সম্ভবত অন্য সবার মতো আমারও হলে ছেড়ে দেওয়া উচিত ছিল, বলা উচিত ছিল যেহেতু শিক্ষা মন্ত্রণালয় কখনও-ই স্বীকার করেনি যে প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে, উল্টো সবাইকে উপদেশ দেওয়া হয়েছে গুজবে কান না দিতে। যারা গুজব ছড়াচ্ছে তাদেরকে শাস্তি দেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে (সেই হিসেবে আমি হয়তো রাষ্ট্রের চোখে শান্তি-শৃঙ্খলা নষ্ট করার দোষে দোষী একজন মানুষ)। আমার হয়তো লম্বা লম্বা কয়েকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ডিজিটাল বাংলাদেশ জাতীয় বড় বড় কোনো বিষয় নিয়ে মাথা ঘামানো উচিত ছিল।
কিন্তু যতবার আমি এই দেশের ছেলেমেয়েদের কথা ভাবি, যারা অন্যায়কে প্রশ্রয় না দিয়ে সত্যিকার ছাত্র বা ছাত্রীর মতো লেখাপড়া করে নিজের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করছে, ততবার আমার মনে হয় কিছুতেই এই বিষয়টা ভুলে যেতে দেওয়া যাবে না। আমাকে চেষ্টা করতে হবে যেন কর্তৃপক্ষ আগে হোক পরে হোক, এই বিষয়টার দিকে নজর দেয়।
এটি মোটেও এমন একটি বিষয় নয় যে অল্প কিছু দুর্নীতিবাজ মানুষ তাদের অল্প কয়জন দুর্নীতিবাজ ছেলেমেয়েদের একটা সুযোগ করে দিয়েছে। লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থীর তুলনায় তাদের সংখ্যা এত কম যে এই বিষয়টা উপেক্ষা করলেও সত্যিকার অর্থে দেশের এমন কিছু ক্ষতি হবে না। এটি মোটেও তা নয়।
আজকাল বাংলাদেশের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ছাত্রছাত্রীর ফেসবুক অ্যাকাউন্ট আছে। তারা এই ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে চোখের পলকে ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্নপত্র নামিয়ে আনছে। নামিয়ে আনার পর একে অন্যকে পৌঁছে দিচ্ছে। যাদের কম্পিউটার, ইন্টারনেট নেই, তাদের ফ্যাক্স, ফটোকপি আছে। কাজেই লক্ষ লক্ষ ছেলেমেয়ের হাতে এগুলো পৌঁছে গেছে। এটি উপেক্ষা করা যায় সে রকম একটি সমস্যা নয়। এটি এই দেশের লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রীর জীবনে সর্বনাশ ডেকে আনছে সে রকম একটি সমস্যা।
আমি এই লেখাটি লিখছি মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্যে। আমাদের দেশে যে কয়জন মন্ত্রী সাধারণ মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন তিনি তাদের একজন। জনপ্রিয় মন্ত্রীদের নিয়ে যখনই জরিপ করা হয় তিনি তখন সবার উপরে থাকেন। তার কারণও আছে। স্কুল-কলেজের লেখাপড়া নিয়ে তাঁর আগ্রহ আছে। বছরের প্রথম দিনে তাঁর কারণে বাংলাদেশের সব ছেলেমেয়ে হাতে নূতন বই পেয়ে যায়।
শুধুমাত্র বইয়ের সংখ্যা দেখলে পৃথিবীর যে কোনো মানুষের মাথা ঘুরে যাবে। বইগুলি একটার পর আরেকটা রাখা হলে সারা পৃথিবী দুইবার ঘুরে আসা যাবে– বাচ্চাদের অনুপ্রাণিত করার জন্যে আমি সুযোগ পেলেই তাদের এই কথাটা বলে অবাক করে দিয়েছি।
আমি মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে প্রত্যন্ত অঞ্চলে কলেজ উদ্বোধন করতে গিয়েছি। সমাবর্তন বক্তা হিসেবে আমি তাঁর পাশে বসে ছাত্রছাত্রীদের ডিগ্রি পেতে দেখেছি। ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে সঙ্গে আমিও তাঁর কথা শুনে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শিখেছি। কাজেই প্রশ্ন ফাঁসের ব্যাপারটা তাঁর নজরে আনা হলে তিনি কিছু একটা করবেন না, আমি সেটা বিশ্বাস করি না।
তাই আমি অনেক আশা করে এই লেখাটি লিখছি। আমি আশা করছি তিনি কষ্ট করে হলেও এই লেখাটুকু পড়েন।
আমি তাঁর কাছে বেশি কিছু চাই না, ছোট একটা বিষয় চাই। তিনি শুধুমাত্র একটা সত্যি কথা বলবেন, জাতিকে জানাবেন, এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় একটা বিপর্যয় ঘটে গেছে, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে গেছে। আমি চাই এই দেশের ছেলেমেয়েরা অন্যায়কে অন্যায় হিসেবে জানতে শিখুক, অপরাধকে অপরাধ হিসেবে স্বীকার করে নিতে শিখুক। তার বেশি কিছু নয়।
একটা দেশের পুরো প্রজন্মকে যদি আমরা অনৈতিক হিসেবে গড়ে তুলি তাহলে সেই দেশকে নিয়ে আমরা কী করব?
