তাহার পরই পেশোয়া মুলের-দুর্গ জয় করিলেন। ইহার ফলে সমস্ত বগলানা প্রদেশে মারাঠা আধিপত্য নিষ্কন্টক হইল। বগলানা সুরত যাইবার পথ। চারিদিকে শিবাজীর নাম ছড়াইয়া পড়িল, সকলে ভয়ে কাঁপিতে লাগিল। মুঘল-সেনাপতি দুইজন (বাহাদুর ও দিলির) যুদ্ধে বিফল হইয়া লজ্জায় মাথা হেঁট করিয়া নিজ সীমানায় আহমদনগরে ফিরিয়া আসিলেন। পুণা ও নাসিক জেলা (অর্থাৎ মারাঠাদের দেশ) আঁচিল।
এদিকে মার্চ্চ মাসে স্ৎনামী বিদ্রোহ এবং এপ্রিল মাসে খাইবার গিরিসঙ্কটের পাঠানদের সঙ্গে যুদ্ধ আরম্ভ হওয়ায় আওয়ংজীব এত বিব্রত হইলেন যে কিছুদিন ধরিয়া দক্ষিণে আর সৈন্য ও টাকা পাঠান অসম্ভব হইল। জুন মাসে (১৬৭২) শাহজাদা মুয়জ্জমের স্থানে বাহাদুর খাঁ দাক্ষিণাত্যের শাসনকর্ত্তা নিযুক্ত হইলেন। কুমার ও মহাবৎ খাঁ দুজনেরই উত্তর-ভারতে ডাক পড়িল।
কোলী-দেশ অধিকার
তাহার পর শিবাজীর জয়জয়কার। সুরত হইতে দক্ষিণে বম্বের দিকে আসিতে যে পাহাড় ও জঙ্গলপূর্ণ দেশ পার হইতে হয়, তাহাতে কোলী নামক অসভ্য দস্যুজাতির বাস। সে সময় এখানে ইহাদের দুইটি ছোট রাজ্য ছিল;—ধরমপুর (রাজধানী রামনগর, বর্ত্তমান নাম ‘নগর’, সুরতের ৬০ মাইল দক্ষিণে) এবং জওহার (রামনগরের ৪০ মাইল দক্ষিণে)। এই রামনগরের ঠিক পূর্ব্বদিকে সহ্যাদ্রি পর্ব্বতশ্রেণী পার হইলে নাসিক জেলা বা উত্তর-মহারাষ্ট্র। ১৬৭২ সালের ৫ই জুন পেশোয় মোরো ত্রম্ব্যক জওহার অধিকার করিলেন। সেখানকার রাজা বিক্রম শাহ মুঘল-রাজ্যে পলাইয়া গেলেন। ইহার অল্পদিন পরে রাম নগরও দখল করা হইল, তাহার রাজা সোমসিংহ পোর্তুগীজ শহর দামনে আশ্রয় লইলেন।
মারাঠারা এত কাছে স্থায়ী আড্ডা গাড়াতে সুরত শহর জমে কাঁপিতে লাগিল। রামনগরে বসিয়া পেশোয়া সুরতের শাসনকর্ত্তা ও প্রধান বণিকদের নামে উপরি উপরি তিনখানা পত্র পাঠাইয়া চারিলক্ষ টাকা কর চাহিলেন এবং বলিলেন যে, এই টাকা না দিলে তিনি সুরত দখল করিবেন। শেষ চিঠিতে শিবাজীর জবানী এইরূপ লেখা ছিলঃ—“আমি তিনবারের বার এই শেষবার তোমাদের বলিতেছি যে, সুরত প্রদেশের খাজনার এক সিকি অর্থাৎ চৌথ আমাকে পাঠাইয়া দাও। তোমাদের বাদশাহ আমাকে নিজ দেশ ও প্রজা রক্ষা করিবার জন্য প্রকাণ্ড সৈন্যদল রাখিতে বাধ্য করিয়াছেন; সুতরাং তাঁহার প্রজারাই এই সৈন্যদলের খরচ জোগাইবে। যদি এই টাকা শীঘ্র না পাঠাও, তবে আমার জন্য একটা বড় বাড়ী প্রস্তুত রাখিও, আমি গিয়া সেখানে বসিয়া থাকিব এবং সুরতের খাজনা এবং মালের মাশুল আদায় করিয়া লইব। এখন আমাকে বাধা দিতে পারে এমন লোক তোমাদের মধ্যে কেহ নাই।”
