কুমার বললে, এখনও আঃ বলে নিশ্চিন্তে আরাম করবার সময় হয়নি বিমল! রামদাস গোটাকয় লাফ মারলেই এখানে এসে হাজির হতে পারবে!
বিমল বললে, ঠিক! খোলা মাঠ পেয়েছি, চলো এইবার আমরা দৌড়ই!
কমল বললে, কিন্তু কোনদিকে যাব?
কুমার বললে, কোনদিকে আবার! আমরা এসেছি পূর্বদিক থেকে, আমাদের যেতেও হবে পূর্বদিকে!
সবাই পূর্বদিকে ছুটতে শুরু করলে। ছুটাছুটিতে বাঘার ভারী আমোদ! সে ভাবলে এইবারে খেলার পালা শুরু হল! তখনি সে ভালো করেই দেখিয়ে দিলে যে ছুটাছুটি খেলায় তাকে হারিয়ে কেউ ফার্স্ট প্রাইজ নিতে পারবে না।
ময়দানের ওপারে আবার একটা বনের আরম্ভ,–এ বন তেমন ঘন নয়।
কিন্তু সকলে এখানে এসেই সভয়ে শুনলে, বনের ভেতর দিয়ে কারা তাদের দিকেই এগিয়ে আসছে!
শত্রুরা কি তাদের ইস্টিমারে যাওয়ার পথ বন্ধ করে আক্রমণ করতে আসছে?
পিছনে আছে রামদাস, আর এদিকে আছে কে! সশস্ত্র ধরণী, হরিদাস–আর সেই হাতির মতো ডালকুত্তা?
তাহলে উপায়? তারা নিরস্ত্র, বাধা দেওয়ার কোনও উপায়ই নেই! এক উপায়, পালানো। কিন্তু এবারে তারা কোনদিকে পালাবে?
কুমার হঠাৎ প্রচণ্ড উৎসাহে বলে উঠল, পুলিশ! পুলিশ! মিলিটারি পুলিশ!
বিমল চকিতে ফিরে দাঁড়িয়ে দেখলে, বনের ভেতর থেকে সার বেঁধে সমতালে পা ফেলে মিলিটারি পুলিশের লোক বেরিয়ে আসছে।
সে সানন্দে বললে, আর আমাদের কোনও ভয় নেই! বিনয়বাবু, ওই দেখুন বন্দুকধারী পুলিশ ফৌজ, ওই দেখুন মেশিনগান! আসুক এখন রামদাস, আসুক এখন ধরণী আর আসুক তার হাতি-কুকুর!
ইনস্পেকটর তাদের দেখে দৌড়ে এসে বললেন, বিমলবাবু, ব্যাপার কী? মোটরবোট শুদ্ধ কোথায় উধাও হয়েছিলেন?
বিমল বললে, আমরা যমালয়-ফেরত মানুষ!
তার মানে?
তার মানে তালগাছের মতন উঁচু দৈত্য মোটরবোট শুদ্ধ আমাদের গ্রেপ্তার করে নিয়ে গিয়েছিল!
কী যে আপনি বলেন!
বিশ্বাস হচ্ছে না? তাহলে শুনুন।
বিমল তাড়াতাড়ি খুব অল্প কথায় মোটামুটি সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করলে।
ইনস্পেক্টার সব শুনে খানিকক্ষণ হতভম্বের মতো চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, আমার এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না। এ যে গাঁজাখুরি কথার মতো শোনাচ্ছে।
বিশ্বাস করুন মশায়, বিশ্বাস করুন! গাঁজার ধোঁয়া যেমন সত্য, আমাদের কথাও তেমনি সত্য!
আপনারা স্বপ্ন বা ম্যাজিক দেখেছেন কিনা জানি না, কিন্তু আপনারা যে বিপদে পড়েছেন, এটা আমি আন্দাজ করেছিলুম। তাই তো লোকজন নিয়ে আমি আপনাদের খুঁজতে বেরিয়েছি।
বড় ভালো কাজ করেছেন মশাই, বড় ভালো কাজ করেছেন। আমাদের তো খুঁজে পেয়েছেন, এইবারে চলুন সেই রামদাসের খোঁজে!
