অরণ্যের এক অংশ আচম্বিতে অত্যন্ত অস্থির হয়ে উঠেছে–মড়মড় করে বড়-বড় ডালপালা ভেঙে পড়ার এবং মাটির ওপরে ধুপ-ধুপ করে আশ্চর্য পায়ের শব্দ!
তারপরেই এক অতি ক্রুদ্ধ উচ্চ কণ্ঠস্বর, রামদাস, রামদাস! ওই পোকাগুলোকে পায়ে। থেঁতলে ধুলোর সঙ্গে মিশিয়ে দাও!
বিমল মৃদু হেসে বললে, এইবারে রামদাসকে আমরা স্বচক্ষে দেখব!
.
দ্বাদশ পরিচ্ছেদ। কবির আবির্ভাব
রামদাস,–ছোট্ট হরিদাসের মস্ত ভাই রামদাস, ধরণীর সৃষ্টিছাড়া পরীক্ষার জ্যান্ত ফল রামদাস–, যার পায়ের তলে পৃথিবী টলে, যার হাতের জোরে মানুষ-ভরা মোটরবোট জল ছেড়ে শুন্যে ওড়ে, যার মাথা দোলে বুড়ো তালগাছের মাথার সমান উঁচু হয়ে ঝড়ের হুহুঙ্কারে!
সেই রামদাস আসছে আজ বিমলদের সঙ্গে দেখা করবার জন্যে, ধরণীর নিষ্ঠুর হুকুম পালন করবার জন্যে, এক-এক বিরাট পায়ের চাপে পাঁচ-পাঁচটি ক্ষুদ্র মানুষের দেহ ঠুনকো কাচের পেয়ালার মতো চূর্ণ করবার জন্যে!
সকলে অত্যন্ত অসহায়ের মতো এদিকে-ওদিকে তাকাতে লাগল, কিন্তু কোথায় পালাবার পথ? সামনে খোলা জমি, তারপরেই দুর্ভেদ্য বন, যার ভেতর দিয়ে মড়মড় করে বড়-বড় ডালপালা ভাঙতে-ভাঙতে আসছে স্বয়ং রামদাস, বামপাশে ও ডানপাশেও নিবিড় অরণ্য যেন নিরেট প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে আছে হয়তো তার ভেতরেও তাদের জন্যে অপেক্ষা করছে সেই হাতির মতো ডালকুত্তা এবং সেখানে গিয়ে পথ খোঁজবারও সময় নেই!
বিনয়বাবু বললেন, বিমল, আমাদের আবার সেই পাতালপুরীতেই ফিরে গিয়ে বন্দি হতে হবে রামদাস তার ভেতরে ঢুকতে পারবে না!
দাঁতে দাঁত চেপে বিমল বললে, সেখানে গিয়ে ধরণীর ছুরিতে মস্তিষ্ক দান করব? প্রাণ থাকতে নয়!
বিনয়বাবু বললেন, কিন্তু এখানেই প্রাণ আর থাকছে কই?
কুমার বললে, রামদাসের সঙ্গে লড়তে-লড়তে আমি প্রাণ দিতেও রাজি আছি, কিন্তু ধরণীর ছুরিতে মস্তিষ্ক দিয়ে মরেও বেঁচে থাকতে পারব না!
কমল বললে, আমারও ওই মত!
রামহরি কেবল কাঁদতে লাগল।
কিন্তু বাঘা চাঁচাচ্ছে শুধু ঘেউ-ঘেউ করে–সে বোধহয় রামদাসকে শুনিয়ে-শুনিয়ে কুকুর ভাষায় সবচেয়ে খারাপ গালাগালিগুলো বষর্ণ করছে!
হঠাৎ কমল বলে উঠল, বিমলবাবু, দেখুন–দেখুন!
সকলে মুখ ফিরিয়ে দেখলে, ডানদিকের একটা বড় গাছের ওপর থেকে থেকে তাড়াতাড়ি নেমে আসছে মস্ত একটা হনুমান! নীচের ডাল থেকে সে এক লাফে ভূতলে অবতীর্ণ হল এবং তারপর দুই পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে উঠে হাত নেড়ে ব্যস্তভাবে সবাইকে ডাকতে লাগল।
বিনয়বাবু সবিস্ময়ে বললেন, ও কী ব্যাপার?
বিমল বললে, বোধহয় সেই হনুমানযার মাথায় বেঁচে আছে মানুষের মগজ!
