কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ঠাট্টা করছে কে?
নিশ্চয় সেই বুড়ো যাদুকরটা! আমি কালই ধরণীকে গ্রেপ্তার করব!
কি অপরাধে? সে তো এখনও আমাদের কোনও অনিষ্ট করেনি!
সরকারি লোকদের ভয় দেখানোর মজাটা তাকে টের পাইয়ে দেব।
দ্বীপের ভেতর থেকে হা-হা-হা-হা করে কে ভীষণ অট্টহাসি হেসে উঠল! এ সেই হাসি,–যে হাসি সবাই আজই ধরণীর কণ্ঠে শুনে এসেছে, কিন্তু এখন তার চেয়ে ঢের-বেশি তীব্র ও ভীতিপ্রদ!
ইনস্পেকটর খাপ্পা হয়ে বললেন, সেপাই, সেপাই! সবাই বন্দুক নাও! বোট ভাসাও! আজই আমি বুড়োকে গ্রেপ্তার করব!
বিমল তাড়াতাড়ি বলে উঠল, না, না, আজ আর গোলমালে কাজ নেই! আজ খালি দেখুন, কোথাকার জল কোথায় দাঁড়ায়! নইলে সব পণ্ড হবে!
অট্টহাসি থামল না, কিন্তু ধীরে-ধীরে দূরে চলে যেতে লাগল।
বিনয়বাবু বললেন, ধরণী পাগল নয়তো?
অনেক দূর থেকে যথাক্রমে নদীর জলে ও গাছের ওপরে উঠছে সেই আশ্চর্য ঘোঁ ঘটঘট ও কিচিরমিচির শব্দ।
কুমার বললে, ওই হাসি আর শব্দ দুটো যখন একসঙ্গে হচ্ছে, তখন বেশ বোঝা যাচ্ছে যে, এখানে তিনটে আলাদা-আলাদা জীব আছে!
বিনয়বাবু বললেন, তাহলে এই তৃতীয় জীবটি কে? দ্বীপে গিয়ে আমরা তো কেবল ধরণী আর তার চাকর হরিদাসের দেখা পেয়েছি!
বিমল ভাবতে-ভাবতে বললে, কুমার, তুমি ঠিক ধরেছ! হা বিনয়বাবু, এই তৃতীয় জীবটি কে, এখন সেইটেই আমাদের আবিষ্কার করতে হবে।
ক্রমে সমস্ত কণ্ঠস্বর থেমে গেল, নির্জনতা সজাগ হয়ে উঠল এবং রাত্রির অন্ধ স্তব্ধতাকে সংগীতময় করে তুলতে লাগল সাগরসঙ্গমে উচ্ছ্বসিত নদীর কলধ্বনি! সে অশ্রান্ত ধ্বনি যেন সুদূর অসীমের স্মৃতিকে কানের কাছে ডেকে আনে! সে ধ্বনি যেন নিকটের যা-কিছুকে সুদুর অসীমতায় ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চায়!
বিমল বাঘাকে বোটের বাইরে ঠেলে দিয়ে বললে, যা বাঘা, বাইরে যা! আমরা এখন একটু ঘুমোব, তুই পাহারা দেয়।
বাঘা যেন বিমলের কথা বুঝতে পারলে! সে বোটের ধারে গিয়ে কান খাড়া করে বসে রইল!
বোটের তলায় নদীর করাঘাতের শব্দ শুনতে-শুনতে সবাই একে একে ঘুমিয়ে পড়ল!
এমনকী শেষটা বাঘার চোখও ঘুমে ঢুলে পড়ল!
গভীর নিশীথিনীর কালো শাড়ির আঁচল সরিয়ে বেরিয়ে এল যেন রুগ্ন চাঁদের অত্যন্ত হলদে মুখ! তাকে এই বিজনতার মধ্যে দেখলে ভয় হয়, চিতার পাশে খাটে-শোয়ানো মড়ার মুখ মনে পড়ে যায়।
আচম্বিতে বাঘা ভয়ানক জোরে চেঁচিয়ে উঠল এবং কমল জেগে ধড়মড় করে উঠে বসল!
কমলের মনে হল, সে বোটের ভেতরে আছে বটে, কিন্তু বোট যেন আর নদীগর্ভে নেই! কী অদ্ভুত অনুভূতি!
হঠাৎ বাঘা ভয় পেয়ে বোটের ওপর থেকে লাফ মারলে! অনেক উঁচু থেকে জলে লাফিয়ে পড়লে যেরকম শব্দ হয়, সেইরকম একটা শব্দ হল!
