—– —–
একে-একে যখন তাদের আবার জ্ঞান হল, তখন রাত কি দিন প্রথমে তা বোঝা গেল না! চারিদিকে না-আলো না-অন্ধকার, সন্ধ্যার মুখেই পৃথিবীকে দেখতে হয় এইরকম আবছায়া মায়া-মাখা রহস্যময়!
সামনেই দেখা যাচ্ছে একটা দরজার মতো, বিমলের চোখ সেই ফাঁকা জায়গাটুকু দিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল কিন্তু সেখানেও আলো খুব স্পষ্ট নয়।
বিমল ওঠবার চেষ্টা করলে, পারলে না! তার সর্বাঙ্গ দড়ি দিয়ে বাঁধা।
কুমার বললে, বন্ধু, আমরা বন্দি।
বিমল বললে, হুঁ। কিন্তু কার বন্দিধরণীর না কুম্ভকর্ণের।
বিনয়বাবু বললেন, বোধহয় ধরণীর। বিমল, ভালো করে তাকালেই বুঝতে পারবে, আমরা একটা অন্ধকার ঘরে বন্দি হয়ে আছি। এর দরজাটা সাধারণ মানুষ ঢোকবারই উপযোগী, এর ভেতর দিয়ে তোমাদের ওই কুম্ভকর্ণ কিছুতেই দেহ গলাতে পারবে না। সুতরাং যে আমাদের এ ঘরে এনে রেখেছে তার দেহ তোমার-আমার চেয়ে বড় হতে পারে না।
বিমল বললে, কিন্তু আমরা কোথায় আছি? বাহির থেকে গাছপালার আওয়াজ আসছে– একটা কাকও কা-কা করছে! মনে হচ্ছে এখন দিনেরবেলা! কিন্তু আলো এত কম কেন?
কমল বললে, বাইরে যেটুকু দেখা যাচ্ছে সেখানে আলো আসছে যেন ওপর থেকেই, আমরা বোধহয় কোনও উঠানওয়ালা বাড়ির একতলার ঘরে বন্দি হয়ে আছি।
বিমল বললে, কিন্তু দ্বীপে এমন কোনও উঁচু বাড়ি থাকলে কালকেই আমাদের নজরে পড়ত। বিনয়বাবু, আমরা বোধহয় জমির নীচে কোন পাতালপুরিতে বন্দি হয়েছি।
হঠাৎ রামহরি আর্তস্বরে বলে উঠল ওই! আবার সেই শব্দভূত!
সকলে কান পেতে শুনলে, বাইরে আবার কোথায় সেই পরিচিত কিচিরমিচির কিচিরমিচির শব্দ হচ্ছে-সঙ্গে-সঙ্গে ডাল-পাতা নড়ে ওঠারও শব্দ, কে যেন গাছের এ-ডাল থেকে ও ডালে লাফালাফি করছে।
তারপরেই সেই অদ্ভুত কণ্ঠস্বরে শোনা গেল–
নেইকো হেথায় রম্ভা-টম্ভা–
আছে অষ্টরম্ভা,
লম্বা লম্বা লম্ফ মেরে
জলদি দে রে লম্বা।
হুমড়োমুখো ধুমড়ো বিড়াল,
আকাশমুখো শৈত্য।
মুখ বাড়িয়ে কুত্তা ধরে।
বটের ডালের পক্ষী,
পালাও ভায়া! কেমন করে
সইবে এ-সব ঝক্কি!
বিমল অভিভূত স্বরে বললে, সেই কণ্ঠস্বর! আবার আমাদের সাবধান করে দিচ্ছে!
কুমার বললে, অতিকায় বিড়াল, কুকুর, দৈত্যসকলকার কথাই ও বলছে! কে ও বিমল, অমন করে লুকিয়ে আমাদের সঙ্গে-সঙ্গে থাকে কেন, বিপদের আগেই সাবধান করে দেয় কেন, আর কবিতাতেই বা কথা কয় কেন?
বিমল বললে, আর একটা কণ্ঠস্বরও আমরা শুনেছি নদীর জলে সেই ভীষণ অমানুষিক কণ্ঠস্বর! এখানে জল নেই বলেই বোধহয় সে গলার আওয়াজটা আর শোনা যাচ্ছে না!
বিনয়বাবু বললেন, চুপ-চুপ, ওই শোনো!
