ধরণী আরও বেশি ক্রুদ্ধ হয়ে আরও বেশি চেঁচিয়ে বললে, দেখবার জন্যে, না মরবার জন্যে? তোমরা আমার বিড়ালকে হত্যা করেছ, তোমাদের আমি ক্ষমা করব না!
বিমল বললে, আপনার বিড়ালকে মেরেছি একলা আমি! আমার অপরাধে ওঁরা কেন। শাস্তি পাবেন? ওঁদের ছেড়ে দিন!
ছেড়ে দেব? হা-হা-হা-হা! ছেড়ে দেবই বটে! ওদের ছেড়ে দি, আর ওরা দেশে গিয়ে সারা পৃথিবীর লোককে নিয়ে আবার এখানে ফিরে আসুক! সবাই আমার গুপ্তকথা জানুক। জানো বাপু, যে আমার গুপ্তকথা জেনেছে তার আর মুক্তি নেই!
আপনার কি গুপ্তকথা আমরা জানতে পেরেছি?
কিছু-কিছু জানতে পেরেছ বইকী! আসল কথা এখনও জানতে পারোনি বটে, তবে তোমাদের কাছে তা বলতে এখন আমার আর আপত্তিও নেই! তোমরা তো আর দেশে ফিরে যাবে না!
ঘরের কোণে একটা টুল ছিল ধরণী তার ওপরে গিয়ে বসল। তারপর বলতে লাগল, এই নির্জনে একলা বসে আমি সাধনা করি। কি সাধনা করি জানো! পুরাতন পৃথিবীকে নতুন রূপ, নতুন শক্তি দেওয়ার সাধনা! মানুষ বড় ছোট্ট, বড় দুর্বল জীব। তার মস্তিষ্ক অন্য সব জীবের চেয়ে শ্রেষ্ঠ, কিন্তু দেহ হিসাবে তার চেয়ে বৃহৎ আর বলবান প্রাণী আছে অনেক। কাজেই মানুষকে কি করে আরও বড় ও শক্তিমান করে তোলা যায় প্রথমে সেইটেই হল আমার ধ্যান ধারণা। কেমন করে সে ধ্যান-ধারণা সফল হল, তোমাদের কাছে সে-কথা খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে বলে লাভ নেই। কারণ সাধারণ মানুষের গোবর-ভরা মাথায় তা ঢুকবে না। তবে সামান্য দু-একটা ইঙ্গিত দিচ্ছি শোনো। Glands বা গ্রন্থিদের নাম শুনেছ তো? এই গ্রন্থিদের রসেই মানুষের দেহ টিকে থাকে। গুটি-পাঁচেক গ্রন্থি দেহের ভেতরে রস-সঞ্চার করে; আর তাদের মধ্যে প্রধান তিনটি গ্রন্থির নাম হচ্ছে Thyroid, Adrenal ও Pituitary। প্রথমটির অবস্থান মানুষের কণ্ঠে, দ্বিতীয়টির মূত্রাশয়ে আর তৃতীয়টির মস্তিষ্কে। এইসব গ্রন্থির হের-ফেরে মানুষের দেহের অদল-বদল হয়। ধরো Thyroid গ্রন্থির কথা। যে-শিশুর দেহে এই গ্রন্থি বিকৃত অবস্থায় থাকে–
বিনয়বাবু ধরণীর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললেন, তার মস্তিষ্ক আর কঙ্কালের বাড় বন্ধ হয়ে যায়। ত্রিশ বছর বয়সেও তার দেহ আর বুদ্ধি হয় খোকারই মতন। আমি এ সব জানি ধরণীবাবু! আবার Pituitary গ্রন্থি অতিরিক্ত রস ঢাললে মানুষের দেহের বাড়ও অতিরিক্ত রকম হয়ে ওঠে–কেউ হয় আশ্চর্য রকম মোটা; আবার কেউ বা হয় আট-দশ ফুট লম্বা! গ্রন্থি নিয়ে মিছামিছি লেকচার না দিয়ে আপনি কাজের কথা বলুন,–যতটা ভাবছেন আমরা ততটা মূর্খ নই!