ইতিমধ্যে আর সকলেও জেগে উঠল! তাদেরও মনে হল, তারাও যেন কারুর মাথার ওপরে ঝকার ভেতরে মোরগের পালের মতো বসে রয়েছে।
বিমল তাড়াতাড়ি কামরার বাইরে মুখ বাড়িয়ে অস্পষ্ট চাঁদের আলোতে বিস্মিত চোখে দেখলে, তারা দ্বীপের গাছের সারের চেয়েও আরও ওপরে উঠেছে এবং অনেক নীচে আলো আঁধারির মধ্যে চিকচিক করছে নদীর জল!
একটা নিশ্বাস ফেলে, কঠিন হাস্য করে বিমল বললে, বোধহয় সেই কুম্ভকর্ণই বোট শুদ্ধ আমাদের মাথায় করে নিয়ে যাচ্ছে!
.
দশম পরিচ্ছেদ । মানুষ-‘মনুমেন্ট’
সেই রুগ্ন চাঁদের হলদে মুখ! মিটমিটে আলোতে পৃথিবীর কিছুই ভালো করে নজরে পড়ে না! বিমল বোটের তলায় উঁকিঝুঁকি মেরে দেখবার চেষ্টা করলে কিন্তু কিছুই দেখতে পেলে না। বোটের তলায় রয়েছে কেবলই অন্ধকার কষ্টিপাথরের মতো কালো আর নিরেট!
বোটের ভেতরে আর সবাই তখন নির্বাক ও বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে বসে আছে, বোধহয় তাদের মাথার ভেতরে তখনও বিমলের সেই অসম্ভব কথাগুলোই বারংবার ঘোরাফেরা করছে সেই কুম্ভকর্ণই বোটশুদ্ধ আমাদের মাথায় বয়ে নিয়ে যাচ্ছে!
বোটের নীচের দিকটা দেখবার ব্যর্থ চেষ্টা ছেড়ে দিয়ে বিমল আবার বললে, না, আর কোনও সন্দেহ নেই! কুম্ভকর্ণই আজ ঝকামুটে হয়েছে। তার আঁকা হয়েছে এই বোট, আর বোটের মধ্যে আছি আমরা!
বিনয়বাবুর মুখে অস্ফুট স্বরে শোনা গেল, অসম্ভব!
বিমল শুকনো হাসি হেসে বললে, হ্যাঁ, অসম্ভবই বটে! কিন্তু অসম্ভবের দেশে অসম্ভবও সম্ভব হয়। জলে সাঁতার কাটা যার একমাত্র কর্তব্য, সেই বোট পাখিও নয়, এরোপ্লেনও নয় যে শুন্য দিয়ে উড়ে যাবে! বিনয়বাবু, চেয়ে দেখুননদীর জল এখন কত দূরে!
সকলে অবাক বিস্ময়ে চেয়ে দেখলে, নদীর জলে আলোর ঝিকিমিকি বহু দূরে সরে গিয়েছে এবং ক্রমে আরও দূরে সরে যাচ্ছে! জলতরঙ্গের কলকল্লোলও আর শোনা যায় না!
বিমল বললে, আমাদের মাথায় নিয়ে কালাপাহাড় এখন জমির ওপর দিয়ে হাঁটছে!
বিনয়বাবু উৎকণ্ঠিত স্বরে বললেন, কোথায় যাচ্ছে সে?
এর উত্তর সেইই জানে। কলকাতায় আঁকায় চড়ে রামপাখিরা আসে আমাদের জন্যে। এখানে আঁকায় চড়ে আমরা যাচ্ছি হয়তো ধরণীর বাসায়!
এতক্ষণে রামহরির হুঁস হল। সে হাউমাউ করে বলে উঠল, ও খোকাবাবু! ওই ধরণী কি পিশাচ? আমাদের কেটে খানা খাবে নাকি?
কুমার বলে উঠল, বন্দুক নাও বিমল! বোটের তলার দিকে গুলি-বৃষ্টি করো!
বোটের তলায় কে আছে, ভগবানই জানেন। কিন্তু যে-জীবই থাকুক, সে যে কুমারের কথা শুনতে পেলে ও বুঝতে পারলে, তৎক্ষণাৎ তার প্রমাণ পাওয়া গেল। কারণ কুমারের মুখের কথা শেষ হতে-না-হতেই বোটখানা ধরে কে এমন ঘনঘন বিষম ঝাঁকুনি দিতে লাগল যে সকলেই তার ভেতরে চারিদিকে ছিটকে পড়ল! সে ভয়ানক ঝাঁকুনি আর থামে না– সকলেরই অবস্থা হল কুলোর মধ্যে ফুটকড়াইয়ের মতো, গতর গুঁড়ো হয়ে যাওয়ার জোগাড় আর কি! আঁকুনি যখন থামল, বোটের ভেতরে সবাই তখন জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে!
