সে বললে, গ্রহের ফেরে। আমি হচ্ছি কাঠের ব্যাপারী। নৌকো করে লোকজনের সঙ্গে এই দিক দিয়ে যাচ্ছিলুম। পথে একটা দ্বীপ পেয়ে ভাবলুম, ওখানে নেমে দেখব ভালো কাঠের গাছ পাওয়া যায় কি না! সেই কুবুদ্ধিই হল আমার কাল। দ্বীপে গিয়ে নামবামাত্র চারিদিকে যেন দৈত্যদানবরা চিৎকার করতে লাগল আর ভূমিকম্প হতে লাগল। আমার দলের লোকদের কি হল জানি না, কিন্তু আমি দেখলুম, হাতির মতো কি একটা জানোয়ার তিরের মতো আমার দিকে তেড়ে আসছে!
বিমল বললে, সে জানোয়ারটাকে কি মস্ত একটা বিড়ালের মতো দেখতে?
বিড়াল? না, তাকে দেখতে হাতির মতো বড় যেন একটা ডালকুত্তা!
তারপর?
আমি তখন জলের কাছে ছিলুম। প্রাণের ভয়ে তখনি জলে ঝাঁপ দিলুম-সঙ্গে-সঙ্গে আমার খুব কাছেই প্রকাণ্ড একটা কুমির ভেসে উঠল! ডাঙায় প্রকাণ্ড অদ্ভুত জানোয়ার আর জলে কুমির দেখে আমার যে কি অবস্থা হল, সেটা বুঝতেই পারছেন! যদিও প্রাণের আশা আর রইল না, তবু দিগিবিদক জ্ঞান হারিয়ে সাঁতার কাটতে লাগলুম, কারণ আমি শুনেছিলুম, মানুষ যখন সাঁতার কাটে কুমির তখন তাকে ধরতে পারে না। এ কথা সত্যি কিনা জানি না, কিন্তু সেই কুমিরটা নাছোড়বান্দার মতো আমার সঙ্গে-সঙ্গে অনেকদূর এল বটে, তবু আমাকে ধরবার কোনও চেষ্টাই করলে না! তারপর সে ডুব মারলে। আমার ভয় আরও বেড়ে উঠল, ভাবলুম জলের ভেতর থেকে এইবারে সে আমাকে কামড়ে ধরবে! ক্রমাগত পা ছুঁড়তে লাগলুম! সেইভাবে ভাসতে-ভাসতে যখন এই চরে এসে উঠলুম, তখন আমি আধমরা। এই চরেই আজ তিনদিন তিনরাত কেটে গেছে। আজ আপনাদের নৌকো এ-পথে না এলে আমি অনাহারেই মারা পড়তুম।
.
সপ্তম পরিচ্ছেদ । কুম্ভকর্ণের বংশধর
বিনয়বাবু তার পরীক্ষাগারে বসে একমনে আকাশের গ্রহ তারা দেখবার বড় দুরবিনটা সাফ করছিলেন, এমনসময়ে একখানা খবরের কাগজ হাতে করে কমল সেই ঘরে প্রবেশ করল।
কমলের পায়ের শব্দ বিনয়বাবু চিনতেন, কাজেই দূরবিন থেকে মুখ না তুলেই বললেন, এসো কমল!
কমল উত্তেজিত কণ্ঠে বললে, বিনয়বাবু, আজকের খবরের কাগজ পড়েছেন?
না। তোমার গলা শুনে মনে হচ্ছে, নতুন কোনও খবর আছে!
কেবল নতুন নয়, আশ্চর্য খবর!
বিনয়বাবু দুরবিন থেকে চোখ তুলে বললেন, আমরা মঙ্গলগ্রহে গিয়েছি, ময়নামতীর মায়াকাননে গিয়েছি, হিমালয়ের ভয়ঙ্করের দেশে গিয়েছি। আমাদের কাছে কি কোনও খবরই আর আশ্চর্য বলে মনে হবে?
