নিশ্চয়ই করব। কিন্তু আগে থাকতেই বলে রাখছি, এখানে বনজঙ্গল ছাড়া দেখবার কিছুই নেই।
বিমল তাঁর কাছে গিয়ে খুব চুপিচুপি শুধোলে, বনজঙ্গলের ভেতরে গিয়ে দু-একটা হাতির মতো বড় ডালকুত্তা আর বাঘের মতো বড় বিড়ালও খুঁজে পাওয়া যাবে না?
ধরণী যেন কিছুই বুঝতে না পেরে বিমলের মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন!
আর তালগাছ সমান উঁচু মানুষ?
আপনি কি আমার সঙ্গে ঠাট্টা করছেন? বলেই ধরণী হা-হা করে অট্ট হাস্য করে উঠলেন! সে অট্টহাস্য বিমল ও কুমার আগেই শুনেছিল–গেলবারে দ্বীপের কাছ থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময়ে।
—– —-
কমল সেদিন রামহরিকে ধরে বসেছিল, তাকে একটা নতুন রান্না খাওয়াতে হবে!
রামহরি যত বলে, সুমুদুরের জলে ডোঙায় বসে কি নতুন রান্না খাওয়ানো চলে ভাই?
কমল ততই বলে, পাকা রাঁধিয়ে আকাশে উড়েও হাতের বাহাদুরি দেখাতে পারে! রামহরি, তুমি তাহলে কোনও কর্মের নও!
তার রন্ধন নিপুণতার ওপরে কেউ কৌতুকছলে ঠাট্টা করলেও রামহরি সহ্য করতে পারত না। অতএব সবাই যখন গিয়েছিল দ্বীপে বেড়াতে, রামহরি তখন ছিল নৌকোয় বসে মাছ ধরতে ব্যস্ত।
এবং আজ রাত্রে সে যে নতুন রান্না কমল ও আর সবাইকে খাওয়ালে, তার নাম রেখেছিল সে মুখবন্ধ!
রান্নাটি কমলের এতই ভালো লেগেছিল যে, মনের ভাব আর ভাষায় প্রকাশ করতে পারলে না!
বিনয়বাবু প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে মস্ত এক বক্তৃতা দিয়ে শেষটা বললেন, এটা কোনদেশি রান্না বিমল?
বিমল বললে, তা আমি জানি না। তবে বিলিতি মতে একে মাছের রোস্ট বলেও ডাকা যায়।
আহারাদির পর যখন শয়নের ব্যবস্থা হচ্ছে, তখন কুমার বললে, দ্বীপটা স্বচক্ষে দেখে আমি কিন্তু হতাশ হয়েছি। মনে হচ্ছে, আমাদের খালি কাদা ঘেঁটে মরাই সার হল!
বিমল বললে, আমি কিন্তু এখনও হতাশ হইনি! আমি কালকের জন্যে অপেক্ষা করছি। হয়তো নতুন কিছু আবিষ্কার করতে পারব!
বিনয়বাবু সারাদিন দ্বীপের কথা নিয়ে কোনও মত প্রকাশ করেননি। এখন তিনি হঠাৎ সবাইকে বিস্মিত করে বললেন, দ্বীপে গিয়ে আমি কিন্তু একটা আশ্চর্য আবিষ্কার করেছি।
কুমার বললে, আপনি! কী আবিষ্কার?
ধরণীবাবুর বাংলোর পিছনে আছে একটা জলাভূমির মতো জায়গা। সেখানে ভিজে মাটির ওপরে আমি এমন কতকগুলো পায়ের দাগ দেখেছি, যা মানুষের পায়ের দাগের মতোই, কিন্তু মানুষের পায়ের দাগের চেয়ে বারো-তেরো গুণ বেশি বড়!
কমল সবিস্ময়ে বললে, কিন্তু আপনি এতক্ষণ তো এ কথা বলেননি!
বিমল হাসতে-হাসতে বললে, বিনয়বাবু বলেননি, আমিও বলিনি। সে পায়ের দাগগুলো আমিও দেখেছি! বলেই সে একখানা চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল এবং বিনয়বাবুও তার দৃষ্টান্তের অনুকরণ করলেন!
