বিনয়বাবু বললেন, পৃথিবীর মানুষ যত ছোট আর দুর্বলই হোক, আপনার ওই রামদাসের মতন একটিমাত্র দানবকে বধ করবার শক্তি তাদের আছে!
একটিমাত্র দানব? মোটেই নয়, মোটেই নয়! আর এক দ্বীপে আমি আমার শিশু দানবদের লুকিয়ে পালন করছি! সেই দ্বীপ থেকে এখানে আসবার সময়েই তো আমার বিড়াল-বাচ্ছাকে হতভাগা মাঝি-মাল্লারা জলে ফেলে দিয়েছিল! নাজানি সে বাচ্ছাটা আরও কত বড় হতে পারত। তাকেই তোমরা হত্যা করেছ, তোমাদের ও-অপরাধ আমি কিছুতেই ক্ষমা করব না।
বিমল একটুখানি চুপ করে থেকে বললে, দানব রহস্য তো বুঝলুম, কিন্তু ছড়া কাটে কারা?
প্রশ্ন শুনেই ধরণী ও-হো-হো-হা-হা-হা করে হেসে যেন গড়িয়ে পড়ল! তারপর অনেক কষ্টে হাসি থামিয়ে বললে, ছড়া কাটে কারা? ছড়া কাটে কারা? এখনও তাদের দেখতে পাওনি বুঝি? তারা হচ্ছে বাংলাদেশের মাসিকপত্রের দুজন কবি!
বিমল সবিস্ময়ে বললে, কবি!
হ্যাঁ। তারা এমনি যাচ্ছেতাই কবিতা লিখত যে, বাংলা মাসিকপত্রগুলো অপাঠ্য হয়ে উঠেছিল! কত সমালোচক তাদের গালাগাল দিয়েছে, কিন্তু তাদের ভয়ঙ্কর কবিতা লেখার উৎসাহ একটুও কমাতে পারেনি। বাধ্য হয়ে আমি তাদের এখানে এনে ধরে রেখেছি–অবশ্য তাদের দেহকে নয়, তাদের মস্তিষ্ককে!
সে আবার কী?
তোমরা কি এখনকার ইউরোপীয় অস্ত্র-চিকিৎসকদের বাহাদুরির কথা শোনোনি? বাঁদরের দেহের গ্রন্থি কেটে তারা মানুষের দেহের ভেতরে বসিয়ে দিচ্ছে। একজন মানুষের হৃৎপিণ্ড খারাপ হয়ে গেলে কেটে বাদ দিয়ে, তার জায়গায় কোনও সদ্য মৃত মানুষের হৃৎপিণ্ড তুলে বসিয়ে দিচ্ছে। আমি নিজেও ডাক্তারি পাশ করেছি। তাই এসব বিষয় নিয়েও পরীক্ষা করি। মানুষের মস্তিষ্ক জন্তুর মাথায় চালান করলে কি ব্যাপার হয় সেটা দেখবার জন্যে আমার যথেষ্ট কৌতূহল ছিল। তাই একদিন ওই দুই নাছোড়বান্দা দুষ্ট কবিকে ধরে এনে কি করলুম জানো? করলুম ছোটখাটো একটা অস্ত্রোপচার! একটা কুমির আর একটা হনুমান ধরলুম, তারপর তাদের জানোয়ারি মস্তিষ্ক কেটে বাদ দিয়ে দুই কবির মস্তিষ্ক কেটে নিয়ে বসিয়ে দিলুম! কিন্তু হতভাগা কবির মস্তিষ্ক! কুমির আর হনুমানের দেহে ঢুকেও কবিতা রচনা করতে ভোলে না! করুক তারা এই অরণ্যে রোদন! কিন্তু বাংলা মাসিকের পাঠকরা আজ বেঁচে গিয়েছে। (পশুর মাথায় মানুষের মস্তিষ্ক চালান করবার এই অদ্ভুত কল্পনার জন্যে আমি এক বিলাতি লেখকের কাছে ঋণী। ইতি-লেখক)
এই ভীষণ কথা যারা শুনলে তাদের মনের ভেতরটা তখন কেমন করছিল, তা জানেন। কেবল অন্তর্যামীই! ধরণী আবার অট্টহাস্য করে বললে, তোমরাও বেশি ভয় পেও না, তোমাদেরও আমি একেবারে মেরে ফেলব না! তোমাদের দেহগুলো নষ্ট হবে বটে, কিন্তু তোমাদের মস্তিষ্ক বেঁচে থাকবে পশুদের মাথার ভেতরে গিয়ে। তবে কোন পশুকে কার মস্তিষ্ক দান করব, সেটা এখনও স্থির করে উঠতে পারিনি। আজ রাত্রেই একটা কোনও ব্যবস্থা করতে পারব বলে বোধ হচ্ছে! হা-হা-হা-হা!
