ডিণ্ডোরীর যুদ্ধের ফলে ইহার পর এক মাসেরও অধিক কাল মুঘল শক্তি নিস্তেজ হইয়া রহিল। দাউদ খাঁ আহত সৈন্যদের লইয়া নাসিকে এবং পরে আহমদনগরে গিয়া বিশ্রাম করিলেন। কিন্তু এই বৎসরের শেষে (১৬৭০) তাঁহাকে আবার এখানে আসিতে হইল।
প্রথমবার বেরার ও বগলানা লুঠ
সুরত-লুঠের পর মারাঠারা দেড়মাস নিশ্চেষ্ট ছিল। কিন্তু ১৬৭০ সালের ডিসেম্বরের প্রথমে শিবাজী আবার সসৈন্য বাহির হইলেন; পথে চাণ্ডোর গিরিশ্রেণীতে অহিবন্ত ও অন্যান্য কয়েকটি উচু পাহাড়ী দুর্গ জয় করিয়া তিনি বগলানার মধ্য দিয়া দ্রুতবেগে খান্দেশ প্রদেশে ঢুকিলে এবং তাঁহার রাজধানী ব্বুর্হানপুর শহরের বাহিরের গ্রামগুলি লুঠিলেন। তাহার পর হঠাৎ পূর্ব্বদিকে ফিরিয়া উর্ব্বর ও ধনশালী বেরার প্রদেশ আক্রমণ করিলেন। এপর্য্যন্ত মারাঠারা এতদূর আসে নাই, কাজেই বেরারের কেহই এই বিপদের জন্য প্রস্তুত ছিল না। শিবাজী অবাধে মনের সুখে কারিঞ্জা নামক খুব সমৃদ্ধিশালী শহর হইতে এক কোটি টাক মূল্যের ধনরত্ন, অলঙ্কার ও মুল্যবান কাপড় লইলেন। লুঠের জিনিস চারি হাজার বলদ ও গাধার পিঠে বোঝাই করিয়া এবং শহরের সমস্ত ধনী লোককে[২] টাকা আদায়ের জন্য বন্দী করিয়া শিবাজী বেয়ারে অন্যান্য শহরে চলিলেন, এবং সেখানে অগাধ ধন লুঠিলেন। সর্ব্বত্র লোকেরা ভয়ে শিবাজীকে লিখিয়া দিল যে, তাহারা বৎসর বৎসর তাঁহাকে চৌৎ, অর্থাৎ বাদশাহী খাজানার এক-চতুর্থাংশ, কর দিবে।
মুঘলেরা উপযুক্ত কোনই বাধা দিতে পারিল না। বেরারের বাদশাহী সুবাদার অলস ধীর নবাবী চালে চলেন, আর খান্দেশের সুবাদার এবং কুমার মুয়জ্জমের মধ্যে এমন ঝগড়া ছিল যে যুদ্ধ বাধে আর কি!
শিবাজী স্বয়ং যখন বেরারে যান তখন আর একদল মারাঠা সৈন্য পেশোয়া মোরো ত্র্যম্বকের অধীনে পশ্চিম-খান্দেশ লুঠিতে থাকে। এখন শিবাজী ফিরিয়া আবার বগলানায় আসিলে, এই দল তাঁহার সহিত যোগ দিয়া বিখ্যাত সালের-দুর্গ জয় করিল (৫ই জানুয়ারি ১৬৭১), এবং মুলের, ধোডপ প্রভৃতি অন্যান্য বড় পার্ব্বত্য দুর্গ অবরোধ করিল, গ্রাম লুঠিল, শস্য চলাচল বন্ধ করিল। ফলতঃ এই অঞ্চলে মুঘলেরা অতিষ্ঠ হইয়া উঠিল, অথচ তাহাদের আত্মরক্ষার মত বল বা বড় নেতা কেহ নাই।
শিবাজী ও ত্রিশাল বুন্দেলার সাক্ষাৎ
১৬৭০ সালের শেষভাগে যখন এই-সব যুদ্ধ চলিতেছিল,তখন বিখ্যাত বুন্দেলা রাজা চম্পৎ রায়ের পুত্র ছত্রশাল শিবাজীর সঙ্গে দেখা করিতে আসিলেন। ইনিই পরে পান্না-রাজ্য এবং ছত্রপুর শহর প্রতিষ্ঠা করিয়া, দীর্ঘকাল রাজদ্ধের পর ১৭৩৯ সালে মারা যান। কিন্তু এ সময় তিনি তরুণ যুবক মাত্র এবং পাক্ষিণাত্যে মুঘল সৈন্যদলে অল্প বেতনের মনসবদার। এরূপ চাকরিতে অসন্তুষ্ট হইয়া ছত্রশাল একদিন শিকারের ভাণ করিয়া সস্ত্রীক মুঘল-শিবির হইতে বাহির হইয়া পড়িলেন, এবং ঘোরা পথ দিয়া মহারাষ্ট্রে পৌঁছিয়া শিবাজীর অধীনে বাদশাহর সঙ্গে যুদ্ধ করিবার জন্য সেনাপতির পদ চাহিলেন। কিন্তু শিবাজী দক্ষিণী ভিন্ন ভারতের অন্য প্রদেশের লোককে বিশ্বাস করিতেন না