বিনয়বাবু তার মাথার কাঁচাপাকা চুল কগাছির ভেতরে আঙুল চালাতে-চালাতে একমনে সমস্ত কথা শ্রবণ করলেন। তারপর ধীরে-ধীরে বললেন, পৃথিবীতে কি আবার পুরাকাল ফিরে এল? এখানে দানবের অত্যাচার যেন ক্রমেই বেড়ে উঠছে! আমরা মৃণুকে উদ্ধার করতে গিয়ে হিমালয়ের যে-সব ভয়ঙ্করকে দেখে এসেছি, এতদিন অনেকে তাদের কথা বিশ্বাস করত না। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের এভারেস্ট অভিযানের লোকেরা হিমালয়ের টঙে যে বিরাট পদচিহ্ন দেখেছিল, সেটা তখন একটা মজার গল্প বলেই মনে করা হয়েছিল। কিন্তু সে গল্প যে সত্য, আমরা তা প্রমাণিত করবার চেষ্টা করি। আমাদের চেষ্টা বেশি বুদ্ধিমানদের কাছে সফল হয়নি। তারপর গেল বছরে যখন খবরের কাগজে বেরুল যে, দার্জিলিংয়ের আরও নীচে আর বাংলাদেশের নানাস্থানে দানবের মতো বৃহৎ মানুষ দেখা গেছে, তখন আমাদের কাহিনির ওপরে লোকের শ্রদ্ধা হল। বিমল বলে, হিমালয়ের ভয়ঙ্কররা তাদের দেবীঅর্থাৎ আমাদের মৃণুকে সারাদেশে তন্নতন্ন করে খুঁজে বেড়াচ্ছে এবং একদিন তারা মৃণুকে আবার খুঁজে বার করবেই করবে! গেল ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের ৮ই ডিসেম্বর তারিখের স্টেটসম্যান কাগজে দেখেছি, মি. সিপটন নামে এক ভদ্রলোক হিমালয়ের ১৬,০০০ হাজার ফুট ওপরে বরফের গায়ে আবার দানবের পদচিহ্ন আবিষ্কার করেছেন। বিমলের মত যদি ঠিক হয়, তবে কে বলতে পারে, মৃণুকে খুঁজতে খুঁজতে দু-একটা দানব গঙ্গাসাগরের কাছে গিয়ে হাজির হয়নি?
কমল বললে, বিমলবাবু আর কুমারবাবু যে গঙ্গাসাগরের কাছাকাছি কোনও একটা দ্বীপে দানব-বিড়ালের খোঁজে গিয়েছেন, সে কথাটাও মনে রাখবেন। দানবদের দেশে গিয়ে আমরা কিন্তু বাঘের মতো বড় কোনও বিড়াল-টিড়াল দেখতে পাইনি। সেখানকার কুকুর দেখেছি, সাধারণ কুকুরের চেয়ে সে বড় নয়। গঙ্গাসাগরের কাছে কি তাহলে দানব-জীবদের অজানা কোনও আস্তানা আছে?
