ইতিমধ্যে ব্যঙ্কাজী কর্ণাটকে পিতার দাগীর উদ্ধার করিবার জন্য চারিদিকে ষড়যন্ত্র করিতে লাগিলেন, কিন্তু কিছুই করিয়া উঠিতে পারিলেন না। অবশেষে ১৬ই নবেম্বর ১৬৭৭ তিনি কোলেরুণ পার হইয়া চৌদ্দ হাজার সৈন্যসহ শান্তাজীর বারো হাজার সেনাকে আক্রমণ করিলেন॥ সারাদিন যুদ্ধ করিবার পর শান্তাজী হার মানিয়া এক ক্রোশ পশ্চাতে পলাইয়া গেলেন। কিন্তু রাত্রে যখন ব্যঙ্কাজীর বিজয়ী সেনাগণ ক্লান্ত হইয়া নিজ শিবিরে ফিরিয়া, ঘোড়র জীন খুলিয়া বিশ্রাম করিতেছিল, তখন শান্তাজী নিজ পরাজিত সৈন্যদের আবার একত্র করিয়া, তাহাদের নূতন উৎসাহে মাতাইয়া সুস্থ ঘোড়ায় চড়াইয়া, এক ঘোর পথ দিয়া আসিয়া হঠাৎ ব্যঙ্কাজীর শিবিরের উপর পড়িলেন। ব্যঙ্কাজীর দল আত্মরক্ষা করিতে পারিল না, অনেকে মারা গেল, বাকী সকলে নদী পার হইয়া তাঞ্জোরে পলাইল। তিনজন প্রধান সেনানী বন্দী হইল। শত্রুপক্ষের এক হাজার ঘোয্রা তাঁবু ও মালপত্র শান্তাজীর হাতে পড়িল।
ব্যঙ্কাজীব সহিত শেষ নিষ্পত্তি
দুই ভাই-এর মধ্যে আরও কিছুদিন ধরিয়া ছোটখাট যুদ্ধ এবং লুঠপাট চলিল; দেশের অবস্থা দিন দিন শোচনীয় হইয়া উঠিল। অবশেষে শিবাজী দেখিলেন, তাঁহার অত সৈন্য এবং বড় বড় সেনাপতিদের কর্ণাটকে আর বেশি দিন ভইইনাটজ্র আর টকে আর বেশী দিন আটকাইয়া রাখিলে মহারাষ্ট্র দেশরক্ষা করা কঠিন হইবে। তিনি তখন ব্যঙ্কাজীর সহিত সন্ধি করিলেন। ব্যঙ্কাজী তাহাকে নগদ ময়লক্ষ টাকা দিলেন, তাহার বদলে শিবাজী কর্ণাটকের উত্তরাংশে জিঞ্জি ও বেলুর প্রদেশ নিজ অধিকারে রাখিয়া, বাকী সব দেশ (অর্থাৎ কোলেরুণের উত্তয়রে কয়েকটি মহাল এবং তাহার দক্ষিণে সমন্ত জোর-রাজ্য) ভ্রাতাকে ছাড়িয়া দিলেন। কিছুদিন পরে মহীশূরের জাগীরগুলিও ব্যঙ্কাজী ফিরিয়া পাইলেন। এইরূপে শান্তি স্থাপিত হওয়ায়, হাম্বীর রাও শিবাজীর অবশিষ্ট সৈন্য লইয়া দেশে ফিরিয়া আসিলেন; কর্ণাটক রক্ষার জন্য রঘুনাথ হনুমন্তে দশ হাজার স্থানীয় ফৌজ নিযুক্ত করিলেন।
কর্ণাটক হইতে যে ধনরত্ন লাভ হইল তাহা কল্পনার অতীত।
- অবশেষে ১৬৭৮ সালের এপ্রিল মাসে রাজ্যহীন নিঃসম্বল শের খা মাইয়া বাজে রে আয় লইলেন।
১০. জীবনের শেষ দুই
দশম অধ্যায় – জীবনের শেষ দুই বৎসর
স্ত্রীলোকের বীরত্ব
