জিঞ্জি অধিকার
এপ্রিল মাসের ৪ঠা ৫ই অনন্তপুরে ফিরিয়া শিবাজী সসৈন্য দ্রুত মাদ্রাজ প্রদেশের দিকে চলিলেন। ভারত-বিখ্যাত তিরুপতি পৰ্বতের মন্দির দেখিয়া পূর্ব্ব-কুলের সমভূমিতে নামিলেন, এবং মে মাসের প্রথম সপ্তাহে মাদ্রাজ শহরের সাত মাইল পশ্চিমে পেচ্ছাপোল নগরে পৌঁছিলেন। এখান হইতে তাহার অগ্রগামী সৈন্য-পাঁচ হাজার অশ্বারোহী, দ্রুত জিঞ্জি-দুর্গে উপস্থিত হইল। তাহার মালিক নসির মহম্মদ খাঁ বার্ষিক পঞ্চাশ হাজার টাকা আয়ের জাগীর এবং কিছু নগদ টাকা পাইবার প্রতিশ্রুতি লাভ করিয়া তৎক্ষণাৎ এই অজেয় দুর্গ মারাঠাদের হাতে ছাড়িয়া দিল (১৩ই মে)। শিবাজী শীঘ্রই সেখানে আসিয়া পৌঁছিলেন এবং জিঞ্জি নিজ দখলে রাখিয়া উহার দেওয়াল পরিখা বুরুজ প্রভৃতি এত দৃঢ় করিলেন যে “ইউরোপীয়গণও তাহা করিলে গর্ব্ব অনুভব করিত।”
সেখান হইতে রওনা হইয়া শিবাজী ২৩ মে বেলুর-দুর্গ অবরোধ করিলেন। ইহাও জিঞ্জির মত দুর্জ্জয় গড়। ইহার শাসনকর্তা হাবশী আবদুল্লা খা ঁআদিল শাহর বিশ্বাসী কর্মচারী; সে মারাঠাদের সব গোলাবাজী ও আক্রমণ তুচ্ছ করিয়া মহাবিক্রমের সহিত চৌদ্দ মাস লভিল, শেষে যখন দেখিল যে প্রভুর নিকট হইতে কোন সাহায্য আসিবে না, আর তাহার দুর্গরক্ষী সৈন্যদের মধ্যে পদাতিকের সংখ্যা ১,৮০০ হইতে দুইশত এবং অশ্বারোহীর সংখ্যা ৫০০ হইতে এক শততে দাড়াইয়াছে—তখন আবদুল্লা শিবাজীকে দুর্গ ছাড়িয়া দিল (২১ আগষ্ট ১৬৭৮)। এজন্য তাহাকে দেড় লক্ষ টাকা নগদ এবং বার্ষিক সেই পরিমাণ আয়ের জাগার দিবার শর্ত্ত হইল।
মারাঠাদের কর্ণাটক লুণ্ঠন
শিবাজীর সৈন্যদল দ্রুতবেগে কুচ করিয়া বন্যার মত মাদ্রাজ প্রদেশের সমভূমি ছাইয়া ফেলিল। চারিদিকে যাহা পাইল গ্রাস করিল; কেহই তাহাদের সম্মুখে দাঁড়াইতে সাহসী হইল না। শুধু গোটা-কয়েক দুর্গ জলবেষ্টিত দ্বীপের মত কিছুদিনের জন্য স্বাধীনভাবে খাডা রহিল। প্রথমে এক হাজার মারাঠা-অশ্বারোহী দুই দিনের পথ আগে আগে চলিল; তাহার পিছনে অবশিষ্ট সৈন্য লইয়া শিবাজী স্বয়ং আসিলেন; আর সর্বপশ্চাতে চাকর-বাকর এবং সিংহের পিছু পিছু শৃগালের পালের মত লুঠের লোভে আগত স্থানীয় ছোট জমিদার, ডাকাতের সর্দার, এবং জঙ্গলী জাতের দলপতি (“পলিগর”) ঘুরিতে লাগিল। টাকা আদায়ের জন্য শিবাজীর কঠোর পীড়ন এবং তাহার সৈন্যদের বিক্রম ও নিষ্ঠুরতার সংবাদ আগে আগে চলিল। পথ হইতে বড়লোকেরা যে যেখানে পারিল পলাইল, কেহ বনে কেহ-বা সাহেবদের সুরক্ষিত বন্দরে স্ত্রীপুত্র ও ধনরত্ন সহ আশ্রয় লইল। এদিকে শিবাজীর টাকার বড় দরকার। তিনি প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করিয়া, কুতুবশাহী সরকারকে জিঞ্জি না দিয়া নিজ দখলে রাখায়, গোলকুণ্ডারাজ্যের নিকট হইতে দৈনিক পনের হাজার টাকার সাহায্য বন্ধ হইয়া গেল। তখন শিবাজী ঐ অঞ্চলের সব বড় বড় শহরে চিঠি পাঠাইয়া দশ লক্ষ টাকা ঋণ চাহিলেন; অবশ্য এই ঋণ-পরিশোধের আশা ছিল না, আর তাহা চাহিবার মত দুঃসাহস কাহারই বা? শিবাজী তখন ঐ দেশের ধনী লোকদের নামধাম ও তাহাদের ধনদৌলতের একটা তালিকা করিলেন। তাঁহার চৌথ-আদায়ের তহসিলদারগণ দেশ ছাইয়া ফেলিল। বিশ হাজার ব্রাহ্মণ এই সব চাকরির আশায় তাহার সঙ্গে আসিয়াছিল। তাহারা অতি নির্লজ্জভাবে লোকদের শেষ কড়িটি পর্যন্ত কাড়িয়া লইল-ন্যায়বিচার দয়া-মায়ার ধার ধারিল না। (ফ্রাঁসোয়া মাতঁর ডায়েরি)। ইংরাজ ফরাশী ও ডচ কুঠীর বণিকেরা বার-বার দূত এবং উপহার পাঠাইয়া শিবাজীকে তুষ্ট রাখিলেন।
