শিবাজী ও ব্যঙ্কাজীর সাক্ষাৎ ও কলঙ্ক শিবাজী এখান হইতে আরও দক্ষিণে কুচ করিয়া কোলে নদী (অর্থাৎ কাবেরীর মুখের কাছে সর্ব্ব-উত্তর শাখা)র তীরে তিরুমল-বাড়ী নামক স্থানে ১২ই জুলাই পৌঁছিয়া বর্ষা কাটাইবার জন্য সৈন্যদেরশিবির গাডিলেন। ব্যঙ্কাজীর রাজধানী তাঞ্জোর শহর এখান হইতে দশ মাইল মাত্র দক্ষিণে, মধ্যে শুধু কোলেরুণ নদী। এখানে বসিয়া মাদুরার রাজার নিকট হইতে কর আদায়ের চেষ্টা হইতে লাগিল, এক কোটি টাকা চাওয়া হইল, কিন্তু শেষে ত্রিশ লক্ষে রফা হইল। স্থির হইল, এই টাকা পাইলে শিবাজী আর মাদুরা আক্রমণ করিবেন না।
ইতিমধ্যে শিবাজী তাঁহার বৈমাত্রেয় ভ্রাতা ব্যঙ্কাজীকে দেখা করিবার জন্য ডাকিয়া পাঠাইলেন। তাঁহার অনুরোধে প্রথমে ব্যঙ্কাজীর মন্ত্রীরা শিবাজীর সহিত আলোচনা করিতে আসিল, এবং শিবাজীর তিনজন মন্ত্রী ও নিমন্ত্রণপত্র লইয়া তাহারা নিজ প্রভুর কাছে ফিরিয়া গেল। শিবাজীর অভয়বাণীতে আশ্বস্ত হইয়া ব্যঙ্কাজী দু হাজার অশ্বারোহীর সহিত জুলাই মাসের মাঝামাঝি তিরুমল-বাড়ীতে পৌছিলেন। শিবাজী তাহাকে অভ্যর্থনা করিলেন এবং কয়েক দিন ধরিয়া ভোজ ও উপহার বিনিময় চলিল। তাহার পর কাজের কথা উঠিল। শাহজী মৃত্যুকালে যে সব ধনসম্পত্তি এবং কর্ণাটকে জাগীর রাখিয়া যান তাহার সমস্তই ব্যঙ্কাজীর হাতে পড়িয়াছিল; পিতার জ্যেষ্ঠপুত্র হিসাবে, শিবাজী এখন তাঁহার বারো আনা দাবি করিলেন। ব্যঙ্কাজী সিকিমাত্র লইয়া সন্তুষ্ট থাকিতে অস্বীকার করিলেন; তখন শিবাজী রাগিয়া তাহাকে খুব ধমকাইলেন এবং নজরবন্দী করিয়া রাখিলেন। ব্যঙ্কাজী দেখিলেন, ধনসম্পত্তি সব সঁপিয়া না দিলে মুক্তি পাওয়া দুরূহ। কিন্তু তিনি শিবাজীরই ভাই বটে; গোপনে জোগাড়যন্ত্র ঠিক কবিয়া এক রাত্রে শৌচের ভাণ করিয়া নদীতীরে এক নির্জন স্থানে গেলেন। সেখানে তাহার পাঁচজন অনুচর একটি ভেলা লইয়া প্রস্তুত ছিল। ব্যঙ্কাজী তাহাতে লাফাইয়া উঠিয়া নদী পার হইয়া নিজ রাজ্যে পৌঁছিলেন (২৩ জুলাই)।
পরদিন রাতে এই সংবাদ পাইয়া শিবাজী মহা চটিয়া বলিলেন, “ও পলাইল কেন? আমি কি উহাকে ধরিতে যাইতেছিলাম? *** পলাইবার কথা নয়। আমি যাহা চাহিয়াছিলাম, দিবার ইচ্ছা না থাকিলে বলিলেই পারিত। অতি কনিষ্ঠ ত কনিষ্ঠ, বুদ্ধিও ছেলেমানুষের মত দেখাইল।” ব্যঙ্কাজীর মন্ত্রিগণ প্রভুর খবর পাইয়া পলাইবার উদ্যোগ করিল, তাহাদের ধরিয়া শিবাজীর কাছে আনা হইল। কয়েকদিন আটক থাকিবার পর তিনি তাদের খালাস করিয়া খেলাৎ ও উপহার দিয়া তাঞ্জোরে পাঠাইয়া দিলেন; নচেৎ এই নিষ্ফল নির্যাতনে তাহার দুর্নাম ভিন্ন কোনই লাভ হইত না। শিবাজী কোলেরুণের উত্তরে শাহজরি সমস্ত জাগীর নিজে দখল করিলেন।
