বিনয়বাবু বললেন, তুমি আভাসমাত্র দেখেছ? তোমার চোখের ভ্রম হতেও তো পারে?
আমাদের চোখের ভ্রম যদি হয়ে থাকে, তাহলেই মঙ্গলের কথা। কারণ, ওই দ্বীপে। অমন সৃষ্টিছাড়া দানব যদি আরও গোটাকয়েক থাকে, তাহলে এই যাত্রাই আমাদের শেষযাত্রা হতেও পারে!
রামহরি প্রায় কাঁদো কাঁদো মুখে বলে উঠল, খোকাবাবু, এই বুড়োবয়সে ভূতুড়ে রাক্ষসের খোরাক হওয়ার জন্যেই কি তোমরা আমাকে ধরে আনলে?
কুমার হেসে ফেলে বললে, ভয় কি রামহরি, গঙ্গাসাগরে মরলে রাক্ষসের পেটের ভেতর থেকে আবার বেরিয়ে তুমি সোজাসুজি স্বর্গে গিয়ে হাজির হতে পারবে! সকলে তখন মহা-পুণ্যবান বলে তোমাকে হিংসা করবে!
রামহরি তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠে বললে, থামো-থামো, আর কথার ফোড়ন দিতে হবে না, ঢের হয়েছে। রাক্ষসের পেটেই যদি হজম হই, তাহলে স্বর্গে যাবে কে?
কুমার বললে, এইবারে রামহরি, তুমি নিরেট বোকার মতো কথা কইলে! রাক্ষসের খুঁড়ি বড়জোর তোমার দেহকেই হজম করতে পারে, কিন্তু তোমার আত্মাকে হজম করে এমন সাধ্য কার আছে? মানুষের দেহ তো স্বর্গে যায় না, স্বর্গে যায় তার আত্মাই!
রামহরি বললে, অমন স্বর্গে যাওয়ার পায়ে আমি গড় করি,–অমন করে আমি স্বর্গেও যেতে চাই না!
কমল বই থেকে মুখ তুলে বললে, বিনয়বাবু, আপনি ভাবছেন বিমলবাবুদের চোখের ভ্রম হয়েছে। কিন্তু আপনি খবরের কাগজের রিপোর্ট ভুলে যাচ্ছেন কেন? তাতেও তো এখানকার একটা দ্বীপে তালগাছ-সমান উঁচু এক দানবের কথা আছে!
বিনয়বাবু বললেন, কি জানি বাপু, এখানকার ব্যাপারটা আমার মনে কেমন একটা অমঙ্গলের ভাব জাগিয়ে তুলছে! মনে হচ্ছে এদিকে না আসাই যেন উচিত ছিল!
কুমার জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বললে, এতক্ষণে চাঁদ উঠল! কিন্তু চাঁদের আজ জেল্লা নেই!
বিনয়বাবু একটা অস্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বললেন, নাই বা রইল জেল্লা! চাঁদ যে উঠেছে, এই অন্ধকরা অন্ধকারে সেইটেই হচ্ছে বড় কথা। এতক্ষণ আমার তো মনে হচ্ছিল, চাঁদের বুঝি মৃত্যু হয়েছে, আলো আর ফুটবে না!
কমল বললে, কিন্তু ও চাঁদ যেন অন্ধকারকেই ভালো করে দেখাবার চেষ্টা করছে। গাছের তলায় নড়ন্ত ছায়াগুলোকে দেখে সন্দেহ হয়, ওরা যেন বিরাটদেহ প্রেতমূর্তি, আমাদের ঘাড় ভাঙতে পারলে আর ছেড়ে কথা কইবে না!
রামহরি কাজ করতে করতে মুখ তুলে ভয়ে-ভয়ে বনজঙ্গলের দিকে তাকিয়ে বললে, সন্দেহ আবার কি, সত্যিকথাই! নিশ্চয় ওখানে ভূত-প্রেত আছে!
বিমল বললে, পৃথিবীর শৈশবে আদিম মানুষরা গিরিগুহার ভেতর থেকে বাইরের আলো আঁধারিতে চোখের ভ্রমে অমনি সব কত বিভীষিকাই দেখতে পেত। সেই সময় থেকেই ভূত প্রেতের মিথ্যা ভয়ের সৃষ্টি। সে ভয় আজও আমাদের রক্তের সঙ্গে মিশে রয়েছে, জ্ঞানে বিজ্ঞানে পণ্ডিত হয়েও মানুষ তাই তাকে আর ভুলতে পারে না।
হঠাৎ বাঘা একলাফে দাঁড়িয়ে উঠে কানদুটো খাড়া করে কি শুনতে লাগল!
