তা বেরিয়েছে বইকী!
সেগুলো আমাকে পড়াতে পারো? আমি দামও দেব, তোমাকে বখশিশও দেব।
রক্ষী এতে কোনও দোষ দেখলে না। খানিক পরেই সে বস্তা-বস্তা কাগজ কিনে এনে দিলে। ভিয়েনা শহর তো কলকাতার মতো নয়, সেখানে লোক থাকে উনিশ লাখের কাছাকাছি, আর তাদের প্রায় সকলেরই রোজ খবরের কাগজ পড়া অভ্যাস। কাজেই ভিয়েনায় প্রত্যহ খবরের কাগজ বেরোয় শত-শত। এইসমস্ত কাগজের স্তূপ এত উঁচু হল যে, হুগোর মূর্তি তার মধ্যে প্রায় ঢাকা পড়ে গেল।
কয়েদখানার ঘরের বাইরে সমগ্র সশস্ত্র রক্ষী পায়চারি করছে এবং মিনিট-পনেরো অন্তর জানলার গরাদের ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরে হুগোকে দেখে যাচ্ছে। প্রতিবারেই দেখে, সে যেন গর্বে স্ফীত হয়ে একমনে খবরের কাগজে নিজের কীর্তিকাহিনি পাঠ করছে!
হুগো কিন্তু কাগজ পড়ছিল না। যেই রক্ষী চলে যায়, অমনি সে দাঁড়িয়ে ওঠে এবং অন্যদিকের একটা জানলার কাছে গিয়ে খুব ছোট্ট একখানা উকো বার করে গরাদের উপর ঘষতে থাকে। খুব পাতলা অথচ শক্ত ইস্পাতের পাতে এই উকো তার নিজের হাতে তৈরি। পুলিশ জামাকাপড় হাতড়ে তার সব জিনিস কেড়ে নিয়েছিল, কিন্তু এই উকো লুকানো ছিল তার জুতোর সোলের মধ্যে।
মাঝরাত্রে সে রক্ষীকে ডেকে বললে, ওহে ভাই, আমার চোখ একে খারাপ, তায় এই কামরার আলোর জোর নেই। খবরের কাগজের এখানটা বড় ছোট-ছোট হরফে ছাপা। জানলার কাছে এসে এ-জায়গায় তুমি আমাকে পড়ে শোনাবে?
রক্ষী রাজি হয়ে যেই গরাদের কাছে এল, হুগো অমনি নিজের উকো দিয়ে কাটা গরাদের লোহার আঘাতে তাকে একেবারে অজ্ঞান করে ফেলে। তারপর হাত বাড়িয়ে রক্ষীর পকেট থেকে দরজা খোলবার চাবি বার করে নিলে।
.
শেষ রাতে রক্ষী বদলাবার সময় এল। নতুন রক্ষী এসে পুরোনো রক্ষীকে দেখতে না পেয়ে উপরওয়ালাদের খবর দিলে।
কামরায়-কামরায় খোঁজাখুঁজির পর হুগোর ঘরে পুরোনো রক্ষীর মৃতদেহ পাওয়া গেল। কিন্তু হুগো কোথায়? তার কয়েদির পোশাক রয়েছে রক্ষীর দেহে, কিন্তু রক্ষীর পোশাক কোথায়?
ঘরের মেঝেতে অনেকগুলো খবরের কাগজ-পাকানো অবস্থায় পড়ে রয়েছে। বন্দির বিছানার গদি টুকরো-টুকরো করে কাটা। এ-সবের অর্থ কি?
তারপর দেখা গেল, একটা জানলার একটা গরাদ নেই। এবং আর-একটা গরাদে থেকে পাকানো-খবরের কাগজের দড়ি ঝুলছে!
আশ্চর্য এই দড়ি! প্রথমে পাঁচ-ছয়খানা খবরের কাগজ নিয়ে একসঙ্গে পাকানো হয়েছে। তারপর পাছে পাক খুলে যায়, সেই ভয়ে গদির কাটা কাপড় জড়িয়ে তাকে শক্ত করা হয়েছে। তারপর একখানা পাকানো কাগজের সঙ্গে আর-একখানা কাগজ বেঁধে ফেলা হয়েছে। তারপর সেই দড়ি ধরে হুগো নীচে নেমে চম্পট দিয়েছে!
আজও সেই অদ্ভুত দড়ি ভিয়েনা পুলিশের যাদুঘরে সযত্নে রক্ষিত আছে।
.
