শিবাজী ও কুতুব শাহর সাক্ষাৎ
এইরূপে শোভাযাত্রা কুতুব শাহর বিচার-প্রাসাদ—দাদমহলের সামনে আসিয়া পৌঁছিল। সেখানে আর-সকলে শান্ত সংযতভাবে রাস্তায় দাঁড়াইয়া রহিল; শুধু শিবাজী পাঁচজন প্রধান কর্মচারীর সহিত সিড়ি বাহিয়া দরবার-গৃহে উঠিলেন। সেখানে কুতুব শাহ প্রতীক্ষা করিতেছিলেন; তিনি দরজা পর্যন্ত উঠিয়া আসিয়া শিবাজীকে আলিঙ্গন করিলেন এবং হাত ধরিয়া লইয়া গিয়া গদীর উপর নিজ পাশে বসাইলেন;, মন্ত্রী মাদন্নাকে ফরাশে বসিতে অনুমতি দেওয়া হইল; আর সকলে দাঁড়াইয়া রহিল। অন্তঃপুরের বেগমেরা দুই পাশের পাথরের জাফরি-কাটা জানালার ফাক দিয়া কুতুহলে এই অপূর্ব দৃশ্য দেখিতে লাগিলেন।
কুতুব শাহ তিন ঘণ্টা ধরিয়া কথাবার্তা কহিলেন, এবং শিবাজীর মুখে তাহার জীবনের আশ্চর্য ঘটনা ও বীর কীর্তিগুলির বিস্তারিত বিবরণ মুগ্ধ হইয়া শুনিলেন। পরে তিনি স্বহস্তে শিবাজীকে পান আতর দিয়া, এবং মারাঠা মন্ত্রী ও সেনাপতিদের খেলাৎ অলঙ্কার হাতীঘোড় উপহার দিয়া বিদায় করিলেন। স্বয়ং শিবাজীর সঙ্গে সঙ্গে সিঁড়ির নীচ তলা পর্যন্ত গেলেন। সেখান হইতে পথে টাকা ছড়াইতে ছড়াইতে শিবাজী বাসাবাড়ীতে পৌঁছিলেন।
উজীর মাদন্না পণ্ডিত পরদিন শিবাজী ও তাঁহার প্রধান কর্মচারীদিগকে নিমন্ত্রণ করিয়া খাওয়াইলেন; তাহার মাতা স্বহস্তে অতিথিদের জন্য রান্না করিলেন। ভোজশেষে নানা উপহার পাইয়া মারাঠারা বাসায় ফিরিল।
গোলকুণ্ডা-রাজের সহিত সন্ধি
তাহার পর কাজের কথা আরম্ভ হইল। অনেক আলোচনার পর শিবাজীর সহিত এই শর্তে সন্ধি হইল -কুতুব শাহ দৈনিক পনের হাজার টাকা এবং নিজ সেনাপতি মীজা মহম্মদ আমিনের অধীনে পাঁচ হাজার সৈন্য, কতকগুলি তোপ এবং গোলা বারুদ দিয়া শিবাজীকে কর্ণাটক জয়ে সাহায্য করিবেন। শিবাজী প্রতিজ্ঞা করিলেন, কর্ণাটকের যে যে অংশ তাহার পিতা শাহজীর ছিল তাহা বাদে জয় করা সমস্ত দেশ কুতুব শাহকে দিবেন। এ ছাড়া তিনি কুতুব শাহর সম্মুখে ধর্ম্মশপথ করিয়া বলিলেন যে মুঘলেরা আক্রমণ করিলেই তিনি গোলকুণ্ডা-রাজ্য রক্ষা করিতে ছুটিয়া আসিবেন। তজ্জন্য কুতুব শাহ পূর্ব প্রতিশ্রুতি-মত বার্ষিক কর পাঁচ লক্ষ টাকা নিয়মিতভাবে দিতে থাকিবেন বলিয়া আশ্বাস দিলেন।
গোপনে এই-সব মন্ত্রণা ও বন্দোবস্ত চলিতে লাগিল, আর বাহিরে আমোদ-প্রমোদ তামাশা ও ভোজে মারাঠা এবং নগরবাসীদের সময় সুখে কাটিতে লাগিল। শিবাজী দ্বিতীয়বার কুতুব শাহর সহিত দেখা করিলেন; দুই রাজা প্রাসাদের বারান্দায় পাশাপাশি বসিলেন, আর সমস্ত মারাঠা-সৈন্য কুচ করিয়া তাঁহাদের সামনে দিয়া চলিল; গোলকুণ্ডার সুলতান তাহাদের নানা উপহার দিলেন। শিবাজীর ঘোড়াকে পর্যন্ত একটি মণি ও হীরার মালা গলায় পরাইয়া দেওয়া হইল, কারণ সে-ও তাঁহার যুদ্ধজয়ে সঙ্গী ছিল।