অথবা উচ্চপদ দিতেন না। তিনি ছত্রশালকে এই বলিয়া ফেরত পাঠাইয়া দিলেন—“বীরবর। যাও, নিজ দেশ অধিকার করিয়া তথায় রাজ্য স্থাপন কর, আর শত্রু জয় কর। তোমার পক্ষে সেখানে গিয়া যুদ্ধ আরম্ভ করাই শ্রেয়, কারণ তোমার বংশের খ্যাতির জন্য অনেকে তোমার সঙ্গে যোগ দিবে। যদি মুঘলেরা তোমাকে আক্রমণ করিতে আসে, আমি এদিক হইতে তাহাদের উপর গিয়া পডিব; এবং এইরূপে দুই শত্রুর মধ্যে পড়িয়া তাহারা সহজেই পরাস্ত হইবে।” ছত্রশাল ক্ষুণ্নমনে ফিরিয়া আসিলেন।[৩]
শিবাজীর বগলানা অধিকার
সমস্ত ১৬৭০ সাল ধরিয়া শিবাজীর আশ্চর্য্য তেজ ও ক্ষিপ্র গতিবিধি, নানাক্ষেত্রে জয়লাভ, এবং অতি দূর দূর প্রদেশ লুঠ করা দেখিয়া বাদশাহ আওরংজীব বড়ই চিন্তিত হইলেন। প্রথমতঃ তিনি মহাবৎ খাঁকে দাক্ষিণাত্যের প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করিলেন, এবং তাহার সঙ্গে দাউদ খাঁকে রাখিয়া দিলেন। নিজ জাতভাই এবং অন্যান্য অনেক রাজপুত-সেনাসহ রাজা অমর সিংহ চন্দাবৎকে বিস্তর টাকা,গোলাবারুদ ও রসদ দিয়া মহারাষ্ট্রে পাঠান হইল।
মহাবৎ খাঁ ১০ই জানুয়ারি ১৬৭১ আওয়ঙ্গাবাদে পৌঁছিয়া কিছুদিন পরে চাণ্ডোর জেলায় গেলেন, অমনি কিন্তু সহকারী দাউদ খাঁর সহিত তাঁহার ঝগড়া বাধিয়া গেল। তিন মাসে মুঘলেরা এখানে প্রায় কিছুই করিতে পারি না। শিবাজী ধোড়প-দুর্গ অবরোধ করিয়া বিফল হইয়াছিলেন বটে (ডিসেম্বরের শেষ), কিন্তু পরের মাসে সালের দুর্গ জয় করিলেন। মার্চ্চ মাসের প্রথমে দাউদ খাঁ মারাঠাদের হাত হইতে অহিবন্ত গড় কাড়িয়া লইলেন। তাঁহার এই গৌরবে মহাবৎ খাঁ ঈর্ষায় ক্ষেপিয়া গেলেন। তাহার পর আর যুদ্ধ করা হইল না। প্রধান সেনাপতি সৈন্যসহ নাসিক এবং পরে পার্নের নগরে ছয় মাস ধরিয়া বিশ্রাম করিতে এবং বাঈজীদের নাচ দেখিতে লাগিল।
এইসব নিয়া বাদশাহ বিরক্ত হইয়া অক্টোবর ১৬৭১ সালে বাহাদুর খাঁ ও দিলির খাঁকে গুজরাত হইতে মহারাষ্ট্রে পাঠাইলেন। এই দুই বিখ্যাত সেনাপতি সালের-দুর্গ অবরোধ করিবার জন্যই ইখ্লাস খাঁ মিয়ানা, রাজা অমর সিংহ চন্দাবৎ এবং অন্য কর্ম্মচারীদের রাখিয়া, নিজেরা আহমদনগর হইয়া পুণা জেলা আক্রমণ করিলেন। দিলির খাঁ পুণা দখল করিয়া নয় বৎসরের কম বয়স্ক বালক ছাড়া আর-সব লোককে হত্যা করিলেন (ডিসেম্বর)। কিন্তু ইহার এক মাস পরেই মুঘলদের এক ভীষণ পরাজয় হইল। বগলানায় তাহাদের যে দল সালের-দুর্গ অবরোধ করিয়া বসিয়াছিল, ১৬৭২ জানুয়ারির শেষে প্রধান সেনাপতি প্রতাপ রাও, দ্বিতীয় সেনাপতি আনন্দ রাও এবং পেশোয়া মোরো ত্র্যম্বক অসংখ্য সৈন্য লইয়া হঠাৎ আসিয়া সেই মুঘলদলকে আক্রমণ করিলেন; তাহারা প্রাণপণ লড়িল, কিন্তু সংখ্যায় কম বলিয়া পারিয়া উঠিল না। রাজা অমর সিংহ এবং অন্যান্য অনেক সেনাপতি এবং হাজার হাজার সাধারণ সিপাহী মারা গেল, আর অমর সিংহের পুত্র মুহকম্ সিংহ, ইখ্লাস খাঁ এবং ৩০ জন প্রধান কর্ম্মচারী আহত ও বন্দী হইল; তাহাদের সময় মালপত্র ও তোপ মারাঠারা লইয়া গেল।
