পনহালা-জয়
১৬৭৩, ৬ই মার্চ্চ, কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়োদশীর রাত্রিতে শিবাজীর সেনাপতি কোণ্ডাজী ফর্জন্দ আটজন বাছা বাছা মাব্লে পদাতিক লইয়া নিঃশব্দে পনহালা-দুর্গের উপরে চড়িলেন। তাঁহার সৈন্যগণ হাত ধরাধরি করিয়া পরস্পরকে পাহাড়ের প্রায় খাড়া গা বাহিয়া টানিয়া তুলিল। চূড়ায় পৌঁছিয়া তাহারা চারিদলে ভাগ হইয়া চারিদিক হইতে ভেরী বাজাইয়া দুর্গের মধ্যে দুটিয়া চলিল। গভীর নিস্তব্ধ অন্ধকার রাত্রে, বাহিরের সমতলভূমি হইতে নহে, দুর্গের মধ্য হইতে এই হঠাৎ আক্রমণে দুর্গরক্ষকেরা হতভম্ব হইয়া পড়িল। চারিদিকে ছুটাছুটি ও পলায়ন আরম্ভ হইল। কোণ্ডাজী স্বয়ং দুর্গস্বামীকে তরবারি দিয়া কাটিয়া ফেলিলেন। হিসাবের প্রধান কর্ম্মচারী নাগোজী পণ্ডিত গোলমাল শুনিয়া রাস্তায় বাহির হইয়া একজন প্রহরীকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “কি হইয়াছে?” সে বলিল, “আরে ঠাকুর! জান না মারাঠারা দুর্গ লইয়াছে, আর দুর্গস্বামী মারা পড়িয়াছেন?” অমনি নাগোজী সর্ব্বস্ব ছাড়িয়া দ্রুতবেগে পলায়ন করিলেন। ধরা পড়িলে তাঁহাকে মারিয়া টাকাকড়ি আদায় করা হইত।
তখন নীচ হইতে আর-সব মারাঠা সৈন্য দুর্গে ঢুকিল। ক্রমে প্রভাত হইল। সমস্ত দুর্গ শিবাজীর অধিকারে আসিল।[৪] বিজাপুরী কর্ম্মচারীদের নিজের এবং সরকারী সব ধনসম্পত্তি কোথায় লুকান আছে প্রহারের চোটে জানিয়া লইয়া মারাঠারা তাহা দখল করিল। সংবাদ পাইয়া শিবাজী নিজে শীঘ্র আসিয়া দুর্গটি দেখিলেন, এবং সেখানে একমাস থাকিয়া দেওয়াল মজবুত করিয়া, আরও কামান আনাইয়া পনহালাকে নিজের অজেয় আশ্রয়স্থলে পরিণত করিলেন। কিছুদিনের মধ্যে পারলি এবং সাতাৱা দুর্গও তাঁহার লাভ হইল।
উমরাণীর যুদ্ধ
এতগুলি দুর্গ হাতছাড়া হওয়ায় বিজাপুরের রাজসভায় মহা আন্দোলন পড়িয়া গেল। নূতন উজীর খাওয়াস্ খাঁর অবহেলায় এই সব ক্ষতি হইয়াছে বলিয়া সকলে তাঁহাকে দোষ দিতে লাগিল। বহলোল খাঁকে পনহালা উদ্ধার করিতে পাঠান হইল, এবং আর তিনজন বড় সেনাপতিকে দূর দূর প্রদেশ হইতে নিজ সৈন্য সহিত আসিয়া বহলোলকে সাহায্য করিবার জন্য হুকুম গেল।
কিন্তু এই সকল সাহায্য পৌঁছিবার পূর্বেই শিবাজী বহলোলকে আক্রমণ করিলেন। তাঁহার প্রধান সেনাপতি প্রতাপ রাও পনের হাজার অশ্বারোহীসহ দুই রাত্রি গোপনে দ্রুত কুচ করিয়া আসিয়া উমরাণীনামক গ্রামে (বিজাপুর শহরের ১৮ ক্রোশ পশ্চিমে) বহলোলের সৈন্যদলকে একেবারে ঘিরিয়া ফেলিলেন এবং তাহাদের জলাশয়ে যাইবার একমাত্র পথ বন্ধ করিয়া দিলেন (১৫ই এপ্রিল)। পরদিন প্রাতে মারাঠারা দলে দলে ঢেউয়ের মত বারবার বিজাপুরী-সৈন্যদের আক্রমণ করিল। সারাদিন ধরিয়া যুদ্ধ চলিল; অনেকে মরিল, অনেকে আহত হইল। বহলোলের আফঘান-সৈন্যগণ প্রাণপণে লড়িয়া নিজস্থান রক্ষা করিল। অবশেষে রণক্ষেত্রে সন্ধ্যা নামিল। দুই পক্ষ ক্লান্ত হইয়া নিজ নিজ শিবিরে [৫] ফিরিয়া গেল। কিন্তু বিজাপুরীদের তৃষ্ণা নিবারণের জন্য এক বিন্দু জল জুটিল না।
