বিনয়বাবু বললেন, আপাতত ও-সব কথা থাক। কমল, বিমল আর কুমার কি সুন্দরবন থেকে কোনও খবর পাঠিয়েছে? তারা তো এই দানবের খবর পাওয়ার আগেই গঙ্গাসাগরের দিকে গিয়েছে, এর জন্যে প্রস্তুত হয়েও যায়নি, যদি তারা কোনওরকম বিপদে পড়ে?
এমন সময়ে একতলা থেকে শোনা গেল, একটা কুকুর পরিচিত গম্ভীর স্বরে ডেকে উঠল–ঘেউ, ঘেউ, ঘেউ!
কমল উৎসাহ ভরে লাফিয়ে উঠে বললে, ওই বাঘা আমাদের ডাকছে! বাঘা যখন আসছে, তখন ওইসঙ্গে বিমলবাবুদেরও দেখা নিশ্চয় পাওয়া যাবে।
বলতে-বলতে ঘরের দরজাটা দুম করে খুলে গেল এবং বিমল ও কুমারের আগে আগে বাঘা ভেতরে ঢুকে বিনয়বাবুর কাছে গিয়ে দু-পায়ে দাঁড়িয়ে উঠে সামনের পা দিয়ে তার কোমর জড়িয়ে ধরে নিজের প্রাণের আনন্দ জ্ঞাপন করলে। তারপর কমলকেও সেইভাবে আদর করে বিপুল বেগে পটপট রবে ল্যাজ নাড়তে লাগল!
বিনয়বাবু বললেন, এই যে! তোমরা যে এরি মধ্যে ফিরে এলে?
বিমল বললে, আমরা ফিরে এলুম না বিনয়বাবু, পালিয়ে এলুম!
দানব-মানুষের ভয়ে?
এই যে, আপনিও খবর পেয়েছেন দেখছি! হ্যাঁ, দানবের ভয়েই বটে! কিন্তু পালিয়ে এসেছি আটঘাট বেঁধে পুনরাক্রমণ করব বলে।
আবার তোমরা যাচ্ছ?
নিশ্চয়! কিন্তু এবারে কেবল আমরা দুজনই নই, আপনি যাবেন কমল যাবে রামহরি যাবে–এমনকী বাঘাও পড়ে থাকবে না! নিন! উত্তিষ্ঠত, জাগ্রত। আমরা প্রস্তুত, আপনারাও দ্বিগুণ উৎসাহে মোটমাট বেঁধে তৈরি হয়ে নিন! আমরা কালকে সকালেই যাত্রা করব!
বিনয়বাবু দুই চক্ষু বিস্ফারিত করে বললেন, তার মানে?
তার মানে, কাল সকালেই আমরা আপনাদের নিয়ে সম্ভবের মুল্লুক থেকে অসম্ভবের দেশে যাত্রা করব! তালগাছের মতো উঁচু মানুষ! হাতির মতো বড় ডালকুত্তা! বাঘের মতো মস্ত বিড়াল! পুলিশের লঞ্চ আর বন্দুকধারী সেপাই আমাদের সাহায্য করবার জন্যে এতক্ষণে প্রস্তুত হয়েছে, আমাকে ডানপিটে বলে গালাগাল দিতে দিতে আর রাগে গরগর করতে করতে বুড়ো রামহরি পর্যন্ত সমস্ত তল্পিতল্পা বেঁধে নিয়েছে, আর আপনারা এখনও অলস হয়ে এখানে বসে আছেন? ছিঃ বিনয়বাবু! ছিঃ কমল!
বিনয়বাবু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বললেন, কি আশ্চর্য! আমরা কেমন করে জানব যে—
বাধা দিয়ে বিমল বললে, ব্যস, ব্যস, আর কথা নয়। এখন জেনেছেন তো? কাল সকালে আমরা সুন্দরবনে যাত্রা করব, আপনার জিনিসপত্তর গুছিয়ে নিন! আমাদের হাতে এখনও অনেক কাজ রয়েছে–চলো কুমার, আয় বাঘা!
বাঘা বিনয়বাবুর দিকে ফিরে আবার বললে–ঘেউ, ঘেউ, ঘেউ কুকুর-ভাষায় তার অর্থ বোধহয়–কর্তা, এখন আসি!
বিমল ও কুমার দ্রুতপদে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, বিনয়বাবু হতাশভাবে ধপাস করে একখানা চেয়ারে বসে পড়ে বললেন, না, আমার অপঘাত-মৃত্যু না ঘটিয়ে বিমল বোধহয় ছাড়বে না! ওরা এল আর গেল যেন কালবোশেখির মতো,–এখন সামলাও ধাক্কা!
