ইস্টিমার থেকে মেগাফোনে মুখ দিয়ে ইনস্পেকটর জিজ্ঞাসা করলে, এখানে কোনও লোক ভয়ানক চেঁচিয়ে কথা কয়েছে। আপনারা কেউ দেখতে পেয়েছেন?
বিমল বললে, না!
বিনয়বাবু বললেন, বিমল, আমার মতে, আজ রাতে দ্বীপের কাছে না যাওয়াই ভালো। আজ এইখানেই নোঙর ফেলে রাতটা কাটিয়ে দেওয়া যাক, কাল সকালে আলোয়-আলোয় দ্বীপের কাছে গিয়ে হাজির হব।
বিমল বললে, আমারও সেই মত।
পরদিন পূর্ব-আকাশে প্রভাত এসে যখন রঙিন আলোর লাইন টানছিল, বিনয়বাবু তখন বোটের ভেতর থেকে বাইরে এসে বসলেন।
কাল সারারাত তার অশান্তিতে কেটেছে, একবারও ঘুম আসেনি, কারণ জলধারার। একটানা ঐকতানের মাঝে-মাঝে সেই অমানুষিক মানুষের চিৎকার আরও কয়েকবার জেগে উঠেছে–অনেক দূর থেকে।
কার এই কণ্ঠস্বর! এ যদি কোনও দানবের কণ্ঠস্বর হয় তাহলে কোথায় সে? সে দানবের আকার যদি আশ্চর্য রকম প্রকাণ্ড হয়, তবে তাকে তো আরও সহজেই দেখতে পাওয়ার কথা! আর, এই গভীর নদীর গর্ভে কোনও নরদেহী দানবের এতক্ষণ ধরে থাকবার ঠাঁইই বা কোথায়?
এই-সব উত্তরহীন প্রশ্ন নিয়েই বিনয়বাবুর রাত কেটে গেছে, এখন ভোরের আলো দেখে বাইরে এসে বসে তিনি অনেকটা আরামবোধ করলেন। রামহরি তার আগেই উঠে তখন চায়ের সরঞ্জাম নিয়ে বসে গেছে–স্টোভে চায়ের জল গরম হচ্ছে এবং আর একটা স্টোভ জ্বালিয়ে অমলেট ভাজবার উদ্যোগ চলছে! রামহরি সকলকে বেঁধে খাওয়াতে ভারি ভালোবাসত, বিষম সব বিপদ-আপদের মাঝখানেও এ-বিভাগের কর্তব্যপালনের জন্যে সে সাধ্যমতো চেষ্টা করত। তাই পৃথিবীর ভেতরে ও বাইরে অনেক সৃষ্টিছাড়া দেশে গিয়েও বিমল ও কুমার প্রভৃতিকে কখনও কোনও কষ্টবোধ করতে হয়নি।
রাত্রের বিভীষিকা রোদের সোনার-জলের ধারায় কুয়াশার মতোই ধুয়ে-মুছে গিয়েছে, নদীর কলধ্বনি শুনে মনে হচ্ছে যেন ছোট্ট শিশুর খুশিভরা হাসির শব্দ! দুরে বনে-বনে গায়ক পাখির দলও জেগে উঠে চারিদিক সরগরম করে তুলেছে এবং বাতাসের উচ্ছ্বাসে ভেসে আসছে। যেন কোনও চন্দনস্নিগ্ধ পুলকস্পর্শ!
বিমল, কুমার ও কমল বাইরে এসে বসতে-না-বসতেই রামহরি সকলের সামনে চায়ের পিয়ালা এবং প্লেটে করে গরম টোস্ট ও অলেট সাজিয়ে দিয়ে গেল।
বাঘাও যথাসময়ে অত্যন্ত সভ্য-ভব্যের মতো সকলের মাঝখানে এসে বসে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে রামহরির গতিবিধি লক্ষ করছিল। তার জন্যেও এল কতকগুলো কুকুর-বিস্কুট।
বিমল আগে বোট ও ইস্টিমার চালাবার হুকুম দিলে, তারপর এক স্লাইশ রুটি তুলে নিয়ে বললে, বিনয়বাবু, আর ঘণ্টাদুয়েক পরেই আমরা সেই দ্বীপের কাছে গিয়ে হাজির হতে পারব।
বিনয়বাবু বললেন, তারপর?
তারপর আমরা একেবারে তীরে গিয়ে নামব।
যদি কেউ বাধা দেয়?
