পানসির লোকেরা চেঁচিয়ে উঠল, কুমির, কুমির!
কুমিরটা আবার ডুব মেরে অদৃশ্য হয়ে গেল।
গাছের একটা বড় ডাল হঠাৎ দোল খেলে–সেখানেও দুটো চোখ জুলজুল করছে! সেটা বানর, না মানুষ, না অন্য কোনও জীব তা বোঝা গেল না বটে, কিন্তু সে যে অত্যন্ত আগ্রহভরে নৌকোয় লোকদের গতিবিধি লক্ষ করছে, এটুকু ভালো করেই বুঝতে পারা গেল।
দ্বীপের বনজঙ্গলের ভেতর থেকে এতক্ষণ যে ভীষণ হট্টগোল উঠে চতুর্দিক শব্দময় করে তুলেছিল, আচম্বিতে তা থেমে গেল। অরণ্যের ছটফটানিও বন্ধ হয়ে গেল। বিমল ও কুমারের মনে হল, যেন বিরাট এক নিস্তব্ধ বিভীষিকা দম বন্ধ করে ওঁত পেতে তাদের ওপরে হঠাৎ লাফিয়ে পড়বার জন্যে প্রস্তুত হয়ে অপেক্ষা করছে।
মোটরবোটের ইঞ্জিন গর্জন করে উঠল এবং সঙ্গে সঙ্গেই শোনা গেল কে একজন হা-হা-হা-হা করে অট্টহাস্য করছে।
কুমার তাড়াতাড়ি টর্চের আলোটা সেইদিকে নিক্ষেপ করলে।
একটা প্রকাণ্ড গাছের তলায় এক দীর্ঘদেহ মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। সে মূর্তির কাছ পর্যন্ত টর্চের আলোকরেখা ভালো করে পৌঁছল না বলে তাকে স্পষ্ট করে দেখা গেল না; কিন্তু এটা বোঝা গেল, তার ধবধবে সাদা দীর্ঘ চুল, দাড়ি ও গায়ের জামাকাপড় লটপট করে হু-হু বাতাসে উড়ছে।
কাসিম বললে, ওই সেই বুড়ো ভদ্রলোক!
বিমল তার উদ্দেশে চিৎকার করে বললে, নমস্কার মশাই নমস্কার! এ-যাত্ৰা আর আপনার সঙ্গে আলাপ করা হল না।
সে মূর্তি যেন পাথরের মূর্তি। একটু নড়লও না, আর কোনও সাড়াও দিলে না।
মোটরবোট ক্রমেই দ্বীপ থেকে দূরে গিয়ে পড়ছে, দ্বীপ ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে আসছে। বিমল ও কুমার একদৃষ্টিতে সেই রহস্য-রাজ্যের দিকে তাকিয়ে গুম হয়ে বসে রইল।
তারপর দ্বীপটা যখন একেবারে চোখের আড়ালে চলে গেল, কুমার তখন একটা নিশ্বাস ফেলে বললে, আমরা খালি সুন্দরবনের কাদা ঘেঁটেই ফিরে চললুম।
বিমল বললে, এত সহজে হাল ছাড়বার ছেলে আমি নই। আমরা আবার আসব, আর রীতিমতো প্রস্তুত হয়েই আসব। ও দ্বীপের কিছুই আমি জানতুম না বলে এবারে ব্যর্থ হতে হল, কিন্তু এর পরের বারের ইতিহাস হবে অন্যরকম।
কুমার বললে, কলকাতা থেকে আমরা আশি মাইলের বেশি দূরে এসেছি বলে মনে হচ্ছে না; মনে হয় আমরা যেন অন্য কোনও পৃথিবীতে এসে হাজির হয়েছি। যা দেখলুম, আর যা শুনলুম, তা স্বপ্ন না চোখ আর কানের ভ্রম?