কুমার বললে, ও যে আমাদের ডাকছে!
বনের ডালপালা ভাঙার শব্দ তখন খুব কাছে এসে পড়েছে রামদাসের দেখা পেতে বোধহয় আর আধ মিনিটও দেরি লাগবে না!
বিমল বললে, ধরণীর কথা যদি সত্য হয়, তাহলে ওই পশুদেহের ভেতরে আছে মানুষেরই মন! চলো সবাই, প্রাণ তো গিয়েছেই, এখন ওর কথা শুনে কি হয় সেইটেই দেখা যাক!
বাঘা গরর-গরর করে এগিয়ে যাচ্ছিল হনুমানজিকে নিজের বীরত্ব দেখিয়ে বাহাদুরি নেওয়ার জন্যে; কিন্তু কুমারের কাছ থেকে এক চড় খেয়ে সে ল্যাজ গুটিয়ে সকলের পিছনে গিয়ে দাঁড়াল কিন্তু বুঝতে পারলে না যে, হনুমানের মতো একটা জানোয়ারকে কামড়াতে যাওয়াটা আজ হঠাৎ অপরাধ হয়ে দাঁড়াল কেন?
তারা সবাই হনুমানের দিকে অগ্রসর হল, হনুমানও গিয়ে দাঁড়াল একেবারে অরণ্যের ধার ঘেঁষে একটা ঝোপের পাশে। তারপর কি আশ্চর্য, সে ঠিক মানুষেরই মতো ঝোপের দিকে হাত তুলে আঙুল দিয়ে কি ইঙ্গিত করলে!
কিন্তু বিমলদের তখন অসম্ভব ব্যাপার দেখে বিস্মিত হওয়ার অবকাশ ছিল না, তারা তাড়াতাড়ি যখন সেই ঝোপের কাছে গিয়ে দাঁড়াল হনুমান তখন লাফ মেরে একটা গাছে উঠে আবার কোথায় অদৃশ্য হয়েছে।
ঝোপের পিছনেই প্রায়-নিরেট বনের তলায় একটা অন্ধকার মাখা পায়ে-চলা সরু পথ।
বিমল মহাখুশি হয়ে বলে উঠল, হনুমান আমাদের পথ দেখিয়ে দিলে! জয় হনুমান!
সকলে সেই পথ ধরে যখন বনের ভেতরে প্রবেশ করলে তখন তাদের মনে হল, যেন পৃথিবীর সমস্ত আলো চোখের সুমুখে সুইচ টিপে কে নিবিয়ে দিলে! সে-অরণ্য এমনি নিবিড় যে, তার ভেতরে রোদ বা জ্যোত্সা কোনওদিন বেড়াতে আসতে পারেনি!
অন্ধকার যখন একটু চোখ-সওয়া হয়ে এল, তখন তারা চারিদিক হাতড়াতে-হাতড়াতে কোনওগতিকে গুঁড়ি মেরে আস্তে-আস্তে এগুতে লাগল।
সেই সময়ে পিছন থেকে ভেসে এল যেন গম্ভীর মেঘগর্জন!
বিনয়বাবু বললেন, আমাদের দেখতে না পেয়ে রামদাস বোধহয় ক্ষাপ্পা হয়ে গর্জন করছে!
সকলে সেই অবস্থাতে যথাসম্ভব পায়ের গতি বাড়িয়ে দিলে! সৌভাগ্যের বিষয়, এই চির-অন্ধকারের রাজ্য দিয়ে তাদের আর বেশিক্ষণ যেতে হল না, অরণ্যের নিবিড়তা ধীরে ধীরে কমে আসতে লাগল এবং আলোকের আভাসে বনের ভেতরটা ক্রমেই বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগল।
প্রায় আধঘণ্টা পরে অরণ্য শেষ হয়ে গেল, তারা আবার একটা বড় মাঠের ওপরে এসে দাঁড়াল।
সারা আকাশ তখন প্রখর রৌদ্রে সমুজ্জ্বল, ময়দানের নীলিমার ওপর দিয়ে সোনালির স্রোত বয়ে যাচ্ছে।
বিমল একটি সুদীর্ঘ আঃ উচ্চারণ করে যেন সেই নির্মল আলোক আর প্রমুক্ত বাতাসকে দৃষ্টি আর নিশ্বাস দিয়ে নিজের বুকের ভেতরে টেনে নিতে লাগল!