কুমার ও কমল একবার পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলে, তারপর যে-যার জায়গায় গিয়ে শুয়ে পড়ল।
ঠিক সেই সময়েই সকলকার কানে এক অদ্ভুত স্বর জেগে উঠলঃ
ঘোঁ-ঘট ঘট, ঘোঁ-ঘট ঘট, ঘোঁ-ঘট ঘট!
চলো রে চলো, চটপট চলো, দি চম্পট!
সকলেই সচমকে ধড়মড় করে আবার উঠে বসল! গতকল্য গভীর রাত্রে নদীর বক্ষে এই অমানুষিক কণ্ঠস্বরই শোনা গিয়েছিল!
সকলেই বোটের ধারে ঝুঁকে পড়ে মুখ বাড়ালে! কিন্তু ঘুটঘুটে অন্ধকার রাত, কিছুই দেখা গেল না এবং কিছুই দেখবার উপায় নেই!
বিনয়বাবু বললেন, বিমল, আমরা মঙ্গল গ্রহেও গিয়েছি, কিন্তু সেখানেও এমন আশ্চর্য কণ্ঠস্বর শুনিনি!
বিমল টর্চের কল টিপে আলো জ্বেলে বললে, নদীর জল এক জায়গায় খুব তোলপাড় হচ্ছে,–যেন কেউ ওখানে বিরাট দেহ নিয়ে সবে ডুব দিয়েছে। কিন্তু আর কিছুই দেখা যায় না!
এমনসময়ে খানিক তফাতে ওপর থেকে আবার অন্য একটা কণ্ঠস্বর শোনা গেলঃ
কিচিরমিচির কিচিরমিচির কচমচ মচ কচমচমচ।
বুকের কাছে করছে কেমন খচমচ খচ খচ-মচখচ।
মানুষ-ভূতে কালকে পাবে,
কলকাতা কি শালকে যাবে,
কাটবে মগজ চালিয়ে ছুরি কচুকাটা কচকচকচ।
টর্চের আলো শূন্যের অন্ধকার যুঁড়ে খুঁজে পেলে খালি শূন্যতাই!
কমল উত্তেজিত কণ্ঠে বললে, বিংশ শতাব্দীতেও তাহলে দৈববাণী হয়?
কুমার একদিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বললে, কিন্তু এ দৈববাণীর জন্ম বোধহয় ওই গাছগুলোর ভেতর থেকেই!
সকলে দেখলে, নদীর জলের ওপরে ঘন শাখাপল্লব নিয়ে একটা মস্তবড় গাছ ঝুঁকে। পড়েছে এবং তারই ডালপাতাগুলো সশব্দে দুলে-দুলে উঠছে–যেন তার ভেতরে কোনও জীব লুকিয়ে এদিকে-ওদিকে আনাগোনা করছে।
রামহরি বন্দুক নিয়ে বললে, খোকাবাবু, আন্দাজে-আন্দাজে একটা গুলি ছুড়ব নাকি?
বিমল বললে, না রামহরি, কেউ তো এখনও আমাদের সঙ্গে কোনও শত্রুতা করেনি। আমরাই বা আগে থাকতে অস্ত্র ব্যবহার করব কেন?
এমন সময়েই ইস্টিমারের সার্চলাইট অন্ধকারের ওপর দিয়ে ব্যস্ত হয়ে ছুটোছুটি করতে লাগল, সঙ্গে-সঙ্গে নদীর জলের তোলপাড় শব্দ এবং গাছের ডালপালার মড়মড়ানি একেবারে থেমে গেল!
কুমার বললে, এখানে যেসব কবি কবিতা শোনায়, তারা স্বশরীরে দেখা দিতে রাজি নয় দেখছি!
বিনয়বাবু বললেন, কিন্তু কে ওরা? আমাদের ভয় দেখাচ্ছে, না সাবধান করে দিচ্ছে?
ইস্টিমার থেকে চেঁচিয়ে ইনস্পেকটর বললেন, এসব কী কাণ্ড মশাই!
বিমল বললে, যা শুনছেন আর দেখছেন, তা কি গাঁজাখোরের কল্পনা বলে মনে হচ্ছে?
কিন্তু কেউ বোধহয় ভয় দেখাবার জন্যে আমাদের ঠাট্টা করছে। এটা তো আর সত্যযুগ নয় যে, জল আর গাছ কথা কইবে!