বিনয়বাবু বললেন, কেমন করে তা বলব? তবে এইটুকু জানি যে, বিলাতেও দানব মানুষের কাহিনি কেবল গালিভারের গল্পে বা ছেলেভুলানো রূপকথায় পাওয়া যায় না। বিংশ শতাব্দীর সভ্য মানুষরাও তাদের চর্মচক্ষে দেখতে পেয়েছে। ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের মধ্যে সবচেয়ে উঁচু পাহাড় হচ্ছে বেল মাকবুই। সে পাহাড়টি আছে হাইল্যান্ডারদের দেশে। যখন বরফ পড়ে তখন স্থানীয় লোকেরা কিছুতেই সেই পাহাড়ের ওপরে উঠতে রাজি হয় না। কারণ তারা বলে, বরফ পড়লেই সেখানে Lang mon-রা বেড়াতে আসে, তারা সাধারণ মানুষকে সুনজরে দেখে না! Lang mon হচ্ছে Long man-এরই রূপান্তর–অর্থাৎ লম্বা মানুষ। সকলেই এই লম্বা মানুষদের অলীক কল্পনা বলেই মনে করত। কিন্তু কিছুদিন আগে Alpine Club-এর ভূতপূর্ব সভাপতি আর এভারেস্ট অভিযানেরই এক সাহেব স্বচক্ষে একজন লম্বা মানুষকে দেখতে পেয়েছেন। মাথায় সে উঁচু ছিল প্রায় ১২ ফুট! এই দুজন নির্ভরযোগ্য, বিখ্যাত আর শিক্ষিত দর্শকের কথা আজ আর কেউ উড়িয়ে দিতে পারে না।
কমল বললে, কিন্তু গঙ্গাসাগরের এই দানব-মানুষ নাকি প্রায় তালগাছের সমান উঁচু। হিমালয়ের ভয়ঙ্কররাও এদের চেয়ে ঢের ছোট ছিল।
বিনয়বাবু বললেন, উঁচু দানবের কথা যখন তুললে তখন আর-একটা সত্য কাহিনি বলি শোনো। এরও ঘটনাস্থল হচ্ছে বিলাতে, ডিভত্সায়ারে। ক্রিমিয়া যুদ্ধের সময়ে, ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দের ৭ই ফেব্রুয়ারির সকালবেলায় ডিভসায়ারের অনেকগুলো শহরের বাসিন্দারা সবিস্ময়ে দেখলে যে, বরফের ওপরে অদ্ভুত সব খুরের চিহ্ন সারি-সারি এগিয়ে গেছে! এ-ঘোড়া বা গাধা বা অন্য কোনও চতুষ্পদ পশুর খুরের দাগ নয়–এ দাগ হচ্ছে কোনও দু-পেয়ে জীবের। পৃথিবীতে এমন কোনও দু-পেয়ে জীব নেই যার পায়ে খুর আছে। প্রায় একশো মাইল পর্যন্ত চলে গেছে ওই আশ্চর্য পদচিহ্ন! যে সারারাত ধরে অশ্রান্ত ভাবে পথ চলেছে এবং একরাতে যে একশো মাইল পথ চলে, সে কীরকম জীব তা বুঝে দেখো! যেতে-যেতে একটা এক মাইল চওড়া নদীও (River Exe) সে অনায়াসে পার হয়ে গেছে কারণ, তার পদচিহ্ন নদীর এপারে জলের ধারে শেষ হয়ে গিয়ে আবার ওপার থেকে আরম্ভ হয়েছে! পথে অনেক ছোট-বড় বাড়ি পড়েছিল, কিন্তু সেই রহস্যময় জীবটা কোনও বাড়ির ভেতরেই ঢোকেনি। অনেক বাড়ির ছাদের ওপরেও পদচিহ্ন পাওয়া যায়, আবার পদচিহ্ন অনেক বাড়ির এপাশে শেষ হয়ে গিয়ে ফের ওপাশ থেকে শুরু হয়েছে, তাদের ছাদের ওপরে কোনও দাগই নেই–যেন সে অনায়াসেই গোটা বাড়িটাই ডিঙিয়ে চলে গেছে! এখন ভাববার চেষ্টা করো, এ কোন জীব? এরকম পদচিহ্ন ডিভায়ারে তার আগে বা পরে আর কখনও দেখা যায়নি। তার খুরওয়ালা দুখানা পা, সে একমাইল চওড়া নদী পার হয়, অম্লানবদনে একরাতে একশো মাইল হাঁটে। বাড়ির ছাদে উঠে নেমে যায় বা বিনাকষ্টেই বাড়িকে-বাড়ি লঙঘন করে অগ্রসর হয়। স্থানীয় লোকেরা ধরে নিলে, গত রাত্রের তুষার-বৃষ্টির সময়ে শয়তান ডিভত্সয়ারে বেড়াতে এসেছিল কারণ প্রচলিত মতে, শয়তানের দুই পায়ে খুর আছে। এই ঘটনার পরে অনেক দিন পর্যন্ত ডিভত্সায়ারের বাসিন্দারা সন্ধ্যার আগেই যে যার বাড়ির ভেতরে পালিয়ে এসে ভয়ে দরজা-জানলা বন্ধ করে বসে থাকত।
কমল বললে, তবু লোকে বলে পৃথিবীতে এখন আর অসম্ভব ঘটনা ঘটে না!