নিশ্চয়ই যাব! কিন্তু ওই যে বললেন, আপনাদের এই রামদাসের গল্প গাঁজার ধোঁয়ার মতন সত্য, শেষটা গাঁজার ধোঁয়ার মতোই রামদাস উপে যাবে না তো?
কুমার বললে, হুঁ! রামদাস উপে যাওয়ারই ছেলে বটে! ওই দেখুন, মাঠের পারের ওই বনে দাঁড়িয়ে রামদাস আমাদেরই দেখছে!
ইনস্পেকটর সেইদিকে তাকিয়েই চমকে মস্ত এক লাফ মারলেন!
ময়দানের ওদিককার বনের সারের ওপরে এক মানুষ-তালগাছ স্তব্ধভাবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সকলকে লক্ষ করছে, দুই হাত দুই কোমরে রেখে! তার অদ্ভুত দেহের তুলনায় বড়-বড় তালগাছগুলোকেও ছোট দেখাচ্ছে! এতদূর থেকে তার মুখের ভাব দেখা যাচ্ছিল না বটে, কিন্তু সেটা যে বিপুলবপু এক নরদৈত্যের মূর্তি, সে বিষয়ে কোনওই সন্দেহ নেই!
মিলিটারি পুলিশের দলের ভেতর থেকে একটা বিস্মিত কোলাহল-ধ্বনি উঠল!
বিমল বললে, কিন্তু সেই হাতির মতো ডালকুত্তা! সে এখনও একবারও দেখা দিলে না কেন?
ইনস্পেকটর বললেন, রক্ষে করুন মশায়, আর আমি তাকে দেখতে চাই না! যা দেখছি, তাতেই পিলে চমকে উঠেছে! এই সেপাই, ফায়ার করো–ফায়ার করো!
বিমল ব্যস্তভাবে বললে, না না! আগে দেখাই যাক, রামদাসকে আমরা জ্যান্ত অবস্থায় গ্রেপ্তার করতে পারি কিনা!
ইনস্পেকটর দুই চক্ষু ছানাবড়ার মতো করে তুলে সবিস্ময়ে বললেন, গ্রেপ্তার! ওকে গ্রেপ্তার করতে চায় কে? ওর কাছে গেলে ও তো পুঁটিমাছের মতো টপ-টপ করে আমাদের মুখে ফেলে দেবে! ওর হাতে পরাবার হাতকড়িই বা কোথায় পাব? ইস্টিমারে ওর দেহ কুলোবে না, নিয়ে যাব কেমন করে! না-না, গ্রেপ্তার-ট্রেপ্তার নয়, ওকে একেবার বধ করতে হবে!
বিমল বললে, কিন্তু এত দূর থেকে গুলি ছুড়লে তো ওর গায়ে লাগবে না!
তবু বন্দুক ছুড়ক! বন্দুকের শব্দে ভয় পেয়ে দৈত্য-বেটা এখান থেকে পালিয়ে যাক। ওকে দেখতে আমার একটুও ভালো লাগছে না! এই সেপাই! বন্দুক ছোঁড়ো–মেশিনগান ছোড়ো!
বন্দুক ও কলে কামানের ঘন-ঘন বজ্র-গর্জনে চতুর্দিক ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠল! এবং সঙ্গে-সঙ্গে রামদাসের দেহ বনের ভেতরে ডুব মারলে! তাহলে আগ্নেয়াস্ত্রের শক্তি সে জানে!
ইনস্পেকটর উৎসাহ ভরে বলে উঠলেন, দেখছি দৈত্য-বেটা গোঁয়ারগোবিন্দ নয়! তবে চলো সবাই অগ্রসর হই! কিন্তু খবরদার, বন্দুক-ছোঁড়া বন্ধ কোরো না! সেই ফাঁকে দৈত্যটা কাছে এসে পড়লে আর রক্ষে নেই!
সকলে মিলে অগ্রসর হল–যেখানটায় রামদাসকে দেখা গিয়েছিল সেইদিকে।
কিন্তু সেখানে গিয়ে রামদাসের বদলে পাওয়া গেল ধরণীকে! একটা গাছের তলায় ধরণী লম্বা হয়ে শুয়ে আছে বন্দুকের গুলি লেগে তার কপাল বয়ে ঝরঝর করে রক্ত ঝরছে!