ধরণী একটু থতমত খেয়ে অল্পক্ষণ বিনয়বাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বললে, তাহলে তোমাদের ঘটে একটু-আধটু বুদ্ধি আছে দেখছি! তবে আমার পরীক্ষার আসল পদ্ধতিটা তোমাদের কাছে আর খুলে বলা হবে না। যদিও ওই দেহ নিয়ে তোমরা আর এ ঘরের বাইরে যেতে পারবে না, তবু সাবধানের মার নেই!
কুমার বললে, দেহ নিয়ে বাইরে বেরুতে পারব না! তার মানে?
ধরণী হেসে উঠে বললে, মানে? মানে নিশ্চয়ই একটা আছে! হ্যাঁ, শীঘ্রই তোমাদের চেতনা থাকবে বটে, কিন্তু তোমাদের দেহগুলো পঞ্চভূতে মিশিয়ে যাবে!
সকলে মহা বিস্ময়ে এই ধাঁধার কথা ভাবতে লাগল! চেতনা থাকবে, কিন্তু দেহ থাকবে না? আশ্চর্য! ভয়ানকও বটে!
ধরণী বললে, তারপর শোনো। আমার পরীক্ষা-পদ্ধতির কথা আর বলব না বটে, কিন্তু পরীক্ষার ফলের কথা তোমাদের কাছে বলতে ক্ষতি নেই। আমি এমন সব বিশেষ ঔষধ বা খাবার আবিষ্কার করেছি, দ্রব্যগুণে যা গ্রন্থিদের রস উৎপাদনের ক্ষমতা কল্পনাতীতরূপে বাড়িয়ে তোলে। ওই আবিষ্কারের দৌলতে আমি এখন মানব-দানব সৃষ্টি করতে পারি!
বিমল বললে, যেমন হরিদাসের ভাই রামদাস?
হ্যাঁ। রামদাস জন্মাবার পর থেকেই মানুষ হয়েছে আমার আবিষ্কৃত খাবার খেয়ে। সে। যখন তিনমাসের শিশু, তখনি তার দেহ লম্বায় হয়ে উঠেছিল তিন ফুট! তার অতি বাড় দেখে পাড়ার লোক এমন কৌতূহলী হয়ে উঠল যে, আমাকে এই নির্জন দ্বীপে পালিয়ে আসতে হল! কেবল রামদাস নয়, একটা বিড়াল ও একটা কুকুরকেও আমি আমার খাবার খাইয়ে বাঘ আর হাতির মতো বড় করে তুলেছি। এতে অবাক হওয়ার কিছুই নেই। আদিম যুগের হাতি, বাঘ, সিংহ আর ষাঁড়রা এখনকার চেয়ে ঢের বড় হত কেন? কোমোডোর গোসাপরা এখনও বড়-বড় কুমিরেরও চেয়ে মস্ত হয় কেন? কেবল ওই গ্রন্থির অতিরিক্ত রসের মহিমায়! এদিকে আমার পরীক্ষা শেষ হয়ে গেছে। আমি এখন সুদিনের অপেক্ষায় বসে আছি।
বিনয়বাবু জিজ্ঞাসা করলেন, কিসের সুদিন?
ধরণী বিকট উল্লাসে চিৎকার করে বললে, আমি এই ক্ষুদ্র দুর্বল মানুষের পৃথিবী জয় করব! আর বছর-বারো পরে আমার দানব-বাহিনী নিয়ে তোমাদের মতো জ্যান্ত পুতুলের খেলাঘর আক্রমণ করব, ধীরে-ধীরে একালের সমস্ত মানুষ-জাতিকে লুপ্ত করে দিয়ে দুনিয়ার সর্বশক্তিমান সম্রাট হয়ে নতুন এক মহামানবের পৃথিবী গড়ে তুলব! সে পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষ হবে প্রায় কলকাতার মনুমেন্টের মতন উঁচু, আর প্রত্যেক বাড়ি হবে মিশরের পিরামিডের মতন উঁচু, আর সেখানকার বড়-বড় অট্টালিকা উঁচু হবে দার্জিলিং পাহাড়ের সমান! আমার তৈরি মানুষরা তিন-চারবার পা ফেলে হেঁটেই গঙ্গা আর পদ্মা নদী পার হয়ে যাবে। আমার রামদাস তো এখনও বালক, মাথায় সে আরও কত উঁচু হবে আমিই তা জানি না!
