দূরবিনটা নামিয়ে বিমল বললে, ওই সেই দ্বীপবাসী বৃদ্ধ! এখানে যত রহস্যের সৃষ্টি বোধহয় ওই লোকটির জন্যেই! যাক, সব রহস্য পরিষ্কার হয়ে যেতে আর বেশি বিলম্ব নেই!
.
নবম পরিচ্ছেদ । উড়ো বোট
দ্বীপ ক্রমেই কাছে এগিয়ে আসছে।
গেলবারে রাত-আঁধারে আর নানারকম অস্বাভাবিক ধ্বনি-প্রতিধ্বনির বিভীষিকার জন্যে এই অজানা দ্বীপটাকে যেমন রহস্যময় বলে মনে হয়েছিল, আজ তাকে দেখে বিমল ও কুমারের মনে তেমন কোনও ভাবেরই উদয় হল না।
নীল-আকাশের ছায়া-দোলানো নদীর গান-জাগানো চপল জলের কোলে আজ এই সূর্যকরের আলো-আদর-মাখা সবুজ সুন্দর দ্বীপটিকে মনে হতে লাগল ঠিক যেন কোনও ভোরের স্বপ্নে দেখা পরিস্থানের মতো!
গায়ক পাখিরা গাছের এ-ডালে বসে খানিক নেচে আবার ও-ডালে উড়ে গিয়ে বসে নাচ-গানে মেতে উঠছে, ছবিতে আঁকা শকুন্তলার তপোবনের হরিণের মতো দুটি ছোট-ছোট হরিণ এক জায়গায় চুপ করে বসে আছে একান্ত নির্ভয়ে এবং দ্বীপের ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে। দলে-দলে বকেরা আকাশে দোলন্ত বেলের গোড়ের মতো!
বিনয়বাবু ঘাড় নাড়তে নাড়তে বললেন, কী চমৎকার দ্বীপটি! যেন মুনি-ঋষির সাধনকুঞ্জ! এখানে ভয়ানক কিছু দেখবার আশাই করা যায় না!
বিমল বললে, দিনের আলো বড় কপট! ভয়াবহকেও অনেক সময়ে সুন্দর করে দেখায়।
কুমার বললে, বাইরের খোলস অনেক সময়ে চোখে ধাঁধা দেয়। সুন্দর মৌমাছিকে দেখলে কে বলবে যে, তার ভেতরে বিষাক্ত হুল আছে?
এমন সময়ে ইস্টিমার থেকে মেগাফোনে ইনস্পেকটরের কণ্ঠস্বর শোনা গেল–ইস্টিমার আর এগুতে পারবে না, এখানে জল বেশি নেই।
বিমল চেঁচিয়ে বললে, বেশ, আর এগিয়ে যাওয়ার দরকার নেই, এইখানেই নোঙর ফেলা যাক।
দ্বীপ সেখান থেকে একশো হাতের ভেতরেই।
কমল বললে, ওই ভদ্রলোক কিন্তু এখনও সেইভাবে সেইখানেই দাঁড়িয়ে আছেন!
কুমার বললে, বোধহয় আমরা কি করি তাই দেখছেন।
বিমল বললে, কিংবা কি করে আমাদের তাড়ানো যায় তাই ভাবছেন।
বিনয়বাবু বললেন, কিন্তু ওকে দেখলে তো আমার চেয়ে বিপদজনক বলে মনে হয় না!
বিমল বললে, হ্যাঁ, দিনেরবেলায় উনি এই দ্বীপের মতোই নিরীহ! কিন্তু রাত্রে বিপরীত মূর্তি ধারণ করেন! এইবার দ্বীপে নামবার ব্যবস্থা করা যাক, কী বলেন? ইস্টিমারের সঙ্গে দু-খানা বোট আছে, তাতে সিপাইরা আর ইনস্পেকটার থাকবেন। আমরা মোটরবোটেই যাব!