কমল বললে, আচ্ছা, আগে আপনি খবরটা শুনুন। এই বলে সে কাগজখানা খুলে পড়তে লাগলঃ
‘গঙ্গাসাগরে কুম্ভকর্ণ’
গঙ্গাসাগরের নিকটে এক অদ্ভুত রহস্যের সংবাদ পাওয়া গিয়াছে।
সাগরদ্বীপের নিকটস্থ নদ-নদীতে যাহারা নৌকা লইয়া আনাগোনা করে, সম্প্রতি তাহাদের ভেতরে অত্যন্ত বিভীষিকার সঞ্চার হইয়াছে।
কয়েকখানি নৌকার এবং তাহাদের মাঝি-মাল্লার ও লোকজনের কোনও খবর পাওয়া যাইতেছে না। তাহারা যেখান হইতে যাত্রা করিয়াছিল সেখানেও ফিরিয়া আসে নাই, অথবা গন্তব্যস্থলেও গিয়া উপস্থিত হয় নাই। যদি মনে করা যায় কোনওরকম দুর্ঘটনায় হঠাৎ নৌকাডুবি হইয়াছে, তবে এইকথা জিজ্ঞাসা হওয়া স্বাভাবিক যে, দুর্ঘটনা কি এমন নিয়মিত ভাবে ঘটিতে পারে? ঝড়-বাদল বা বন্যা নাই, অথচ পরে-পরে কয়েকখানা নৌকা আরোহীদের সহিত একেবারে অদৃশ্য হইয়া গেল, একজন লোকেরও প্রাণরক্ষা হইল না? এটা কি যারপরনাই অস্বাভাবিক। নহে?
নদীর কেবল এক নির্দিষ্ট অংশের মধ্যেই নৌকাগুলি অদৃশ্য হইয়াছে। সাগরদ্বীপের পরে ফ্রেজারগঞ্জ। তাহার পর জামিরা নদী। তাহার পর বুলছড়ি দ্বীপ। তাহার পর মাতলা নদী। জামিরা নদীর জল যেখানে সুন্দরবনের মধ্যে ঢুকিয়া মাতলা নদীর সঙ্গে মিশিয়াছে, সেইখানেই কোনও এক জায়গায় গিয়া প্রত্যেক নৌকাই হঠাৎ অদৃশ্য হইয়াছে।
পুলিশের লোকেরা তদন্তে গিয়া আর এক বিস্ময়কর ব্যাপার আবিষ্কার করিয়াছে।
পুলিশের নৌকা একটা অজানা দ্বীপের নিকটে নোঙর ফেলিয়াছিল। শুক্লপক্ষের শুভ্র রজনী। নৌকার ওপরে বসিয়া একজন চৌকিদার পাহারা দিতেছিল।
দ্বীপের ওপরে হঠাৎ সে এক অদ্ভুত দৃশ্য দর্শন করিল! প্রায় তালগাছ সমান উচ্চ ভয়াবহ এক মূর্তি স্থিরভাবে দাঁড়াইয়া রহিয়াছে! দূর হইতে যদিও তাহার মুখ-চক্ষু দেখা যাইতেছিল। না, তবে সেটা যে কোনও দানব মনুষ্য-মূর্তি, সে-বিষয়ে কোনওই সন্দেহ নাই।
চৌকিদারের ভীত চিৎকারে নৌকার অন্যান্য লোক বাহিরে আসে এবং তাহারাও সেই বিরাট মূর্তিকে দেখিতে পায়! সকলে তখন নৌকা লইয়া সভয়ে পলায়ন করে।
যেসব নৌকা অদৃশ্য হইয়াছে, তাহার সহিত উক্ত অমানুষিক মূর্তির কোনও সম্পর্ক আছে কিনা, পুলিশ এখন এই কথা লইয়াই মাথা ঘামাইতেছে।
প্রকাশ, শীঘ্রই বৃহৎ এক পুলিশ বাহিনী ওই অজানা দ্বীপের দিকে যাত্রা করিবে।
স্থানীয় অধিবাসীদের বিশ্বাস এই লঙ্কাদ্বীপের কোনও অজ্ঞাত অংশ হইতে কুম্ভকর্ণের বংশধরগণ সন্তরণ দিয়া সমুদ্র পার হইয়া গঙ্গাসাগরের নিকটস্থ ওই দ্বীপের মধ্যে আসিয়া আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছে। অদৃশ্য নৌকাগুলির আরোহীরা গিয়াছে তাহাদেরই বিপুল উদরের মধ্যে।
অবশ্য এরকম কুসংস্কারে আমরা বিশ্বাস করি না। কিন্তু ব্যাপারটা যে ভালো করিয়া তদন্ত করা উচিত, সে বিষয়ে দ্বিমত থাকিতে পারে না। নহিলে সুন্দরবনের ও-অঞ্চলে নৌকা চলাচল একেবারেই বন্ধ হইয়া যাইবে!
