামদাসের সন্ধান আরম্ভ হল। কিন্তু দ্বীপের চারিদিক, ছোট-বড় সমস্ত বন খুঁজেও তার কোনওই পাত্তা পাওয়া গেল না।
সবাই যখন দ্বীপের ওপাশে আবার নদীর ধারে এসে পড়ল, বিনয়বাবু তখন একদিকে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন।
আগেই বলা হয়েছে নদী এখানে প্রায় সমুদ্রের মতন দেখতে! সেই বিশাল জলের রাজ্যে দেখা গেল, বহুদুরে দুটো বড়-বড় জীব সাঁতার কেটে কোথায় ভেসে চলেছে!
বিমল বললে, নিশ্চয়ই ওরা হচ্ছে রামদাস আর সেই বিরাট কুকুর।
কিন্তু রামদাসের দাদা হরিদাসটা গেল কোথায়?
হয়তো রামদাসের চওড়া পিঠে বসে নদী পার হচ্ছে। কি বলেন ইনস্পেকটর মশাই, ইস্টিমারে চড়ে আবার ওদের তাড়া করব নাকি?
ইনস্পেকটর বললেন, আপদ যখন নিজেই বিদেয় হয়েছে, তখন আর হাঙ্গাম করে দরকার কি? কিসে কি হয় বলা তো যায় না, ও বেটা যদি ডুবসাঁতার দিয়ে এসে ছুঁ মেরে ইস্টিমারের তলা ফাটিয়ে দেয়?
সকলে যখন বনের ভেতর দিয়ে আবার ফিরে আসছে, তখন মাথার ওপরকার একটা গাছের ডাল-পাতা হঠাৎ নড়ে উঠল, তারপর শোনা গেল–কিচির কিচির মিচির-কিচির-মিচির কিচকিচ-কিচকিচ!
মানুষ আমি নইকো রে ভাই,
আজকে আমি মানুষ নই,
তোমরা সবাই চললে দেশে,
একলা আমি হেথায় রই।
আমার দেশের সবুজ মাঠে
ধানের খেতে সোনার দোল,
বইছে নদীর রূপোর লহর,
শিউলি ঝরা মাটির কোল!
সে করুণ স্বর শুনে সকলেরই মন ব্যথায় ভরে উঠল।
বিনয়বাবু ওপর দিকে মুখ তুলে মমতা-ভরা কণ্ঠে বললেন, কবি, আজ তোমার চেহারা যেরকমই হোক, তুমি আমাদের প্রাণ রক্ষা করেছ! তুমি গাছ থেকে নেমে এসো, আমাদের সঙ্গে আবার দেশে ফিরে চলো।
গাছের ওপর থেকে আবার সেই দুঃখমাখা কণ্ঠ শোনা গেলঃ
আমার ঘরের মিষ্টি বধূ
ডাকছে আমায় রাত্রি-দিন,
আমার খোকার, আমার খুকির
কণ্ঠে বাজে স্বপ্ন-বীণ।
কেমন করে ফিরব ঘরে,
আজকে আমি মানুষ নই,
তোমরা সবাই চললে দেশে,
একলা আমি হেথায় রই!