ইস্টিমারে মিলিটারি পুলিশ আছে–এমনকী একটা মেশিনগানও আছে। যদি সত্যিই সেখানে কোনও বিপদজনক অতিকায় বিড়াল, কুকুর, বাঘ বা দানব থাকে, তাহলে তাদের মেজাজ ঠান্ডা করবার জন্যে আমরা কোনও আয়োজনেরই ত্রুটি করিনি।
কিন্তু এইসব অদ্ভুত জীবের সঙ্গে সেই দ্বীপবাসী বৃদ্ধের সম্পর্ক কি, সেটা তো আমি কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছি না! লোকালয়ের বাইরে এমন বিজন জায়গায় নির্বাসিতের মতো বসে দানব-জীবদের নিয়ে তিনি কী করেন? দানবের ভয় তার যখন নেই, তখন এটাও বেশ বোঝা যাচ্ছে, দানবরাও তার ওপরে কোনও অত্যাচার করে না!
কুমার বললে, আরও একটা মস্ত জানবার কথা হচ্ছে, এমন এক তুচ্ছ অজানা দ্বীপের বিড়াল আর কুকুর কেমন করে বাঘ আর হাতির মতো প্রকাণ্ড হয়ে উঠল?
বিনয়বাবু সন্দিগ্ধ কণ্ঠে বললেন, কিন্তু এসব কি সত্যি?
বিমল বললে, কুকুরটাকে আমি দেখিনি বটে, কিন্তু বাঘের মতো বড় একটা বিড়ালকে আমি নিজেই যে গুলি করে মেরেছি সে কথা তো আপনি শুনেছেন?
বিনয়বাবু বললেন, আশ্চর্য ব্যাপার! আর তার চেয়েও আশ্চর্য হচ্ছে এই যে, যেখানেই আশ্চর্য ব্যাপার, সেইখানেই তোমরা? আমাদের এই নিত্য-দেখা একঘেয়ে পৃথিবীটাকে তোমরা ক্রমেই অসাধারণ আর বিচিত্র করে তুলছ!
বোট ও ইস্টিমার তখন ছুটে চলেছে পুরোদমে–কেবল একদিকেই নদীর বনশ্যামল তটরেখা দেখা যাচ্ছে, অন্য তীর হারিয়ে গেছে প্রায় অসীমতার মধ্যেই।
হঠাৎ কুমার দাঁড়িয়ে উঠে বললে, দূরে ওই সেই দ্বীপ দেখা যাচ্ছে!
আর সকলেও সাগ্রহে দাঁড়িয়ে উঠল। দূরে একটা গাছপালাভরা ভূমি জেগে উঠেছে বটে! বিমল খানিকক্ষণ সেইদিকে তাকিয়ে থেকে বললে, হা, কুমারের চোখ ঠিক দেখেছে।
ধীরে-ধীরে দ্বীপটা স্পষ্টতর হয়ে উঠতে লাগল। কিন্তু বাহির থেকে সে দ্বীপের মধ্যে কোনও নতুনত্বই আবিষ্কার করা গেল না–প্রবল হাওয়ায় গাছপালা দুলছে এবং নদীর জলে ঝিলমিল করছে তাদের ছায়া! কালকের রাতের সেই অমানুষিক কণ্ঠস্বর আজ আর কারুকে ভয়াবহ অভ্যর্থনা করলে না এবং বনজঙ্গলের ওপরে তালগাছ-সমান উঁচু দেহ নিয়ে কোনও বিরাট দানবও আবির্ভূত হল না!
বিনয়বাবু একটা দূরবিনের সাহায্যে দ্বীপটা পরীক্ষা করছিলেন। হঠাৎ তিনি চমকে উঠে দূরবীক্ষণটা বিমলের হাতে দিয়ে উত্তেজিত স্বরে বললেন, দেখো বিমল, দেখো!
দুরবিনটা তাড়াতাড়ি চোখে লাগিয়ে বিমল দেখলে, দ্বীপের একটা উঁচু জমির ওপরে একটি লোক পাথরে তৈরি মূর্তির মতো স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে–যেন সে ইস্টিমারের দিকেই তাকিয়ে আছে নিষ্পলক নেত্রে! আজকেও তার ধবধবে সাদা লম্বা চুল, দাড়ি ও গায়ের জামাকাপড় লটপট করে হুহু বাতাসে উড়ছে!
