কামরা থেকে বেরিয়ে এসে বাঘা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছে, এমন সময়ে হঠাৎ একটা দাড়িওয়ালা লোক ঠিক যেন মাটি খুঁড়ে ওপরে উঠে এল।
এ-লোকটাকে বাঘা আগেও দেখেছে এবং তার কুকুর-বুদ্ধি বললে, এ তাদের বন্ধুলোক নয়। সে চটপট আবার কামরার ভেতরে গা-ঢাকা দিলে।
খানিক পরে সাবধানে মুখ বাড়িয়ে দেখলে, সেই সন্দেহজনক লোকটা অদৃশ্য হয়েছে।
তখন অমন-হঠাৎ লোকটা কেমন করে আবিভূর্ত হল তার তদারক করবার জন্যে কৌতূহলী বাঘা খুব সন্তর্পণে এগিয়ে গেল।
ঝোপের মধ্যে কতকগুলো ডালপাতা রাশিকৃত হয়ে রয়েছে এবং তারই ফাঁক দিয়ে একসার সিঁড়ি দেখা যাচ্ছে! ঝোপের বাহির থেকে এ-সব কিছুই দেখা যায় না এবং ঝোপের ভেতরে এসে দাঁড়ালেও সহজে সেই সিঁড়ির সার আবিষ্কার করা যায় না।
বাঘা সেই সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে গেল! তারপরেই তার কানে এল পরিচিত কণ্ঠস্বর! বাঘার খুশি-ল্যাজ তখনি বেজায় ব্যস্ত হয়ে উঠল!
আনন্দে বিহ্বল হয়ে বাঘা সর্বপ্রথমে কুমারের ভূতলশায়ী দেহের ওপরে গিয়ে আঁপিয়ে পড়ল এবং আদর করে তার গা চেটে দিতে লাগল।
রামহরি বিষাদ ভরা গলায় বললে, কেন বাঘা মরতে এলি এখানে? আমরা মরব, তুইও মরবি।
বিমল কিন্তু বিপুল উৎসাহে বলে উঠল, না, না! আমরাও বাঁচব, বাঘাও বাঁচবে! ভগবান এখনও বোধহয় আমাদের স্বর্গের টিকিট দিতে রাজি নন! বাঘা সেই খবরই নিয়ে এসেছে।
বিনয়বাবু ম্লান মুখেই বললেন, বিমল, হঠাৎ তোমার এতটা খুশি হওয়ার কারণ বুঝলুম না!
বুঝলেন না? কিন্তু আমি বুঝছি বাঘা যখন এসেছে, তখন ধরণীর ছুরি থেকে নিশ্চয়ই আমাদের মাথা বাঁচাতে পারব! মরি তো একেবারেই মরব, কিন্তু মাসিকপত্রের ওই দুই কবির মতো কুমির কি হনুমান হয়ে থাকব না!
কমল বললে, আমাদের হাত-পা দুইই বাঁধা, ধরণী আমাদের নিয়ে যা খুশি তাই করতে পারে!
কুমার বললে, না, তা আর পারে না! বিমল কি বলছে আমি বুঝেছি। বাঘা! — বলেই সে বাঘার মুখের কাছে নিজের বাঁধা হাতদুটো কোনওরকমে এগিয়ে দিলে।
বাঘা প্রথমটা থতমত খেয়ে গেল।
কুমার তখন বাঘার মুখের ওপরে নিজের হাতদুটো ঘষতে ঘষতে বললে, ওকি রে বাঘা, তুই আমার ইশারা বুঝতে পারছিস না? নে, নে, দড়ি কাট!
বাঘার আর কোনও সন্দেহ রইল না। সে তখনি নিজের ধারালো দাঁত দিয়ে কুমারের হাতের দড়ি চেপে ধরলে। দেখতে-দেখতে তার হাতের দড়ি খসে পড়ল! কুমার তখন আগে নিজেই নিজের পায়ের বাঁধন খুলে ফেললে! এবং তারপর একে একে সকলেরই বন্ধনদশা ঘুচতে আর দেরি লাগল না!
বিমল বাঘাকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে উচ্ছ্বসিত স্বরে বললে, ওরে বাঘা, বাঘা রে! গেল-জন্মে তুই আমাদের কে ছিলি রে বাঘা? বাঘাও সুখে যেন গলে গিয়ে বিমলের কোলের ভেতরে মুখ ঢুকিয়ে দিলে!