বিমল বললে, আমাদের সামনে এখন অনেকগুলো প্রশ্ন রয়েছে। প্রথমত ওই বুড়ো কে? কেন সে এমন অদ্ভুত জায়গায় বাস করে? দ্বিতীয়ত, জল আর গাছের ওপর থেকে কারা ছড়া কেটে আমাদের সাবধান করে দিচ্ছিল? কেনই বা তারা এখানে থাকে আর কেনই বা দেখা দেয় না? তৃতীয়ত, দ্বীপের বনজঙ্গলের ভেতরে কারা অমন হট্টগোল আর হুড়োহুড়ি করছিল? চতুর্থত, তালগাছগুলো ঠেলে যে অসম্ভব বিরাট ছায়ামূর্তিটা দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেল, সেটা কী? পঞ্চমত, সেই বাঘের মতন বড় বিড়ালটা কি এই দ্বীপেই বাস করত? সে-রকম বিড়াল কি এখানে আরও আছে?
কুমার বললে, দ্বীপের ব্যাপার যা দেখলুম তাতে মনে হচ্ছে, বেশ একটি বড় দলবল না নিয়ে এলে আমারা ওখানে নামতেই পারব না।
বিমল বললে, হ্যাঁ। কেবল দলবল নয়, দলে বাছা-বাছা লোক নিতে হবে। কাসিমদের মতো ভিতু লোক নিয়ে কোনও কাজ হবে না। এবারে যখন আসব, তখন আমাদের দলে বিনয়বাবু, কমল আর রামহরি তো থাকবেই, তার ওপরে জনকয়েক বন্দুকধারী পুলিশের লোক যাতে পাওয়া যায়, সে চেষ্টাও করতে হবে; নইলে এবারে এসেও হয়তো দ্বীপে গিয়ে নামতে পারব না। দ্বীপে যারা আছে তারা বাধা দেবেই।
কুমার বললে, আর আমাদের বাঘা? সে কার কাছে থাকবে?
বিমল বললে, বাঘার মতন চালাক কুকুর অনেক মানুষের চেয়েও ভালো! এখানে তাকেও হয়তো দরকার হবে। সেও আমাদের দলে থাকবে।
পানসি থেকে কাসিম শুধোলে, হুজুর, আপনারা কোনদিকে যাবেন?
বিমল বললে, আমরা পোর্ট ক্যানিংয়ে গিয়ে নামব।
তাহলে হুজুর আমাদের রাইপুরের কাছে ছেড়ে দেবেন।
আচ্ছা। চলো কুমার, শেষ রাতে আমরা একটু ঘুমিয়েনি।
বিমলের কথা শেষ হবা মাত্রই হঠাৎ চারিদিকের নিস্তব্ধতাকে তলিয়ে দিয়ে একটা আর্তনাদ জেগে উঠল–রক্ষা করো, রক্ষা করো!
বিমল ও কুমার বিস্মিতভাবে চারিদিকে তাকাতে লাগল। এই জনমানবহীন জলের দেশে সাহায্য চায় কে!
তখন একটা ছোট্ট চরের পাশ দিয়ে বোট যাচ্ছিল। তারা চাঁদের নির্বাণোন্মুখ ম্লান জ্যোৎস্নায় দেখলে চরের ওপরে সাদা মতো চলন্ত কি একটা দেখা যাচ্ছে।
আবার আর্তনাদ শোনা গেল–রক্ষা করো! আমাকে এখানে ফেলে যেও না!
বিমল বললে, ড্রাইভার, বোট চরে ভেড়াও!
কাসিম ভীত স্বরে বললে, হুজুর, এও ভূতের কারসাজি! এখানে মানুষ থাকে না।
বিমল তার কথায় কর্ণপাত করলে না।
বোট চরে গিয়ে ঠেকল। টর্চ জ্বেলে দেখা গেল, একটা লোক পাগলের মতো নৌকোর দিকে ছুটে আসছে–তার জামাকাপড় ঘেঁড়া, চুল উশকোখুশকো দৃষ্টি উদ্ভ্রান্ত।
লোকটা কাতর স্বরে বললে, আজ তিনদিন অনাহারে এখানে পড়ে আছি। আমাকে বাঁচান।
বিমল তাকে নৌকোর ওপরে উঠতে বললে।
নৌকোয় উঠেই সে বললে, আগে আমাকে কিছু খেতে দিন।
কুমার তখনি একখানা পাঁউরুটি, কিছু মাখন ও খানিকটা জেলি এনে দিলে। লোকটা গোগ্রাসে তা খেয়ে ফেললে।
সে একটু ঠান্ডা হলে পর বিমল জিজ্ঞাসা করলে, তুমি কেমন করে এখানে এলে?