)০আর একদিন কুতুব শাহ জিজ্ঞাসা করিলেন, “আপনার কয় শত হাতী আছে?” শিবাজী তাহার হাজার হাজার মাবুলে পদাতিক সৈন্য দেখাইয়া দিয়া বলিলেন, “ইহারাই আমার হাতী।” তখন সুলতানের একটি প্রকাশ মত্ত হস্তীর সহিত মাবুলে সেনাপতি যসাপ্পজী কঙ্ক তরবারি লইয়া যুদ্ধ করিলেন, এবং উহাকে কিছুক্ষণ ঠেকাইয়া রাখিয়া শেষে এক কোপে উহার শুভ কাটিয়া ফেলিলেন। হাতী পরান্ত হইয়া পলাইয়া গেল।
এইরূপে এক মাস কাটাইবার পর টাকা ও মালপত্র লইয়া শিবাজী মার্চ মাসের প্রথমে হায়দারবাদ ত্যাগ করিলেন। দক্ষিণ দিকে গিয়া কৃষ্ণা নদীর তীরে “নিবৃত্তি সঙ্গমে” (ভবনাশী নদীর সহিত মিলন ক্ষেত্রে) তীর্থস্নান ও পূজা স্নানাদি করিয়া, সৈন্যদের অনন্তপুরে পাঠাইয়া দিলেন, এবং নিজে অল্প রক্ষী ও কর্মচারী সঙ্গে লইয়া দ্রুতবেগে শ্রীশৈল দর্শনে চলিলেন।
শিবাজীর শ্রীশৈল দর্শন
এই স্থান কর্মুল নগর হইতে ৭০ মাইল পূর্ব দিকে। এখানে কৃষ্ণা নদী হইতে হাজার ফুট উচু এক অধিতাকার জনহীন বনের মধ্যে মল্লিকার্জুন শিবের মন্দির—ইহা দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের একটি লিঙ্গ। মন্দিরটি পঁচিশ ছাব্বিশ ফীট উচু দেওয়াল দিয়া ঘেরা; ইহার চারিদিকে অতি বিস্তৃত আঙ্গিনা। বড় বড় সমচতুষ্কোণ পাথর দিয়া এই দেওয়াল গাঁথা, আর তাহার গায়ে হাতী, ঘোড়া, বাঘ, শিকারী, যোদ্ধা, যোগী, এবং রামায়ণ ও পুরাণের দৃশ্য অতি সুন্দরভাবে খোদাই করা। শিবমন্দিরটিও সমচতুষ্কোণ। বিজয়নগরের দিগ্বিজয়ী সম্রাট কৃষ্ণদেব রায়ের অর্থে মন্দিরের চারিদিকের দেওয়াল ও ছাদ আগাগোড়া সোনার জল করা পিতলের চাদরে মোড়া (১৫১৩)। ঐ বংশের এক সম্রাজ্ঞী উপর হইতে নীচে কৃষ্ণার জলধারা পর্যন্ত হাজার ফীটেরও বেশী দীপথ, পাথরের শান বাঁধাইয়া দিয়াছিলেন। তাহার নীচে ঘাটের নাম “পাতাল গঙ্গা”; আর কিছু ভাটীতে “নীলগঙ্গা” নামে পার-ঘাট; এই দুটিই বিখ্যাত স্নানের তীর্থ। শিবমন্দিরের কাছে একটি হোট দুর্গা-মন্দির।
শিবাজী শ্রীশৈলে উঠিয়া পূজা স্নান দান লক্ষ ব্রাহ্মণ ভোজন ইত্যাদি কার্য্যে এখানে নবরাত্রি (অর্থাৎ চৈত্র শুক্লপক্ষের প্রথম নয়দিবস, ২৪ মার্চ হইতে ১ এপ্রিল, ১৬৭৭) যাপন করিলেন। এই তীর্থস্থানের শান্ত স্নিগ্ধ সৌন্দর্য্য, রম্য নির্জ্জনতা, এবং ধর্মভাব জাগাইবার স্বাভাবিক শক্তি দেখিয়া তিনি আনন্দে অভিভূত হইয়া পড়িলেন। এটা যেন তাঁহার নিকট দ্বিতীয় কৈলাস বা শিবের স্বর্গ বলিয়া বোধ হইল। মরিবার এমন উপযুক্ত স্থান এবং সময় আর মিলিবে না ভাবিয়া শিবাজী স্থির করিলেন, তিনি দেবী-প্রতিমার চরণে নিজমাথা কাটিয়া দিয়া দেহ ত্যাগ করিবেন। প্রবাদ আছে, ভগবতী স্বয়ং আবির্ভূত হইয়া, শিবাজীর উদ্যত তরবারি ধরিয়া ফেলিয়া তাহাকে থামালেন এবং বলিলেন, “বৎস! এই উপায়ে তোমার মোক্ষ হইবে না। একাজ করিও না। তোমার হাতে এখনও অনেক বড় বড় কর্তব্যভার রহিয়াছে।” তাহার পর দেবী অদৃশ্য হইলেন, শিবাজীও ক্ষান্ত হইলেন।