সবাই যখন দ্বীপের ওপরে গিয়ে উঠল, দুপুরের রোদ তখন অত্যন্ত উজ্জ্বল–অধিকাংশ ঝোপঝাপের ভেতরে পর্যন্ত নজর চলে।
দ্বীপের মধ্যে কোনওরকম নতুনত্ব নেই–চারিদিকে গাছপালা জঙ্গল ঝোপঝাপ, মাঝে মাঝে আঁকাবাঁকা পায়ে-চলা পথ, মাঝে-মাঝে ছোট-বড় মাঠ।
বিমল বললে, ইনস্পেকটর বাবু, আপনার সেপাইদের বন্দুক তৈরি রাখতে বলুন! ইনস্পেকটর বাবু হেসে বললেন, যত সব গাঁজাখোরের কথা শুনে আমরা এসেছি বটে, কিন্তু এখানে তো ভয় পাওয়ার কিছুই দেখছি না! কোথায় মশাই আপনাদের কুম্ভকর্ণ? এখনও ঘুমোচ্ছে নাকি?
বিমল গম্ভীর স্বরে বললে, হতে পারে। হয়তো শেষ পর্যন্ত আমরা তার টিকিটিও আবিষ্কার করতে পারব না!
তাহলে এখানে এত তোড়জোড় করে এসে কি লাভ হল?
আমরা এসেছি জনরব সত্য কিনা জানবার জন্যে! জনরব যদি মিথ্যে হয়, তবে ফিরে গিয়ে সেই রিপোর্ট দেবেন।
জনরব কি মশাই? কুম্ভকর্ণকে তো আপনারাও দেখেছেন বললেন! তারপর হাতির মতো বড় ডালকুত্তা, বাঘের মতো বড় বিড়াল, কত আজগুবি গল্পই যে শুনলুম!
কাল রাতে নদীর মাঝখানে যে অমানুষিক কণ্ঠস্বর আপনারা শুনেছেন সেটাও তো আমাদের বানানো নয়?
ইনস্পেকটর একটু যেন শিউরে উঠলেন এবং আর কোনও কথা বললেন না।
যে-পথ ধরে সবাই চলেছে, হঠাৎ তার মোড় ফিরেই দেখা গেল, সামনেই একখানা বাংলোর মতো ছোট একতলা মেটেবাড়ি, ওপরে পাতার ছাউনি।
বারান্দায় স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে আছেন সেই বুড়ো ভদ্রলোক।
সকলে যখন বাড়ির কাছে গিয়ে উপস্থিত হল, বুড়ো ভদ্রলোকটি দুই পা এগিয়ে এলেন। একবার সকলের মুখের ওপরে চোখ বুলিয়ে নিয়ে শান্ত হাসি হাসতে-হাসতে বললেন, এত সেপাই-শান্ত্রী নিয়ে আপনারা কোন রাজ্য জয় করতে যাচ্ছেন?
বিমল এগিয়ে গিয়ে বললে, আমরা দিগ্বিজয়ে বেরুইনি। খালি এই দ্বীপটা খুঁজতে এসেছি।
কেন?
এখানে এমন কিছু দেখেছি যা অন্য কোথাও দেখা যায় না।
বলেন কী মশাই? আমি এখানে বাস করি, কিন্তু উল্লেখযোগ্য কিছুই তো দেখিনি!
এমন সময়ে ইনস্পেকটর তাঁর সুমুখে গিয়ে বললেন, আপনার নাম কী?
ধরণীকুমার মজুমদার।
এই নির্জন দ্বীপে আপনি কি করেন?
আমি সন্ন্যাসী নই বটে, কিন্তু সংসার ত্যাগ করেছি। এখানে বসে পরকালের চিন্তা করি।
আপনার সঙ্গে আর কে আছে?
একজন পুরোনো চাকর।
কোথায় সে?
ধরণী মুখ ফিরিয়ে ডাকলেন, হরিদাস!
ঘরের ভেতর থেকে আর একটি অতিশয় নিরীহের মতো দেখতে প্রাচীন লোক বেরিয়ে এল।
ইনস্পেকটর তাকে আর কিছু জিজ্ঞাসা না করে বললেন, ধরণীবাবু, আপনার বাড়ির ভেতরটা আমরা একবার দেখব।
স্বচ্ছন্দে।
কিন্তু সেখানেও নতুন কিছু আবিষ্কার করা গেল না। আসবাবপত্তর খুবই কম।
বিমল শুধোলে, আপনার একখানা মোটর-বোট আছে না?
ধরণী বললেন, আছে। দেখতে চান তো ওইদিকে নদীর ধারে গেলেই দেখতে পাবেন।
বিমল বললে, না। আজ অনেক বেলা হয়ে গিয়েছে। কাল আমরা সারা দ্বীপটা একবার ভালো করে ঘুরে দেখব, আশা করি আপনি আমাদের সাহায্য করবেন?
