তাহার পর আনন্দ রাও দক্ষিণে ঘুরিয়া কানাড়ায় প্রবেশ করিলেন। সাঁপগাঁও শহরের বাজার (পেঠ) লুঠিয়া সাড়ে সাত লাখ টাকা পাইলেন (২৩ মার্চ্চ)। দশ ক্রোশ দূরে বঙ্কাপুর নগরের কাছে বহলোল ও খিজির খাঁর অধীনে একদল বিজাপুরী-সৈন্য পরাস্ত করিয়া পাঁচ শত ঘোড়া দুইটি হাতী এবং শত্রুদলের যথাসর্ব্বস্ব কাড়িয়া লইলেন। কিন্তু বহলোল শীঘ্রই ফিরিয়া প্রচণ্ড বেগে তাঁহাকে আক্রমণ করিলেন। মারাঠারা এক হাজার ঘোড়া ও লুঠের মালের কতক ফেলিয়া দিয়া হালকা হইয়া অবশিষ্ট লুঠ লইয়া নিরাপদে নিজ দেশে ফিরিল।
৮ই এপ্রিল শিবাজী চিপলুন নগরে এই-সব বিজয়ী সৈন্যদের মহলা (রিভিউ) দেখিলেন, তাহাদের অনেক পুরস্কার দিলেন, এবং হংসাজী মোহিতেকে “হাম্বীর রাও” উপাধি দিয়া প্রতাপ রাও-এর স্থানে সর্ব্ব প্রধান সেনাপতির পদে নিযুক্ত করিলেন।
১৬৭৩ সালের ডিসেম্বর হইতে পর বৎসরের মার্চ্চ মাস পর্য্যন্ত কোঁকনে ও অন্যত্র যুদ্ধ খুব ঢিলা তালে চলিল। দুই পক্ষেরই সৈন্যেরা ক্লান্ত ও বিরক্ত হইয়া কাজে গা লাগাইল না। তাহাদের নেতারাও যুদ্ধ করিয়া বিবাদ নিষ্পত্তি করা অপেক্ষা লুঠতরাজ অধিক লাভজনক দেখিয়া তাহাতেই মন দিল। এই বৎসর শীতকালে অতিবৃষ্টি হওয়ায় মহারাষ্ট্রে মড়ক দেখা দিল। তাহাতে অনেক ঘোড়া ও মানুষ মরিল।
বাদশাহ ৭ই এপ্রিল (১৬৭৪) দিল্লী হইতে রওনা হইয়া উত্তর-পশ্চিমে আফগান-সীমানায় গেলেন, কারণ খাইবার পর্বতের আফ্রিদি জাতি ভীষণ বিদ্রোহ আরম্ভ করিয়াছিল। দিলির খাঁকে দাক্ষিণাত্য হইতে ফিরাইয়া আনা হইল। সেখানে বাহাদুর খাঁ একা পড়িয়া রহিলেন; তাঁহার পক্ষে এত কম সৈন্য লইয়া কিছু করা অসম্ভব হইল। এই সুযোেগে শিবাজী মহা আড়ম্বরে নিজের রাজ্যাভিষেক-ক্রিয়া সম্পন্ন করিলেন।
- শিবাজী এই যুদ্ধে স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন না, সুতরাং কার্ম্মারকরের আধুনিক ব্রঞ্জ প্যানেল ঐতিহাসিক সত্যের বিরোধী।
- কিন্তু কারিঞ্জাৱ সর্বশ্রেষ্ঠ ধনী ধরা পড়েন নাই। তিনি স্ত্রীলোকের পোষাক পরিয়া নিরাপদে পলাইয়াছিলেন। তিনি জানিতেন যেখানে শিবাজী উপস্থিত সেখানে কোনো মারাঠা সৈন্য স্ত্রীলোকের উপর হাত তুলিতে সাহস পাইবে না।
- তিনি পরে কি করিলেন তাহার বিবরণ আমার History of Aurangai vol. 5, ch. 61-এ ও Irvine’s Later Mughals, ii. ch. 9-এ আছে।
- জেবে শকাবলীতে লেখা আছে যে শিবাজী ঘুষ দিয়া (দুর্গের একদিককার
- রক্ষীদের হাত করিয়া) পনহালা দখল করেন। আমারও তাহাই সত্য বলিয়া মনে হয়, কারণ এমন অজেয় দুর্গ রক্ষা করিবার জন্য তেমন কোন চেষ্টাই হয় নাই।