আধুনিক রবিনহুড
এক
সিনেমায় গিয়ে কিংবা বই পড়ে বিলাতের উদার ডাকাত রবিনহুডের সঙ্গে তোমাদের নিশ্চয় চেনাশুনা হয়েছে। রবিনহুড ইংল্যান্ডের সেরউড অরণ্যে বাস করত এবং ধনীদের টাকা লুটে গরিবদের বিলিয়ে দিত।
কিন্তু একালের আর-একজন রবিনহুডের নাম এখনও পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়তে পারেনি। সেকালে সত্যই রবিনহুড বলে কেউ ছিল কিনা, সে সম্বন্ধে অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করে থাকেন। কিন্তু একালের এই রবিনহুডের সম্বন্ধে একটুও সন্দেহ নেই। সে সত্যিকার মানুষ।
তার আসল নাম হুগো ব্রিটউইজার। সে অস্ট্রিয়ার লোক এবং তার কার্যক্ষেত্র–ভিয়েনা শহরে।
হুগো রীতিমতো ভদ্র পরিবারের ছেলে। সে শিক্ষিত ও ইঞ্জিনিয়ার। কিন্তু তার মাথা এত সাফ যে, নিজের যত্নে ও অধ্যবসায়ে সে আরও নানান বিদ্যায় পাকা হয়ে উঠেছিল।
তালা-চাবি, সিন্দুক, বাক্স ও গরাদ প্রভৃতি তৈরি করবার জন্যে যে-সব লোহা ও অন্যান্য ধাতু ব্যবহৃত হত, তাদের শক্তির খুঁটিনাটি সমস্তই সে জানত। লোহা ও ইস্পাতের উপরে কোন অ্যাসিডের কতটা প্রভাব, রসায়ন-বিদ্যা শিখে তাও সে জেনে নিয়েছিল। অক্সি-অ্যাসিটিলিন টর্চ দিয়ে কেমন করে ইস্পাতের দরজায় ছাদা করতে হয়, তাও তার অজানা ছিল না।
সে নিজের হাতে নানারকম অদ্ভুত যন্ত্র তৈরি করতে পারত। চোর-ডাকাত ধরবার জন্যে একালের পুলিশ যেসব বৈজ্ঞানিক উপায় অবলম্বন করে, সে-সমস্তই ছিল তার নখদর্পণে। বিখ্যাত ডিটেকটিভদের সমস্ত চাতুরির কাহিনিই সে পড়ে ফেলেছিল। সে রীতিমতো ব্যায়াম করত। জুজুৎসু, কুস্তি ও বক্সিংয়ের সব পাঁচই খুব ভালো করে শিখেছিল।
যখন তার সমস্ত শিক্ষা সম্পূর্ণ হল, তখন হঠাৎ একদিন সে বাড়ি থেকে একেবারে গা ঢাকা দিলে। বাড়ির লোকে জানলে, হুগো দেশ ছেড়ে আমেরিকায় গিয়েছে।
সে কিন্তু ভিয়েনা শহরেই লুকিয়ে রইল। ছোটলোকদের বস্তির ভিতরে একখানা ঘর ভাড়া নিলে। দিন-রাত সেই ঘরে একলা বসে লেখাপড়া করতে লাগল এবং দাড়ি-গোঁফ কামানো ছেড়ে দিলে। কিছুদিন পরে দাড়ি-গোঁফে তার মুখ এমন আচ্ছন্ন হয়ে গেল, কোনও চেনা লোকের পক্ষেও তাকে চেনা আর সহজ রইল না।
.
দুই
সেবার বড়দিনের মুখে অস্ট্রিয়ায় এমন হাড়ভাঙা শীত পড়ল যে, তেমন শীত আর কেউ কখনও দেখেনি।
অস্ট্রিয়া হচ্ছে শীতপ্রধান দেশ। সেখানে ঘরের ভিতরে কয়লার আগুন জ্বেলে না রাখলে ঠান্ডায় মারা পড়বার সম্ভাবনা হয়। তার উপরে আবার এই অতিরিক্ত শীত।
সুবিধা বুঝে দুষ্ট ব্যবসায়ীরা কয়লার দাম অসম্ভব বাড়িয়ে দিলে। ধনীদের কোনও বালাই নেই, বেশি ঠান্ডায় বেশি কয়লা কিনে পোড়াবার শক্তি তাদের আছে। কিন্তু যত অসুবিধা হল, গরিব বেচারিদের! চড়া দামে কয়লা কেনবার সঙ্গতি নেই,অথচ চারিদিকে বরফ পড়ছে, দেহের রক্ত জমাট হয়ে যাচ্ছে। আগুন পোয়াতে না পেরে অনেকে শীতে কাঁপতে কাঁপতে ঘুমিয়ে পড়ল বটে, কিন্তু সে ঘুম আর এ-জীবনে ভাঙল না!
বড়দিন আসতে মাত্র দুদিন দেরি। শীতার্ত এক সন্ধ্যায় ভিয়েনার এক বড় ব্যবসায়ী তার দোকানঘর বন্ধ করবার উদ্যোগ করছে। এমন সময় ফিটফাট পোশাক পরা এক যুবক। তার দোকানে এসে ঢুকল।