তখন বহলোল গোপনে প্রতাপ রাওকে অনেক টাকা ঘুষ পাঠাইয়া দিলেন এবং বলিলেন, “আমাকে পলাইয়া যাইবার জন্য একদিকের পথ ছাড়িয়া দাও। তোমরা আমার শিবিরের সব জিনিস লইও।” তাহাই করা হইল। বহলোল রাতারাতি শত্রুব্যূহের মধ্যে একটি ফাঁক দিয়া কুচ করিয়া বিজাপুরে ফিরিয়া গেলেন। একথা শুনিয়া শিবাজী অত্যন্ত রাগিয়া প্রতাপ রাওকে তিরস্কার করিলেন।
তাহার পর কয়েক মাস ধরিয়া কানাড়া প্রদেশে যুদ্ধ চলিল, কিন্তু কোন পক্ষেই বড় কিছু হইল না। শিবাজী চারিদিকে অবাধগতিতে চলাফেরা ও লুঠ করিতে লাগিলেন। ১০ই অক্টোবর বিজয়া দশমীর দিন তিনি স্বয়ং কানাড়া আক্রমণ করিতে রওনা হইলেন। কিন্তু দুই মাস পরেই বিজাপুরীরা তাঁহাকে সেখান হইতে ফিরিতে বাধ্য করিল। এবার তাঁহার তেমন কিছু লাভ হইল না।
সেনাপতি প্রতাপ রাও-এর মৃত্যু
এই পরাজয়ের অপমান মুছিয়া ফেলিবার জন্য ১৬৭৪,জানুয়ারি মাসে শিবাজী প্রতাপ রাওকে আবার পাঠাইয়া দিয়া বলিলেন, “বহলোল আমার রাজ্যে বারবার আসিতেছে। তুমি সৈন্য লইয়া যাও এবং তাহাকে চুড়ান্তরূপে পরাস্ত কর। নচেৎ আর কখন আমাকে মুখ দেখাইও না।”
প্রভুর তিরস্কারে ক্রুদ্ধ হইয়া প্রতাপ রাও বহলোলের খোঁজে বাহির হইলেন এবং কোলাপুরের ৪৫ মাইল দক্ষিণে ঘাটপ্রভা নদীর কিছু দুরে নেসরী নায়ক গ্রামে তাঁহাকে পাইলেন। বিজাপুরী সৈন্য দেখিবামাত্র প্রতাপ রাও দিগ্বিদিক্ জ্ঞান হারাইয়া ঘোড়া ছুটাইয়া তাহাদের উপর গিয়া পড়িলেন। শুধু ছয়জন অনুচর তাঁহার সঙ্গে চলিল, বাকী সৈন এই পাগলের কাণ্ড দেখিয়া পিছাইয়া রহিল। কিন্তু প্রতাপ রাও-এর পশ্চাতে দৃষ্টি নাই, কথা শুনিবার সময় নাই। তাঁহার সম্মুখে দুই পাহাড়ের মধ্য দিয়া একটি সরু পথ, ওপারে বহলোলের লোক দাঁড়াইয়া। এই পথে ঢুকিয়া শত্রুবেষ্টিত প্রতাপ ও তাঁহার ছয়জন সঙ্গী শীঘ্রই নিহত হইলেন। তখন বিজাপুরীরা বিজয় উল্লাসে মারাঠাদের উপর ছুটিয়া আসিয়া অনেককে কাটিয়া ফেলিল, “রক্তের নদী বহিল।” (২৪ ফেব্রুয়ারি, ১৬৭৪)।
অন্যান্য যুদ্ধ
আনন্দ রাও ছত্রভঙ্গ মারাঠা-সৈন্যগণকে সাহস দিয়া আবার একত্র করিলেন। শিবাজী তাঁহাকে সেনাপতি নিযুক্ত করিয়া লিখিয়া পাঠাইলেন, “শত্রুকে পরাজিত না করিতে পারিলে জীবন্ত ফিরিও না। তখন আনন্দ রাও তাঁহার অশ্বারোহী সৈন্য লইয়া বিজাপুর রাজ্যের মধ্যে ঢুকিলেন। দিলির ও বহলোল খাঁ মিলিত হইয়া তাঁহার পথ রোধ করিলেন। কিন্তু আনন্দ রাও প্রত্যহ ৪৫ মাইল করিয়া এত দ্রুত কুচ করিলেন যে দুই খাঁ-ই অপারক হইয়া পথ হইতে ফিরিয়া গেলেন