ছয়
সেই সময়েই অস্ট্রিয়া ও জার্মানির সঙ্গে প্রায় সারা ইউরোপের মহাযুদ্ধ বাধল এবং সেই আধুনিক কুরুক্ষেত্রের পৃথিবীব্যাপী কোলাহলে হুগোর কথা চাপা পড়ে গেল।
চার বৎসর পরে যখন মৃত্যুস্রোত বন্ধ হল, অস্ট্রিয়ার আকার ও শক্তি তখন নগণ্য। এই জাতীয়-অধঃপতনের সময়ে হুগোর কথা নিয়ে পুলিশও মাথা ঘামাতে পারেনি।
যে মাংস-ব্যবসায়ীকে অবলম্বন করে পুলিশ হুগোকে ধরেছিল, সে এখন সত্যসত্যই অগাধ টাকার মালিক! বড়-বড় আমির-ওমরাহদের নিমন্ত্রণ করে প্রায়ই সে ভোজ দেয়!
একদিন এক বড় হোটেলে কাউন্ট রিচার্ড নামে এক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে তার আলাপ হল এবং সেই আলাপ ক্রমে বন্ধুত্বে পরিণত হতে দেরি লাগল না।
কাউন্ট একদিন বললেন, বন্ধু, এ-রকম ছোট ছোট ভোজ দিয়ে কোনও লাভ নেই। এমন এক ভোজ আর বল-নাচ দাও, যা সারা রাত ধরে চলবে! দেশের সমস্ত ধনী মেয়ে পুরুষকে নিমন্ত্রণ করো। তাহলে তোমার খ্যাতির আর সীমা থাকবে না!
মাংস-বিক্রেতা ধনী হয়ে আজ সন্ত্রান্ত সমাজে নাম কিনতে চায়। সে তখনই রাজি হয়ে গেল এবং এই বিরাট আয়োজনের ভার দিলে, কাউন্ট রিচার্ডেরই হাতে।
ভোজের রাত্রে ভিয়েনার সমস্ত সম্ভ্রান্ত নর-নারী মাংস-বিক্রেতার বাড়িতে এসে হাজির। চারিদিকে মণিমুক্তায় বিদ্যুৎ জ্বলছে।
কাউন্ট তার বন্ধুকে একপাশে ডেকে নিয়ে গিয়ে বললে, ওহে, এসব ব্যাপারে নাচের সময়ে প্রায়ই দামি গয়নাগাঁটি চুরি যায়। তোমার অতিথিদের বলো, বেশি দামি গয়নাগুলো আপাতত কিছুক্ষণের জন্যে তোমার লোহার সিন্দুকে তুলে রেখে দিতে। নাচ শেষ হলে আবার সেগুলো ফিরিয়ে দিও।
সেই কথামতোই কাজ হল!
শেষ রাতে বল-নাচ হয়ে গেলে পর, অতিথিরা গয়না ফেরত চাইলেন।
কিন্তু লোহার সিন্দুক খুলে দেখা গেল, প্রায় চার লক্ষ টাকার গহনার একখানাও নেই। কাউন্ট রিচার্ডেরও খোঁজ পাওয়া গেল না!
দেশময় হইচই! এমন চুরির কথা কেউ কখনও শোনেনি! সবাই অবাক! পুলিশও হতভম্ব!
কোনও-কোনও খবরের কাগজ তখন মনে করিয়ে দিলে যে, এই মাংস-ব্যবসায়ীর বাড়িতেই রবিনহুড ধরা পড়েছিল! আজ চার বছর পরে রবিনহুড প্রতিশোধ নিয়েছে।
কথাটা পুলিশের মনে লাগল। চারিদিকে দলে-দলে ডিটেকটিভ ছুটল, কিন্তু দীর্ঘ দুই বৎসরের মধ্যে রবিনহুডের কোনও পাত্তাই পাওয়া গেল না।
.
সাত
দুই বৎসর পরে গুপ্তচরের মুখে খবর পাওয়া গেল, ভিয়েনা থেকে বিশ মাইল দূরে, ছোট্ট এক শহরে এক যুবক একাকী বাস করে। সে ধনী, কিন্তু কারুর সঙ্গে মেশে না। বাড়িতে বসে লেখাপড়া করে, ও মাঝে-মাঝে বাইসাইকেল চড়ে বেড়াতে যায়।