খিলখিল করে হেসে উঠে কমল বললে, আমার কিন্তু ভারী মজা লাগছে।
বিনয়বাবু খাপ্পা হয়ে বললেন, তা তো লাগবেই, সব গাধারই যে এক বুলি! কিন্তু আমার বয়স যে পঞ্চাশ পার হয়েছে, আমার কি এ-সব পোষায়, না শোভা পায়?
দুষ্টু কমল বললে, শাস্ত্রে বলে পঞ্চাশোর্ধে বনে যেতে। আপনি তো সুন্দরবনেই যাচ্ছেন বিনয়বাবু! যে-সে বন নয়, পরমসুন্দর বন!
বিনয়বাবু আরও রেগে বললেন, থামো, থামো! আর জ্যাঠামি করতে হবে না!
.
অষ্টম পরিচ্ছেদ । অমানুষিক কণ্ঠস্বর
আবার সেই সুন্দরবন! নির্জন বনভূমির মধ্যে আবার সেই নদীর জলতরঙ্গ বাজনা! সে যেন নিস্তব্ধতার বীণায় কার মূচ্ছা ভাঙাবার অশ্রান্ত সুর!
কৃষ্ণপক্ষের চাঁদ আজ দেরি করে মুখ দেখাবে। জ্যোৎস্নার যে কুহকস্বপ্ন নিয়ে বিমল ও কুমার গেলবারে ফিরে গিয়েছিল, এবার তারা সেই মাধুর্যের অভাব অনুভব করতে লাগল। অত্যন্ত। আকাশে একটিমাত্র উঁদকে দেখা না গেলে বনবাসী রাত্রির চেহারা যে কি-রকম বদলে যায়, যারা তা দেখেনি তারা কিছুতেই বুঝতে পারবে না। আকাশে কোটি-কোটি তারকার নির্নিমেষ নেত্রে যেটুকু আলোর বোবা ভাষা ফুটে উঠেছে, তার মধ্যে কিছুমাত্র সান্ত্বনার আভাস নেই। বাতাসে-বাতাসে কি যেন একটা বুকচাপা স্বপ্ন ভেসে বেড়াচ্ছে! কে যেন ডাক ছেড়ে কেঁদে উঠতে গিয়ে আতঙ্কে কাঁদতে পারছে না! অন্ধকার, অন্ধকার, অন্ধকার! পায়ের তলা থেকে নদী সাড়া দিচ্ছে, দুপাশ থেকে বিরাট অরণ্যের শিউরে-ওঠা মর্মর আতাঁরব শোনা যাচ্ছে এবং তার জঠর থেকে ভেসে-ভেসে আসছে লক্ষ লক্ষ নিশাচর জীবের জীবন-যুদ্ধের ধ্বনি ও প্রতিধ্বনি! কারুকেই দেখবার যো নেই, কেবল শব্দ–কেবল শব্দ! অন্ধকারের বিভীষিকা সমস্ত ধ্বনি-প্রতিধ্বনিকে করে তুলেছে ভয়াবহ! যে-দেশে তারা সবাই আজ যাত্রা করেছে, পথের এই অন্ধকারময় বিভীষিকা তারই স্বরূপের আভাস দেওয়ার চেষ্টা করছে!
গভীর আঁধার-সাগরে যেন ভেসে চলেছে দুটি ছোট-বড় আলোক দ্বীপ–বিমলদের মোটরবোট ও পুলিশের ইস্টিমার!
বোটের কামরার ভেতরে বসে রামহরি ইকমিক কুকারে রান্না চড়িয়ে দিচ্ছে এবং এখনও আহারের যথেষ্ট বিলম্ব দেখে বাঘা কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘুমোবার চেষ্টা করছে। অত্যন্ত উজ্জ্বল পেট্রোলের লণ্ঠনের আলোকে কমল একখানা গল্পের বই পড়ছে এবং বিনয়বাবু, বিমল ও কুমার কথাবার্তা কইছে।
বিমল বলছিল, না বিনয়বাবু, এই দ্বীপে হিমালয়ের সেই ভয়ঙ্কর দানবেরা এসে যে আস্তানা গেড়েছে, এটা আমার বিশ্বাস হয় না। হিমালয়ের ভয়ঙ্করদের কাহিনি যে আমাদের কল্পনার দুঃস্বপ্ন নয়, বাংলাদেশে এখন এ সত্য প্রমাণিত হয়েছে বলে আমি খুবই খুশি হয়েছি, কিন্তু সেদিন দ্বীপের ওপরে যে দানবমুর্তির আভাসমাত্র দেখেছি, হিমালয়ের ভয়ঙ্কররাও হাত বাড়িয়ে তার মাথার নাগাল পাবে বলে মনে হয় না! সে এক নতুন আর অসম্ভব দানব!