বিনয়বাবু বললেন,ওঠো বিমল, পরে বাঘাকে ধন্যবাদ দেওয়ার অনেক সময় পাবে!
বিমল একলাফে দাঁড়িয়ে উঠে বললে, ঠিক বলেছেন! আগে এই পাতালপুরী থেকে বেরুতে না পারলে নিস্তার নেই! এসো সবাই! কিন্তু খুব ধীরে আর খুব হুঁশিয়ার হয়ে!
একে-একে সবাই ঘর থেকে বেরিয়ে দেখলে যেখানটাকে তারা এতক্ষণে উঠান বলে মনে করছিল, সেখানে রয়েছে মস্ত বড় একটা জলের ইঁদারা!
বিমল চারিদিকে চোখ বুলিয়ে বললে, বিনয়বাবু, এই পাতালপুরীটা কি রকম তা বুঝেছেন? লখনউ-এর নবাবরা গরমের সময়ে মাটির নীচে ঘর তৈরি করে বাস করতেন। সেই আদর্শেই এটা তৈরি হয়েছে। বর্ধমানেও এইরকম পাতালপুরী আছে। বিপদের সময়ে লুকোবার জন্যেই ধরণী এটা বোধহয় তৈরি করেছে!
তার কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গেই হো-হো-হো-হো করে একটা বিষম অট্টহাসি সেই পাতালপুরীর ভেতরে প্রতিধ্বনির পর প্রতিধ্বনি জাগিয়ে তুললে। বিমল সচমকে মুখ তুলে দেখলে, সিঁড়ির ওপরকার ধাপে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে হাসছে ধরণী!
ধরণী হঠাৎ হাসি থামিয়ে নিষ্ঠুর স্বরে বললে, এই যে, দড়িটড়ি সব বুঝি ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে?
বিমল দুই পা এগিয়ে বললে, আজ্ঞে হ্যাঁ! আমরা মানুষ, দড়ি বাঁধা থাকতে ভালো লাগল না!
ধরণী দুই পা পিছিয়ে ব্যঙ্গের স্বরে বললে, ও! এখনও তোমরা মানুষই বটে! কিন্তু ভয় নেই, তোমাদের মনুষ্যদেহ আর বেশিক্ষণ থাকবে না!
বিমল সিঁড়ির ওপরে এক ধাপ উঠে বললে, আজ্ঞে না, এখনও আমাদের নরদেহ ত্যাগ করবার ইচ্ছা হয়নি।
ধরণী গর্জে উঠে বললে, খবরদার! আর এক পা এগিয়ে না! ভাবছ এখান থেকে বেরুতে পারলেই বাঁচবে? জানেনা, বাইরে কে পাহারা দিচ্ছে?
রামদাস।
হ্যাঁ, এখান থেকে এক পা বেরুলেই সে তোমাদের পায়ের কড়ে আঙুলে টিপে বধ করবে!
বেশ, সেইটেই একবার পরীক্ষা করে দেখা যাক বলেই বিমল দ্রুতপদে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে লাগল এবং তার পিছনে-পিছনে আর সকলেও!
বিমলের ইচ্ছা ছিল, ধরণীকে গ্রেপ্তার করে। কিন্তু তার অভিপ্রায় বুঝে ধরণী এক মুহূর্তেই তিন লাফ মেরে বাইরে বেরিয়ে গেল!
তারাও তাড়াতাড়ি বাইরে গিয়ে দেখলে ধরণী তীরবেগে ছুটছে এবং প্রাণপণে চেঁচিয়ে ডাকছে–রামদাস! রামদাস! রামদাস!
ঝোঁপের বাইরে একটুখানি ঘাসজমি এবং তারপরেই নিবিড় অরণ্য যেন দুর্ভেদ্য প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে। ধরণী সেই অরণ্যের ভেতরে মিলিয়ে গেল।
বিনয়বাবু ব্যস্ত কণ্ঠে বললেন, এখন আমরা কোনদিকে যাব?
কুমার বললে, আমাদের আর কোনওদিকে যেতে হবে না। ওই দেখুন!
