বিনয়বাবু বললেন, কিন্তু এ তো চিরনিদ্রা নয় বিমল, এ যে জীবন্ত মৃত্যু! আমাদের মস্তিষ্ক নিয়ে ধরণী কি করতে চায়, শুনলে তো!
বিমল চিন্তিত মুখ বললে, হা, ওই কথা ভেবেই মাঝে-মাঝে মন আমার বিদ্রোহী হয়ে উঠছে! মানুষের দেহ থাকবে না, কিন্তু মানুষের প্রাণ থাকবে কিন্তু সে প্রাণের মূল্য কী? কারণ এক হিসাবে মস্তিষ্কই হচ্ছে মানুষের প্রাণ! কিন্তু বিনয়বাবু, এও কি সম্ভব?
বিনয়বাবু বললেন, আজীবন বিজ্ঞানচর্চা করছি, কিন্তু এমন উদ্ভট কল্পনার কথা কখনও মনেও আসেনি! এ কল্পনার যুক্তি আছে বটে, কিন্তু সে যেন রূপকথার যুক্তি!
কমল বললে, আমাদের মধ্যে বাঘাই সুখী! রামদাস আমাদের বোট ঘাড়ে করতে-না করতেই সে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে বেঁচে গেছে!
রামহরি কাঁদো-কাঁদো গলায় বললে, আহা, সে কি আর বেঁচে আছে?
কুমার বললে, আমারও তাই মনে হচ্ছে। শত বিপদেও বাঘা কখনও আমাদের সঙ্গ ছাড়েনি। বেঁচে থাকলে নিশ্চয় সে রামদাসের পিছনে পিছনেই আসত।
—– —–
বাঘার কি হল সেটা আমাদের দেখা দরকার। বিমল ও কুমারের সমস্ত ইতিহাস যাঁরা পড়েছেন তারাই জানেন, বাঘা সাধারণ কুকুর নয়। পশুর মাথায় মানুষের মস্তিষ্ক ঢুকিয়ে ধরণী। নতুন পরীক্ষা করতে চায়, কিন্তু পশুর মস্তিষ্কে যে খানিকটা মানুষি বুদ্ধি থাকতে পারে, অনেক কুকুরই অনেকবার তার জ্বলন্ত প্রমাণ দিয়েছে। বাঘাও হচ্ছে সেই জাতীয় কুকুর।
হঠাৎ ঘুম ভাঙতেই বাঘা যখন দেখলে, জলের নৌকো আকাশে উড়ছে, তখন তার আর বিস্ময়ের সীমা রইল না। এমন অস্বাভাবিক কাণ্ড কোন কুকুর কবে দেখেছে? ভয়ে তার আর দিগবিদিক জ্ঞান রইল না, বিকট চিৎকার করে এক লাফে সে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
জলে পড়ে সাঁতার কাটতে কাটতে সে দেখলে খানিক তফাতেই একটা তালগাছ সমান উঁচু ছায়ামূর্তি কোমর-জল ভেঙে ডাঙার দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
কিন্তু সেই দানবমূর্তি দেখেও বাঘা বিশেষ বিস্মিত হল না। কারণ বিমল ও কুমারের সঙ্গে গিয়ে হিমালয়ের ভয়ঙ্কর-দেরও সে দেখে এসেছে, তার চক্ষে দানব-মূর্তি এখন আর অস্বাভাবিক নয়! সে খালি এইটুকুই বুঝে নিলে যে, ওই দানবের কাছ থেকে যত তফাতে থাকা যায় ততই ভালো।
এমন সময়ে আর একদিকে তার নজর পড়ল। জলের ওপরে আবছা আলোর ভেতরে যেন খানিকটা নিরেট অন্ধকার জমাট হয়ে আছে! খালি তাই নয়, অন্ধকারের এক জায়গায় যেন দু-টুকরো আগুনের মতো কি জুলজুল করছে।
সে অন্ধকার আর কিছুই নয়, মস্তবড় একটা কুমির।
এই জলচর জীবটিও বাঘার চোখে নতুন নয়! জলে এর সঙ্গে লড়াই হলে তারই যে সমধিক বিপদের সম্ভাবনা এটাও সে বুঝতে পারলে।
কুমির হঠাৎ বললে, ঘোঁ-ঘটঘট ঘোঁ-ঘট-ঘট, ঘোঁ-ঘট-ঘট! দে চম্পট দে চম্পট দে চম্পট!