এই পত্র পাইবার পর সুরতে পরামর্শের জন্য সভা বসিল। শহরবাসী এবং আশপাশের গ্রামের প্রধান লোকদিগের উপর তিনলক্ষ টাকা চাঁদা তোলার ভার দেওয়া হইল। কিন্তু অনেক আলোচনার পর লোকেরা কিছুই দিল না, কারণ তাহারা বেশ জানিত যে শহরের মুঘল-শাসনকর্ত্তা সব টাকা নিজে খাইয়া ফেলিবে, মারাঠাদের শান্ত করিবার জন্য কিছুই দিবে না।
তাহার পর যতবারই মারাঠারা এদিকে আসিতেছে বলিয়া গুজব উঠিত, ততবারই সুরতবাসীরা পলাইবার পথ খুঁজিত। এই কাণ্ড অনেক বৎসর ধরিয়া চলিল।
১৬৭২, জুলাই মাসে পেশোয়া নাসিক মেলায় ঢুকিয়া লুঠপাঠ আরম্ভ করিলেন। সেখানকার দুইজন মুঘল থানাদার পরাস্ত হইয়া পলাইল। অক্টোবর নবেম্বর মাসে মারাঠা অশ্বারোহীরা দ্রুতবেগে বেরার ও তেলিঙ্গানায় প্রবেশ করিয়া রামগির জেলা লুঠ করিতে লাগিল। মুঘলসেনাপতি বাহাদুর খাঁ কিছুতেই তাহাদের ধরিতে পারিলেন না। তাহারা দ্রুতগতি নিজদেশে ফিরিয়া আসিল, কিন্তু মুঘলেরা পিছু পিছু থাকিয়া তাহাদের হাত হইতে অনেক লুঠ করা ঘোড়া ও বণিকদের মাল উদ্ধার করিল। আওরঙ্গাবাদের কাছে একটি ছোট মুদ্ধে মারাঠারা পরাজিত হইল। ফলতঃ তাহাদের এবারকার বেরার-আক্রমণ প্রায় সম্পূর্ণ নিষ্ফল হইল।
বিজাপুরে সহিত শিবাজীর সন্ধিভঙ্গ
পর বৎসর (১৬৭৩) মহারাষ্ট্রে তেমন কোন বড় যুদ্ধ বা বিশেষ লাভ-লোকসান হইল না। সুবাদার বাহাদুর খাঁ ভীমা নদীর তীরে পেড়গাঁও-এ শিবির স্থাপন করিয়া পথঘাটের উপর সতর্ক দৃষ্টি রাখিতে লাগিলেন।
এই বৎসর শিবাজী নিজ জন্মস্থান শিবনের-দুর্গ অধিকার করিবার এক চেষ্টা করেন। আওরংজীব এই দুর্গটি আবদুল আজিজ খাঁ নামক একজন ব্রাহ্মণ মুসলমানের জিম্মায় রাখিয়াছিলেন। সেই লোকটি যেমন বিশ্বাসী তেমনি চতুর ও কার্য্যদক্ষ। শিবাজী তাহাকে “পর্ব্বতপ্রমান টাকার স্তূপ” দিতে চাহিলেন, আর সেও সম্মতির ভাণ করিয়া একটা নির্দ্দিষ্ট রাত্রে দুর্গ ছাড়িয়া দিবে বলিয়া স্বীকার করিল। সেই রাত্রে শিবাজীর সাত হাজার সৈন্য দুর্গের কাছে পৌঁছিলি। কিন্তু আবদুল আজিজ ইতিমধ্যে বাহাদুর খাঁকে গোপনে খবর দিয়াছিল। মারাঠা আসিয়া ফাঁদে পড়িল। তাহাদের অনেকে মরিল, অনেকে জখম হইল, বাকী সকলে হতাশ হইয়া ফিরিয়া গেল।
কিন্তু অন্যদিকে শিবাজীর এক মহাযোগের পথ খুলিয়া গিয়াছিল। ২৪এ নবেম্বর (১৬৭২) বিজাপুরের রাজা দ্বিতীয় আদিল শাহ প্রাণত্যাগ করিলেন, এবং তাঁহার স্থানে চারি বৎসরের শিশু সিকন্দর রাজা হইলেন। তাঁহার অভিভাবক পদ লইয়া বিজাপুরের বড় বড় ওমরাদের মধ্যে মহা ঝগড়া বাধিয়া গেল। রাজ্যময় গোলমাল ও বিদ্রোহ দেখা দিল। বিজাপুরের নূতন উজীর খাওয়াস্ খাঁর সহিত শিবাজী আর পূর্ব্বের সদ্ভাব বজায় রাখিলেন না,ঐ রাজ্যে উৎপাত সুরু করিয়া দিলেন।