শের খাঁ লোদীর পবাজয়
জিঞ্জি প্রদেশের দক্ষিণে শের খাঁ লোদীর প্রকাণ্ড জাগীর, কাবেরী নদী পর্যন্ত বিস্তৃত। তিনি যুদ্ধে একেবারেই অপারক; চতুর দ্রাবিড় ব্রাহ্মণ মন্ত্রীদের পরামর্শে সব কাজ চালাইতেন। ইহারা তাঁহাকে বুঝাইয়া দিল যে শিবাজীর সৈন্যবল কিছুই না, কিন্তু তাহার বন্ধু ও সহায়ক পণ্ডিচেরীর শাসনকর্তা ফ্রাঁসোয়া মার্তা সাহেব তাঁহাকে বলিয়াছিলেন যে এ শত্রু বড় ভীষণ। শের খাঁ নিজ সৈন্য (চার হাজার অশ্বারোহী ও তিন-চার হাজার পেয়াদা ধরণের ভীরু অকেজো পদাতিক) লইয়া ১০ই জুন হইতে তিরুবাড়ীতে (কাডালোরের ১৩ মাইল পশ্চিমে) মারাঠাদের পথ রোধ করিয়া বসিয়া থাকিলেন। ২৩ মে শিবাজী জিঞ্জি হইতে বেলুরে পৌঁঁছিয়া, তথায় এক মাস থাকিয়া ঐ দুর্গ অবরোধের বন্দোবস্ত করিয়া দিয়া হয় হাজার অশ্বারোহী সহ ২৬ জুন তিরুবাড়ীতে আসিলেন। তাঁহাকে দেখিবামাত্র শের খাঁ নিজ সৈন্যদল সাজাইয়া আক্রমণে অগ্রসর হইলেন। কিন্তু মারাঠারা নিজ স্থানে স্থির নিঃশব্দভাবে দাঁঁড়াইয়া শত্রুর অপেক্ষা করিতে লাগিল। এই দৃশ্য দেখিয়া শের খাঁর হৃৎকম্প উপস্থিত হইল; তিনি দেখিলেন বড়ই বিপদ। অমনি নিজ সেনাদের ফিরিতে হুকুম দিলেন। তাহারা ইহাতে আরও ভীত এবং বিশৃঙ্খল হইয়া পডিল। ঠিক সেই সুযোগে শিবাজী ঘোড়া ছুটাইয়া আসিয়া তাহাদের উপর পড়িলেন; সকলে ছত্রভঙ্গ হইয়া উদ্ধশ্বাসে পলাইল।
শের খাঁ তিরুবাড়ীর ছোট দুর্গে ছুটিয়া গিয়া দরজা বন্ধ করিয়া দিলেন। কাঙালোরে আশ্রয় লইবার ইচ্ছায় রাত্রে তিনি সেখান হইতে বাহির হইলেন। কিন্তু মারাঠারা টের পাইয়া তাড়া করিয়া তাহাকে অকাল-নায়কের জঙ্গলে তাড়াইয়া দিল। চন্দ্র অস্ত গেলে অন্ধকারের আড়ালে বন হইতে বাহির হইযা শের খাঁ একশত মাত্র সওয়ার লইয়া (২৭ জুন) বাইশ মাইল দূরে বোনগির-পটন নামক একটি ছোট দুর্গে (ভেলার নদীর উত্তর তীরে) ঢুকিলেন। কিন্তু তাহার পাঁচ শত ঘোড়া, দুইটি হাতী, বিশটা উট এবং তাঁবু ঢাক পতাকা ও মালের বলদ মারাঠার কাড়িয়া লইল। ইহার পর কয়েক দিনের মধ্যেই শের খাঁর রাজ্যের অনেক শহর ও দুর্গ শিবাজী অবাধে দখল করিলেন। অবশেষে ৫ই জুলাই খাঁ সন্ধি করিয়া শিবাজীকে নিজের সমস্ত দেশ ছাড়িয়া দিলেন এবং নিজের মুক্তির জন্য এক লক্ষ টাকা দিতে প্রতিজ্ঞা করিলেন। এই টাকা না দেওয়া পর্যন্ত নিজপুত্র ইব্রাহিম খাঁকে জামিন-স্বরূপ শিবাজীর হাতে রাখিলেন। শিবাজী প্রতিজ্ঞা করিলেন যে শের খাঁকে পরিবারসহ অবাধে ঐ দুর্গ হইতে বাহির হইতে এবং কাডালোরে রক্ষিত তাঁহার সম্পত্তি লইয়া যাইতে দিবেন।[১]