যদি মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যাবার ঘটনাটি মেনে নেন, তাহলে যারা প্রশ্ন ফাঁস করেছে তাদেরকে ধরার চেষ্টা করা যাবে। আমি এই দেশের একটা সত্যি কথা জানি, যদি কোনো অপরাধীকে ধরার ইচ্ছে থাকে তাহলে তাদের ধরা যায়। যেসব অপরাধীদের ধরা যায় না তাদেরকে আসলে ধরার চেষ্টা করা হয় না।
আমরা আশা করব এই ঘটনার তদন্ত হবে, অপরাধীদের ধরা হবে, তাদের শাস্তি হবে। ভবিষ্যতে যেন আর কখনও এ ধরনের ঘটনা না ঘটে সেটি নিশ্চিত করা হবে। আমি জানি এটি করা সম্ভব।
২.
এমনটি কি হতে পারে যে এই লেখটি মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর চোখে পড়ল না? কিংবা তাঁর চাইতেও দুঃখজনক একটা ব্যাপার ঘটল, লেখাটি তাঁর চোখে পড়ল, কিন্তু তার পরেও তিনি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনাটা স্বীকার করলেন না, তাহলে আমরা কী করব?
অন্যেরা কী করবে জানি না, কিন্তু আমি কী করব মনে মনে ঠিক করে রেখেছি। তাহলে আমি শহীদ মিনার কিংবা এ রকম কোনো একটা জায়গায় খবরের কাগজ বিছিয়ে বসে থাকব। হাতে একটা প্ল্যাকার্ড রাখব। সেখানে লিখব, “প্রশ্ন ফাঁস মানি না, মানব না। আমাদের ছেলেমেয়েদের অসৎ হতে দেব না।”
তাতে কি কোনো লাভ হবে? সম্ভবত হবে না। যখন এই দেশের ছেলেমেয়েরা ক্ষুব্ধ চোখে আমাকে বলবে, ‘‘স্যার, আমরা এ কেমন দেশে বাস করি? কেন এত বড় অন্যায় আমাদের মেনে নিতে হবে?”
আমি তখন অন্তত তাদের চোখের দিকে তাকিয়ে বলব, “তোমরা আমাকে ক্ষমা কর, আমি কিন্তু চেষ্টা করেছিলাম।”
২০ মে, ২০১৪
মিথ্যা বলার অধিকার (আগস্ট ১৫, ২০১৩)
গত কিছুদিনে আমি একটা বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছি। একটি দেশের মানুষের যেরকম খাদ্য, বাসস্থান এবং শিক্ষার অধিকার থাকে, আমাদের দেশে তার সাথে একটা নতুন বিষয় যোগ হতে যাচ্ছে, সেটা হচ্ছে মিথ্যা কথা বলার অধিকার। এই দেশের মানুষ যেন চাইলেই মিথ্যা কথা বলতে পারে এবং সেই মিথ্যা কথা বলার জন্যে দেশে অন্য কারো যত বড় সর্বনাশই হোক না কেন যিনি মিথ্যা কথা বলছেন তিনি যেন নিরাপদে মিথ্যা বলতে পারেন সে জন্যে এই দেশের পত্রপত্রিকা মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান জ্ঞানী গুণী মানুষজন সবাই একত্র হয়ে গেছেন। কেউ যেন মনে না করে আমি বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলছি সে জন্যে আমি জলজ্যান্ত কয়েকটি উদাহরণ দিই।