শিবাজী শিবিবেব বর্ণনা
ফরাসী-দূত জারমায়্যাঁ সাহেব তিরুমল-বাড়ীতে শিবাজীর শিবির দেখিয়া এই বর্ণনা লিখিয়া গিয়াছেন:—
“তাহার শিবিরে কোন রকম ধূমধাম নাই, ভারী মালপত্র বা স্ত্রীলোকের ঝঞ্জাট নাই। সমস্ত শিবিরে দুটি মাত্র তাম্বু, তাহাও আকারে ছোট এবং মোটা সাধারণ কাপড়ে তৈয়ারি; একটায় থাকেন শিবাজী, অপরটায় তাঁহার পেশোয়া। মারাঠা-অশ্বারোহীদের মাসিক বেতন দশ টাকা করিয়া, এবং তাহাদের ঘোড়া ও সইস রাজাই দেন। প্রতি দুইজন সৈন্যের জন্য তিনটি করিয়া ঘোড়া রাখা হয়, এইজন্য তাহারা খুব দ্রুত চলিতে পারে। শিবাজী গুপ্তচরদের মুক্তহস্তে টাকা দেন, আর তাহারা তাঁহাকে সত্য খবর দিয়া দেশ-জয়ে বিশেষ সহায়তা করে।”
ব্যঙ্কাজীকে ফিরাইয়া আনিবার আশা নাই দেখিয়া শিবাজী ২৭এ জুলাই তিরুমল-বাডী ছাডিয়া আবার উত্তরে আসিলেন। পথে বলি-কণ্ড পুরম চিদাম্বরম্ ও বৃদ্ধাচল (বিখ্যাত তীর্থ দুটি) দর্শন করিয়া ক্রমে ৩রা অক্টোবর মাদ্রাজ হইতে দুই দিনের পথে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। ইতিমধ্যে আরণি প্রভৃতি অনেক দুর্গ তাঁহার হাতে পড়িল।
কর্ণাটকে নুতন বাজের বন্দোবস্ত
এখন তিনি খবর পাইলেন যে, একমাস আগে আওরংজীবের হুকুমে মুঘল-সুবাদার বিজাপুর-রাজের সহিত জোট করিয়া গোলকুণ্ডা-রাজ্য আক্রমণ করিয়াছেন, কারণ কুতুব শাহ শিবাজীর মত বিদ্রোহীর সহিত মিত্রতা করিয়াছেন। এদিকে শিবাজীও দশমাস হইল নিজ রাজ্য হাতিয়া আসিয়াছেন, সেখানে রাজকর্ম তত ভাল চলিতেছে না। সুতরাং তাঁহার দেশে ফেরাই স্থির হইল।
নবেম্বরের প্রথম সপ্তাহে চার হাজার অশ্বারোহী সঙ্গে লইয়া তিনি কর্ণাটকের সমভূমি ছাড়িয়া মহীশূরের অধিত্যকায় চড়িলেন,এবং সেখানে পিতার জাগীরের মহালগুলি দখল করিবার পর মহারাষ্ট্রে ফিরিলেন। তাহার অধিকাংশ সৈন্যই আপাততঃ কর্ণাটকে রহিল, কারণ সেই অঞ্চলে তিনি যে রাজ্য জয় করিয়াছিলেন তাহা অতীব বিস্তীর্ণ ও ধনশালী। ইহা দৈর্ঘ্যে ১৮০ মাইল, প্রস্থে ১২০ মাইল, এবং ইহার মধ্যে ৮৬টা দুর্গ হিল। বার্ষিক খাজানা ৪৬ লক্ষ টাকার অধিক। এই নূতন রাজ্য জিডি ও বেলুরের জেলাগুলি সইয়া গঠিত। ইহার সদর অফিস জিঞ্জিদুর্গে। শাহজীর দাসীপুত্র শাজীকে ইঁহার শাসনকর্তা, রঘুনাথ হনুমন্তেকে দেওয়ান এবং হাম্বীর রাও মোহিতেকে সেনাপতি নিযুক্ত করিয়া শিবাজী চলিয়া গেলেন। রঙ্গো নারায়ণ মহীশ্বরের অধিত্যকায় বিজিত মহালগুলির শাসনকর্তা হইলেন।