বিমলও বাইরের দিকে তাকালে। বোট তীরের একদিক ঘেঁষে যাচ্ছিল–দেখা গেল কেবল খানিককালো আর খনিক-আলোমাখা গাছপালা। সেখানে কোনও জীবজন্তুর সাড়া পর্যন্ত নেই।
আচম্বিতে শোনা গেল –
ঘোঁ-ঘটঘট ঘোঁ ঘটঘট ঘোঁ-ঘটঘট ঘটঘট! ঘণ্টা বাজে যমালয়ে, কে যাবি আয় চটপট!
কুমারের মুখ বিবর্ণ হয়ে উঠল এবং বাঘাও বোটের ধারে গিয়ে জলের ধারে ঝুঁকে পড়ে চিৎকার করতে লাগল।
বিমল লাফিয়ে বাইরে গিয়ে দাঁড়াল, অস্পষ্ট চাঁদের আলোয় হু-হু করে জলস্রোত ছুটে চলেছে, তা ছাড়া আর কিছু দেখা যায় না!
রামহরি ঠক-ঠক করে কাঁপতে কাঁপতে বললে, কোথাও জনপ্রাণী নেই, তবে এমন হেঁড়ে গলায় ভয়ানক চেঁচিয়ে কে কথা কইলে খোকাবাবু?
সত্যসত্যই সে এমন উচ্চ কণ্ঠস্বর যে, পিছনের ইস্টিমারে পুলিশের লোকেরাও তা শুনতে পেয়েছিল, ইস্টিমারের সার্চলাইট তখনি নদীর বুকের ওপরে তীব্রোজ্জ্বল আলোক-সেতুর মতন গিয়ে পড়ল, তারপর সে অরণ্যের বক্ষভেদ করেও খুঁজে দেখলে, কিন্তু কোথাও জ্যান্ত কোনও কিছুর সন্ধান পাওয়া গেল না!
বিনয়বাবু হতভম্বের মতো বললেন, এ কী ব্যাপার, কুমার? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না!
কুমার বললে, এ কণ্ঠস্বর গেল-বারেও আমরা দ্বীপের কাছে এসে শুনেছি। কিন্তু কে যে-কথা কয়, কিছুতেই দেখতে পাইনি!
কমল বললে, মানুষের কথা শুনলুম বটে, কিন্তু এমন বিকট স্বরে কোনও মানুষ কি কথা কইতে পারে?
বিমল বললে, দ্বীপটা এখনও মাইল দশ-বারো দূরে আছে বোধহয়। কিন্তু গেল বারে কেউ তো দ্বীপ থেকে এত দুরে এসে এমন স্বরে কথা কয়নি!
কুমার বললে, তাহলে আমরা যে আবার আসছি, এরমধ্যেই কি দ্বীপে সে-খবর পৌঁছে গেছে?
বিমল জবাব দেওয়ার আগেই অনেকদূর থেকে আবার সেই উকট ভৈরব আওয়াজ জেগে উঠল–
ঘোঁ-ঘটঘট ঘোঁ-ঘটঘট ঘটঘট ঘটঘট!
বিমল বললে, এ ভালো লক্ষণ নয়! শব্দটা দ্বীপের দিকেই চলে যাচ্ছে!
রামহরি বলে উঠল, রাম রাম রাম রাম! অনেক ভূতের কথা শুনেছি, কিন্তু শব্দ ভূতের কথা তো কখনও শুনিনি!
বিমল বললে, কুমার, বাঘার গলায় শিকল দাও! ও পাগলের মতো হয়ে উঠেছে– জলে ঝাঁপিয়ে পড়তে চায়!
বিনয়বাবু বললেন, আমরা দেখতে পাচ্ছি না বটে, কিন্তু ওর পশু-চোখ বোধ হয় জলের ভেতরেই কোনও বিপদকে আবিষ্কার করেছে!
বিমল টর্চ নিয়ে আবার নদীর ভেতরটা দেখতে লাগলঝাপ্সা চাঁদের আলো আর আবছায়া নিয়ে লোফালুফি করতে করতে ও পাক খেতে-খেতে প্রবল জলের স্রোত ছুটছে এবং চিৎকার করে যেন নিকটস্থ সমুদ্রকে ডাকের পর ডাক দিচ্ছে! জলচর কুমির ও হাঙর ছাড়া সেখানে কোনও মানুষের পক্ষে এতক্ষণ ডুব দিয়ে লুকিয়ে থাকা অসম্ভব!