কুমার গর্জন করে বললে, পিশাচ! দুরাত্মা! মনে করছিস আমাদের হত্যা করে তুই নিস্তার পাবি? ইস্টিমারে আমাদের বন্ধুরা আছে তারা তোকে ক্ষমা করবে না!
বিমল শান্তভাবেই বললে, ধরণীবাবু, এখনও আমাদের ছেড়ে দিন, নইলে আপনাকে ফাঁসিকাঠে ঝুলতে হবে!
অট্টহাসি হাসতে-হাসতে ধরণী বললে, তোমরা হাসালে দেখছি! আমরা এখন কোথায় আছি জানো? পাতালে! এই পাতালে ঢোকবার পথ এমন গভীর জঙ্গলে ঢাকা আছে, আজ সারাদিন ধরে খুঁজলেও ইস্টিমারের লোকেরা কোনও সন্ধান পাবে না! আজ রাত্রেও যদি ইস্টিমার দ্বীপের কাছে থাকে, তাহলে অন্ধকারে গা ঢেকে রামদাস গিয়ে সেখানাকে জলে ডুবিয়ে দিয়ে আসবে! সুতরাং, বুঝতেই পারছ, মনুষ্য-দেহ ত্যাগ করবার জন্যে তোমরা এখন প্রস্তুত হও! হা-হা-হা! হাসতে-হাসতেই ধরণী ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল!
রামহরি হঠাৎ গলা ছেড়ে কেঁদে উঠল! বিমল হেসে বললে, থামো রামহরি, থামো! অমন শেয়ালের মতো চাচালে ধরণী এখনি এসে তোমার মগজ কেটে নিয়ে হয়তো শেয়ালেরই মাথায় ঢুকিয়ে দেবে!
বিনয়বাবু গম্ভীরভাবে বললেন, না, ঠাট্টা নয় বিমল! যা শুনলুম তা আমাদের পক্ষেও ভয়াবহ, সমস্ত মানুষ-জাতির পক্ষেও ভয়াবহ! এখন কিসে প্রাণ বাঁচে, ভালো করে সেটা ভেবে দেখা দরকার।
বিমল অবহেলা-ভরে বললে, আর মিথ্যা ভাবনা! আছি পাতালপুরীতে বাইরে রামদাসের পাহারা! আমাদের হাত-পা এমন ভাবে বাঁধা যে, নড়বার ক্ষমতাও নেই! বিনয়বাবু, বাঁচবার ভাবনা মিথ্যা!
.
একাদশ পরিচ্ছেদ । বাঘা কি করলে
খানিকক্ষণ কেউই কথা কইবার ভাষা খুঁজে পেলে না।
পাতালপুরীর গর্ভে যেটুকু রোদ এসে পড়েছিল, সেও যেন ভয়ে-ভয়ে ধীরে-ধীরে সরে যাচ্ছে ঘরের ভেতরে দিনের বেলাতেই সন্ধ্যার আভাস ফুটে উঠছে!
বাহির থেকে মাঝে-মাঝে গাছপালার দীর্ঘশ্বাস ছাড়া আর কোনও শব্দই ভেসে আসছে না।
কুমার বললে, পৃথিবী আর মঙ্গল গ্রহ জয় করেও শেষটা কি তাহলে ওই বুড়ো ধরণীর হাতে আমাদের হার মানতে হবে?
বিমল বললে, উপায় কী? মরতে তো হবেই একদিন। আজ না-হয় ধরণীই হবে আমাদের যমদূত! জীবনের প্রবল আনন্দ আমরা দুই হাতে লুণ্ঠন করে নিয়েছি সাধারণ মানুষের দশ জন্মের যৌবন আমাদের এক জন্মের মধ্যে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছে, তোমার আর কি অভিযোগ থাকতে পারে কুমার? এই অতিরিক্ত জীবনের বন্যা আমার যৌবনকে শ্রান্ত করে তুলেছে, আমি এখন ঘুমোতে পেলে দুঃখিত হব না!