০৮. রাজ্যাভিষেক
অষ্টম অধ্যায় – রাজ্যাভিষেক
অভিষেকের আবশ্যকতা
শিবাজী অনেক দেশ জয় এবং অগাধ ধন সংগ্রহ করিয়াছিলেন, কিন্তু এ পর্য্যন্ত নিজকে ছত্রপতি অর্থাৎ স্বাধীন রাজা বলিয়া ঘোষণা করেন নাই। ইহাতে তাঁহার অনেক অসুবিধা ও ক্ষতি হইতেছিল। প্রথমতঃ, অপর রাজারা তাঁহাকে বিজাপুরের অধীন জমিদার অথবা জাগীরদার মাত্র বলিয়া গণ্য করিতেন; বিজাপুরের কর্ম্মচারীদের চক্ষে তিনি বিদ্রোহী প্রজা মাত্র। আর, অন্যান্য মারাঠী জমিদারবংশও ভোঁশলেদিগকে নিজেদের অপেক্ষা কোন অংশে শ্রেষ্ঠ বলিয়া স্বীকার করিত না; বরং তাহাদের মধ্যে অতিপুরাতন ঘরগুলি (যেমন, মোরে, যাদব, নিম্বলকর প্রভৃতি) শাহজী শিবাজীকে ভুঁইফোড় অকুলীন বলিয়া অবজ্ঞা করিত। শিবাজীর প্রজারাও মহাসঙ্কটে পড়িয়াছিল, কারণ যতদিন তিনি ছত্রপতি বলিয়া গণ্য না হন, ততদিন আইন-অনুসারে তাহারা নিজেদের পূর্ব্বেকার রাজার প্রজা, শিবাজীর শাসন মানিতে বাধ্য ছিল না। তাঁহার ভূমিদান এবং নিয়োগপত্র আইন অনুসারে সিদ্ধ হইতে পারিত না।
সুতরাং শিবাজী নিজের অভিষেক করিয়া ‘ছত্রপতি’ উপাধি লইয়া জগৎকে দেখাইলেন যে তিনি স্বাধীন রাজা, তাঁহার অধীন প্রজাগণ তাঁহাকেই মানিবে, অন্য কোন প্রভুর ক্ষমতা স্বীকার করিবে না। ইহা ভিন্ন মহারাষ্ট্রের সকল উচ্চমনা দেশসেবকই দেশে স্বাধীন হিন্দু রাজত্ব “হিন্দরী স্বরাজ”—স্থাপনের জন্য উৎসুক হইয়াছিল। একমাত্র শিবাজীই এই জাতীয় বাঞ্ছা পূরণ করিতে পারেন।
অভিষেকের আয়োজন
কিন্তু শাস্ত্র অনুসারে ক্ষত্রিয় ভিন্ন অন্য কোন জাতের লোক হিন্দুরাজা হইতে পারে না; অথচ সে যুগে সমাজে ভোঁশলে বংশকে শুদ্র বলিয়া গণ্য করা হইত। তখন শিবাজীর মুনশী বালাজী আবজী মারাঠা জাতির সর্ব্বশ্রেষ্ঠ পণ্ডিত কাশীবাসী বিশ্বেশ্বর ভট্ট (ডাক-নাম গাগা ভট্ট)কে অনেক টাকা দিয়া হাত করিলেন। ভট্ট মহাশয় শিবাজীর ক্ষত্রিয়ত্ব প্রমাণ করিয়া এবং তাঁহার আদি পুরুষ যে সূর্য্যবংশীয় চিতোরের মহারাণার পুত্র—ইহা স্বীকার করিয়া এক পাতি লিখিয়া দিলেন এবং তাঁহার অভিষেক-ক্রিয়ায় প্রধান পুরোহিত হইতে সম্মত হইলেন। গাগা ভট্ট দিগ্বিজয়ী পণ্ডিত-“চারি বেদ ও ছয়শান্ত্রে যোগাভ্যাস-সম্পন্ন, জ্যোতিষী, মন্ত্রিক, সর্ব্ববিদ্যায় পারদর্শী, কলিযুগের ব্রহ্মদেব” [সভাসদ বখর]। তাঁহার বিরুদ্ধে তর্ক করিতে পারে এমন শক্তি বা সাহস মহারাষ্ট্রে তখন কোন ব্রাহ্মণের ছিল না। সুতরাং শাস্ত্রীয় তর্কে পরাস্ত হইবার ভয়ে এবং মোটা দক্ষিণার লোভে সকলেই শিবাজীর ক্ষত্রিয়ত্ব স্বীকার করিল।