হতভম্ব বাঘার দুই কান খাড়া হয়ে উঠল! সে মানুষের ভাষায় কথা কইতে পারে না বটে, কিন্তু শুনলে মানুষের ভাষা বুঝতে পারে। এই কুমিরটার কথা যে মানুষের কথার মতন শোনাচ্ছে!
কিন্তু এ-সব কথা নিয়ে এখন সময় নষ্ট করবার সময় নেই। সে নিজের দেহ দিয়ে। কোনও ক্ষুধার্ত জলচরের উপবাসভঙ্গ করতে মোটেই রাজি নয়! অতএব বাঘা তাড়াতাড়ি সাঁতার কেটে অনেক দূরে চলে গেল।
কিন্তু কুমিরটা তাকে একবারও আক্রমণ করবার চেষ্টা করলে না।
বাঘা তখন আবার ডাঙার দিকে ফিরল। তখন আবার সেই ছায়া-দানবের কথা তার মনে পড়ল। কিন্তু কোথায় গেল সে? কোনওদিকেই তাকিয়ে বাঘা তাকে আবিষ্কার করতে পারলে না।
বোট যে কেন আকাশে উড়েছিল, সে এখন তা বুঝতে পেরেছে। দানবের মাথায় বোটের ভেতরেই যে তার মনিবরা আছেন, এও সে জানে। এখন সে অনায়াসেই পুলিশের ইস্টিমারে উঠে নিজে নিরাপদ হতে পারত, কিন্তু সে কথা একবারও তার মনে হল না। বাঘা যে-জাতের জীব, সে-জাত প্রাণের চেয়েও বড় মনে করে মনিবকে। অতএব সে সাঁতার কেটে ডাঙায় গিয়ে উঠল,কারণ তার দৃঢ়বিশ্বাস হল যে, মনিবরা দানবের মাথায় চড়ে ওই দ্বীপেই গিয়েছেন।
কিন্তু দ্বীপে উঠে হল আর এক মুশকিল। দানবটা কোনদিকে গিয়েছে? চারদিকেই গভীর জঙ্গল, কোনদিকে যাওয়া উচিত?
মানুষ হলে বাঘাকে এখন হতাশ হতে হত। কিন্তু সে হচ্ছে কুকুর, তার তীক্ষ্ণ ঘ্রাণশক্তি আছে, তাকে ফাঁকি দেওয়া সহজ নয়। রামদাস যখন বোট শূন্যে তুলেছিল, তখনি তার গায়ের বিশেষ গন্ধ বাঘার নাকে এসেছিল। সে এখন চারিদিকের মাটি শুঁকে-শুকে রামদাসের গায়ের গন্ধ আবিষ্কারের চেষ্টায় লেগে গেল।
ভোর হল। সূর্য উঠল। গাছের মাথায়-মাথায় রোদের আলপনা। বাঘা তখনও ব্যস্ত হয়ে মাটি শুঁকে-শুঁকে বেড়াচ্ছে!
আরও কতক্ষণ পরে এক জায়গায় বড়-বড় কয়েকটা পায়ের দাগ দেখা গেল। সেইখানে নাক বাড়িয়েই বাঘা আনন্দে অস্ফুটকণ্ঠে ডেকে উঠল! এতক্ষণে সেই গন্ধ পাওয়া গেছে।
আর কেউ তাকে বাধা দিতে পারবে না! মহা খুশি হয়ে ল্যাজ নাড়তে নাড়তে বাঘা মাটিতে নাক রেখে অগ্রসর হল।
কখনও খোলা জমির ওপর দিয়ে এবং কখনও ঘন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে অনেকক্ষণ পথ চলে বাঘা শেষটা এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়ে পড়ল। সেখানে একটা শুকনো গাছের গুঁড়ির পাশে তাদের সেই মোটরবোটখানা কাত হয়ে পড়ে আছে!
বাঘা দৌড়ে গিয়ে বোটে উঠল। কামরার ভেতরে ঢুকল। সেখানে তার মনিবদের জিনিসপত্তর ও বন্দুকগুলো এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে, কিন্তু তার মনিবরা কোথায়?
