কুমার আর একবার চারদিকে ভালো করে চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললে, কিন্তু কোনও গাছে বাঁদরও নেই! তবে কি আমরা কোনও অশরীরীর সাড়া পেলুম?
বিমল হতভম্বের মতো বললে, এতদিন পরে শেষটা কি ভূত-প্রেতে বিশ্বাস করতে হবে?
খানিক তফাত থেকে আবার আর একরকম আওয়াজ জেগে উঠল– ঘটঘট ঘ্যাট ঘ্যাট ঘটঘট ঘ্যাট-ঘ্যাট।
কুমার চমকে বলে উঠল, ও আবার কী?
বিমল বললে, ওই শোনো!
ঘটঘট ঘ্যাট-ঘ্যাট ঘটঘট ঘ্যাট-ঘ্যাট–
ঘুটঘুটে আন্ধি,
একলাটি কান্দি,
রেখে গেছে বান্ধি।
সমুদ্রে।
মোটরের পান্ডা।
জল খুব ঠান্ডা,
মোরগের আন্ডা
দে ক্ষুদ্রে।
দাও যদি ঝম্প,
মোর মুখে লম্ফ–
নিবে যাবে লম্প
চক্ষের।
কেন শ্রম-যত্ন?
মোরা দুঃস্বপ্ন,
হেথা নেই রত্ন
যক্ষের!
বিমল তাড়াতাড়ি জলের ওপরে টর্চের আলো নিক্ষেপ করলে কিন্তু বৃথা, কোথাও জনপ্রাণী নেই, কেবল একজায়গায় জল অত্যন্ত তোলপাড় করছে–যেন কেউ সেখানে সবে ডুব দিয়েছে।
বিমল বোকার মতন কুমারের মুখের পানে তাকালে। কিন্তু কুমার বলে উঠল, বুঝেছি, বুঝেছি! এ-সব হচ্ছে ওই দ্বীপের বুড়োর চালাকি! নিশ্চয়ই সে ভেনট্রিলোকুজম জানে! লুকিয়ে লুকিয়ে আমাদের ভয় দেখাচ্ছে!
বিমল বললে, অসম্ভব নয়। কিন্তু গাছের ডাল কেন হঠাৎ দোল খায়, জল কেন হঠাৎ তোলপাড় করে?
কুমার যুতসই কোনও জবাব না দিতে পেরে বললে, বুড়ো হয়তো ম্যাজিকেরও নানান কল-কৌশল জানে!
বিমল বললে, ও-সব বাজে কথা ভাববার সময় এখন নয়। ওপরে গাছে, নীচে ডালে ভিন্ন-ভিন্ন গলায় কারা অমন অদ্ভুতরকম শব্দ করে, পদ্যে কথা কয়, হাহা করে হাসে, আমাদের ভয় দেখায়, আবার সাবধান করেও দেয়? তারা আমাদের দেখে কিন্তু নিজেরা দ্যাখা দেয় না! তারা স্পষ্টই বলছে–এ বড় মারাত্মক জায়গা, এখানে ধনরত্ন কিছুই নেই, ভালোয়-ভালোয় তোমরা প্রাণ নিয়ে কলকাতায় ফিরে যাও! কে তারা? তারা শত্রু বলে মনে হচ্ছে না, কিন্তু তারা কি আমাদের বন্ধু?
হঠাৎ কোনওরকম পূর্বাভাস না দিয়েই সারা দ্বীপ যেন সশব্দে সজাগ হয়ে উঠল।
সমুদ্রে প্রবল বন্যার দুরন্ত গর্জনের মতো, আগ্নেয়গিরির অগ্নিহুঙ্কারের মতো, কল্পনাতীত কি এক ভয়াবহ ধ্বনি-প্রতিধ্বনি যেন ক্রুদ্ধ আবেগে আকাশ-বাতাস পরিপূর্ণ করে তুললে! এবং তারই মাঝে মাঝে আবার শোনা যেতে লাগল–কিচিরমিচির কিচিরমিচির কিচ মিচ কিচ! ঘ্যাট ঘ্যাট ঘটঘট ঘ্যাট-ঘ্যাট! বানর ও আর একটা কোনও পশুর ভীত আর্তনাদ!