আবার শব্দ হতে লাগল–কিচিরমিচির! আবার গাছের ডালে-ডালে লাফালাফির শব্দ! কিচিরমিচির শব্দ আরও কাছে এগিয়ে এল। তারপর শোনা গেল, অত্যন্ত দুঃখে যাতনায় যেন ভেঙে পড়ে কাঁদতে কাঁদতে কে বলছে–
অনেক দিনের রূপকথা ভাই,
বহুকালের গল্প,
ছিলাম যেন মাটির মানুষ,
সুখ ছিল না অল্প।
রাঙা-রাঙা খোকা-খুকি।
খেলত আমার বক্ষে,
টুকটুকে মোর বউটি সদাই
হাসত মুখে-চক্ষে।
আজ অদৃষ্ট শক্ত করে।
আমায় যখন বাঁধছে–
হায়রে তারা কোথায় বসে।
আমার তরেই কাঁদছে।
হঠাৎ একটা নতুন কণ্ঠে উচ্চস্বরে শোনা গেল, হা, হা, হা, হা! কি হে কবি, এখনও কবিতা ভোলেনি! হা-হা-হা-হা! এ ধরণীর হাসি!
কবিতা আর শোনা গেল না! খালি গাছের ডাল-পাতার শব্দ হল! তারপরেই আর এক শব্দ! কে যেন সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামছে! বিমল ও কুমার পরস্পরের মুখের পানে তাকিয়ে দেখলে। দরজার কাছটা অন্ধকার করে একটা মূর্তি এসে দাঁড়াল ধরণী।
খানিকক্ষণ সেইখানে চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে ধরণী ঘরের ভেতরে প্রবেশ করলে। তারপর সহাস্যে বললে, এই যে বন্ধুগণ! ধরণীর শ্রেষ্ঠ শয্যা ভূমিশয্যায় শুয়ে আছ, আশা করি বিশেষ কোনও কষ্ট হচ্ছে না? কেউ কোনও জবাব দিলে না। ধরণী তেমনি হাসতে হাসতে বললে, হাতির মতো বড় ডালকুত্তা দেখতে চেয়েছিলে, শীঘ্রই তাকে দেখতে পাবে। আর বাঘের মতো বড় বিড়ালকে তো তোমরা নিষ্ঠুর ভাবে হত্যা করেছ! আর তালগাছের মতন উঁচু মানুষকে কাল অন্ধকারে তোমরা ভালো করে দেখতে পাওনি নয়?
বিমল বললে, কে সে?
ধরণী বললে, দেখছি এখনও তোমার কৌতূহল দূর হয়নি! সে কে জানো, আমার চাকর হরিদাসকে কাল দেখেছ তো? সে তার ছোট ভাই রামদাস–তোমরা যার নাম রেখেছ কুম্ভকর্ণ!
বিমল সবিস্ময়ে থেমে-থেমে বললে, হরিদাসের ছোট ভাই রামদাস!
হ্যাঁ, হ্যাঁ, কুম্ভকর্ণ নয়, আর কেউ নয়, হরিদাসের ছোট ভাই রামদাস! ভাবছ, কেমন করে রামদাস এত বড় হল? হা, হা, হা, হা! তারপর হঠাৎ হাসি থামিয়ে অত্যন্ত কঠোর ও গম্ভীর স্বরে ধরণী বললে, কেন তোমরা আমাকে জ্বালাতন করবার জন্যে এখানে এসেছ? মূর্খ মানুষদের মুখ বন্ধ রাখবার জন্যে আমি এত দূরে পৃথিবীর একপ্রান্তে এসে অজ্ঞাতবাস করছি, কিন্তু এখানেও তোমাদের মুখতা আর অন্যায় কৌতূহল থেকে মুক্তি নেই? যত-সব তুচ্ছ জীব, কতটুকু শক্তি তোমাদের? এসেছ আমার সাধনায় বাধা দিতে? জানো, আমি একটা আঙুল নাড়লে তোমরা এখনি ধুলোয় মিশিয়ে যাবে?ধরণী জ্বলন্ত চক্ষে ঘরময় ঘুরে বেড়াতে লাগল অতিশয় উত্তেজিত ভাবে!
বিনয়বাবু শান্ত কণ্ঠে বললেন, ধরণীবাবু, আমাদের আপনার শত্রু বলেই বা ধরে নিচ্ছেন। কেন? আমরা তো আপনার সঙ্গে শত্রুতা করবার জন্যে এখানে আসিনি, আমরা এসেছি শুধু এখানকার অদ্ভুত ঘটনাগুলো স্বচক্ষে দেখবার জন্যে!