পূর্ব্ব-কর্ণাটক বিজয়ের পর শিবাজী মহীশূর পার হইয়া ১৬৭৮ সালের গোড়ায় পশ্চিম কানাডা বালাঘাট–অর্থাৎ মহারাষ্ট্রের দক্ষিণে বর্তমান ধারোয়ার জেলায় পৌছিলেন। এই অঞ্চলের লক্ষ্মীশ্বর প্রভৃতি নগরে লুঠ ও চৌথ আদায় করিয়া তিনি উহার উত্তরে বেলগাঁও জেলায় ঢাকিলেন। বেলগাঁও দুর্গের ৩০ মাইল দক্ষিণ-পূর্ব্বে বেলবাড়ী নামক গ্রামের পাশ দিয়া যাইবার সময় ঐ গ্রামের পাটেলনী (অর্থাৎ জমিদারণী)—সাবিত্রী বাঈ নামক কায়স্থ বিধবার অনুচরগণ মারাঠাসৈন্যদের কতকগুলি মালের বলদ কাড়িয়া লইল। ইহাতে শিবাজী রাগিয়া বেলবাড়ীর দুর্গ অবরোধ করিলেন। কিন্তু সাবিত্রী বাঈ সেই মহাবিজয়ী বীর ও তাহার অগণিত সৈন্যের বিরুদ্ধে অদম্য সাহসে যুঝিয়া ২৭ দিন পর্য্যন্ত নিজের ছোট মাটির গড়টি রক্ষা করিলেন। শেষে তাহার খাদ্য ও বারুদ ফুরাইয়া গেল, মারাঠারা বেলবাড়ী দখল করিল, বীর নারী বন্দী হইলেন। এমন এক ক্ষুদ্র স্থানে এত দীর্ঘকাল বাধা পাওয়ায় শিবাজীর বড় দুর্নাম রটিল। ইংৰাজ-কুঠর সাহেব লিখিতেছেন (২৮ ফেব্রুয়ারি, ১৬৭৮),—“তাহার নিজের লোকেরাই ওখান হইতে আসিয়া বলিতেছে যে বেলবাড়ীতে তাহার যত বেশী নাকাল হইয়াছে, নাকাল অতটা তিনি মুঘল বা বিজাপুর সুলতানের হাতেও হন নাই। যিনি এত রাজ্য জয় করিয়াছেন, তিনি কিনা শেষে এক স্ত্রীলোক দেশাইকে হারাইতে পারিতেছেন না।”
বিজাপুব-লাভের চেষ্টা বিফল ইতিমধ্যে শিবাজী ঘুষ দিয়া বিজাপুর-দুর্গ লাভ করিবার এক ফন্দি আঁটিয়াছিলেন। ঘটনাটা এই,—উজীর বহলোল খাঁর মৃত্যু (২৩ ডিসেম্বর, ১৬৭৭)-র পর তাহার ক্রীতদাস জমশেদ খাঁ ঐ দুর্গ ও বালক রাজা সিকন্দর আদিল শাহর ভার পাইয়াছিল; কিন্তু সে দেখিল উহা রক্ষা করিবার মত বল তাহার নাই। তখন ত্রিশ লক্ষ টাকার বদলে রাজা ও রাজধানীকে শিবাজীর হাতে সঁপিয়া দিতে সম্মত হইল। এই সংবাদ পাইয়া আদোনীর নবাব সিদ্দি মাসুদ (মৃত সিদ্দি জোহরের জামাতা) গোপনে থাকিয়া প্রচার করিয়া দিলেন যে তাহার কঠিন অসুখ, অবশেষে নিজের মৃত্যু-সংবাদও রটাইলেন। এমন কি একখানা পালকীতে করিয়া যেন তাঁহারই মৃতদেহ বাক্সে পুরিয়া কয়েক হাজার রক্ষী সহ কবর দিবার জন্য আদোনী পাঠান হইল! তাঁহার অবশিষ্ট সৈন্যদল-চার হাজার অশ্বারোহী,—বিজাপুরে গিয়া জমশেদকে জানাইল, “আমাদের প্রভু মারা যাওয়ায় আমাদের অন্ন জুটিতেছে না; তোমায় চাকরিতে আমাদের লও।” সেও তাহাদের ভর্ত্তি করিয়া দুর্গের মধ্যে স্থান দিল। আর, তাহারা দুই দিন পরে জমশেদকে বন্দী করিয়া বিজাপুরের ফটক খুলিয়া দিয়া সিদ্দি মাসুদকে ভিতরে আনিল। মাসুদ উজীর হইলেন (২১ ফেব্রুয়ারি)। শিবাজী এই চরম লাভের আশায় বিফল হইবার পর পশ্চিমদিকে বাঁকিয়া নিজদেশে পনহালায় প্রবেশ করিলেন (বোধ হয় ৪ঠা এপ্রিল, ১৬৭৭)।
মারাঠাদেব অন্যান্য যুদ্ধ ও দেশজয়