কুমার বিহ্বলের মতো বললে, দ্বীপে ও কাদের চিৎকার? হুড়মুড় করে গাছ ভেঙে পড়ছে চিৎকারও যেন আমাদের দিকেই এগিয়ে আসছে।
ওদিকে পানসি থেকে কাসিমও সভয়ে চেঁচিয়ে বললে, হুজুর! আমার লোকজনরা ভয়ে পাগলের মতো হয়ে উঠেছে! বলছে, তারা এই শয়তানের দ্বীপের কাছে আর একদণ্ড থাকবে না! আমরা পানসি নিয়ে চলে যেতে চাই!
বিমল ফাঁপরে পড়ে বললে, সে কী কাসিম-মিয়া, তোমরা কি আমাদের এখানে ফেলেই পালাতে চাও?
কী করব হুজুর, ভূতের সঙ্গে কে লড়াই করবে? আমরা গরিব মানুষ, ঘরে মা বউ-বেটা আমাদের পথ চেয়ে দিন গোনে, আমরা কি ভূতের হাতে প্রাণ দিতে পারি?
বিমল বললে, শোনো কাসিম, আরও বকশিশ চাও তো বল!
কাসিম মাথা নেড়ে বললে, মাপ করবেন হুজুর! প্রাণ গেলে বকশিশ নেবে কে? ভাই সব! বোট থেকে আমাদের নৌকোর দড়ি খুলে নাও!
.
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ । বিপদ জলে-স্থলে
কিন্তু সামুদ্রিক বন্যার গর্জনের মতো, আগ্নেয়গিরির হুঙ্কারের মতো, কালবৈশাখীর বজ্রকণ্ঠের চিৎকারের মতো ও-সব কিসের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি দ্বীপের ভেতর থেকে ক্রমেই জলের দিকে এগিয়ে আর এগিয়ে আসছে? ও-সব সৃষ্টিছাড়া আওয়াজ তো কোনও প্রাকৃতিক বিপ্লবের নয়, ওদের উৎপত্তি যেন জ্যান্ত জীবজন্তুর কণ্ঠ থেকেই! পৃথিবীতে এমন কোনও জীবজন্তু আছে, যারা এমন সব ভয়ানক অপার্থিব চিৎকার করতে পারে?
সেই আশ্চর্য চিৎকার একেবারে দ্বীপের প্রান্তে নদীর ধারে এসে পড়ল। বিমল অবাক হয়ে দেখলে, একটা বনের অনেকখানি অংশ যেন হেলে বেঁকে একবার দুমড়ে পড়ছে এবং আর্তনাদ করে আবার শূন্যে ঠিকরে উঠছে,–তার ভেতরে যারা আজ এসে ঢুকেছে, বনস্পতিরা তাদের যেন কিছুতেই সহ্য করতে পারছে না! সেই অসহনীয় অত্যাচারী কল্পনাতীত দুরন্তদের ভৈরব হুঙ্কার বনস্পতিদের আর্ত মর্মনাদকেও ডুবিয়ে দিলে।
কুমার হঠাৎ বিমলের কাঁধ চেপে ধরে চেঁচিয়ে উঠল, দেখো, দেখো!
বিমল আগেই দেখেছিল। চাঁদ তখন পশ্চিমদিকে গিয়ে একটা তালকুঞ্জের ফাঁক দিয়ে। উঁকি মারছে! আচম্বিতে সেই কুঞ্জের তালগাছগুলো চারিদিকে ঠিকরে পড়ল এবং তার মধ্যে বিকট দুঃস্বপ্নের মতো জেগে উঠল সুদীর্ঘ ও বিরাট একটা ছায়ামূর্তি চকিতের জন্যে! পরমুহূর্তে সেই মুর্তি অদৃশ্য হয়ে গেল এবং তালগাছগুলোও আবার খাড়া হয়ে উঠে যেন বিষম যন্ত্রণায় ছটফট করতে লাগল।
ওই মুহূর্তের মধ্যেই বিমল দেখে নিলে, সেই বিরাট দানবের দেহ প্রায় তালগাছগুলোরই মত উঁচু!
কাসিম কাঁপতে কাঁপতে বললে, হুজুর, আমার নৌকা খুলে দিয়েছি। আপনারা কী করবেন?
বিমল বললে, আমরাও যাব। ড্রাইভার, মোটরের স্টার্ট দাও। কাসিম, তোমাদের পানসি আমাদের বোটের পিছনে বেঁধে নাও।
হঠাৎ অন্ধকার জলের ভেতর থেকে আরও-অন্ধকার মস্ত একটা কুৎসিত মুখ জেগে উঠল–তার চোখদুটো জ্বলন্ত কয়লার টুকরোর মতো।
