আমার ধারণা, আওয়ামী লীগের বড় বড় নেতা সংবাদপত্রের এই ‘বাড়াবাড়ি’ দেখে খুব বিরক্ত হচ্ছেন, দেশে প্রতিদিন শত শত খুন হচ্ছে, ক্রসফায়ার হচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ মানুষ গুম হয়ে যাচ্ছে, তার মধ্যে একজন ছাপোষা দরজির মৃত্যু নিয়ে এত হইচই করার কী অর্থ? অনেকে নিশ্চয়ই এটাকে দেখছেন পরবর্তী নির্বাচনে তাদের বিজয়ের সম্ভাবনাকে কমিয়ে আনার একটা সুগভীর ষড়যন্ত্র হিসেবে। সত্য কথাটি হচ্ছে, সম্ভবত সত্যিই আওয়ামী লীগ যেন কিছুতেই পরের নির্বাচনে জিততে না পারে, কিংবা এই মুহূর্তেই যেন তাদের দুর্বল আর বিপর্যস্ত দেখায়, সে জন্য একটা গভীর ষড়যন্ত্র হচ্ছে এবং সেই ষড়যন্ত্রটি করছে বিশ্বজিৎ হত্যাকারী ছাত্রলীগ এবং এই ঘটনাকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টারত আওয়ামী লীগের নেতা, মন্ত্রী, পুলিশ ও আমলারা। এই বিষয়টি যত তাড়াতাড়ি তারা বুঝতে পারবে, দেশের জন্য তত মঙ্গল। আমরা খুব দ্রুত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দেখতে চাই। এই দেশকে গ্লানিমুক্ত করতে চাই।
আমি নিজেকে বিশ্বজিতের আপনজনের জায়গায় বসিয়ে পুরো বিষয়টি কল্পনা করার চেষ্টা করে বুঝতে পেরেছি, তাদের পৃথিবীর কোনো মানুষ কোনো দিন সান্ত্বনা দিতে পারবে না। মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তে বিশ্বজিতের মনের ভেতর কী চিন্তা কাজ করেছিল, আমরা কোনো দিন সেটি জানতে পারব না। তার উদ্ভ্রান্ত ব্যাকুল দৃষ্টি দেখে সেটা শুধু হয়তো কল্পনা করতে পারব। পবিত্র কোরআন শরিফে আছে (৫.৩২) বিনা কারণে যদি কখনো কোনো মানুষকে হত্যা করা হয় তাহলে মনে করা যায় যেন পুরো মানবজাতিকেই হত্যা করা হলো। এ ব্যাপারে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই, আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমিতে ডিসেম্বরের ৯ তারিখ সকাল নয়টার সময় পুরান ঢাকায় আমরা সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করেছি।
আমি জানি এই তীব্র অপরাধবোধ থেকে আমাদের মুক্তি নেই। সত্যি যদি কোনোভাবে সান্ত্বনা খুঁজে পেতে চাই তাহলে কোরআন শরিফের সেই অংশেই পরের লাইনে ফিরে যেতে হবে, যেখানে বলা হয়েছে, যদি কেউ একজনের প্রাণ রক্ষা করে তাহলে সে যেন পুরো মানবজাতির প্রাণ রক্ষা করল।
আমরা কি মুক্তিযুদ্ধের রক্তস্নাত এই মাতৃভূমিতে সমগ্র মানবজাতিকে রক্ষা করার নিশ্চয়তা দেব?
সূত্র: http://www.sadasidhekotha.com/article.php?date=2012-12-20
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা
কয়েক বছর আগে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে এসে একটা ছেলে গাড়ি এক্সিডেন্টে মারা গিয়েছিল। আমি এই ঘটনার কথা কিছুতেই ভুলতে পারি না। শুধু মনে হয় কোনো দূর এক শহর থেকে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার জন্যে এত দূরে তাকে টেনে আনার ফলেই হয়তো এত অল্প বয়সে মারা যেতে হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার নামে সবাই মিলে যে ভয়ঙ্কর একটি হৃদয়হীন পদ্ধতি দাঁড় করিয়ে রেখেছে, সেই পদ্ধতিটি কী কোনভাবে এর জন্যে দায়ী নয়? আবারও ভর্তি পরীক্ষা আসছে। আমি জানি, হাজার হাজার ছেলে-মেয়ে তাদের অভিভাবকদের নিয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার জন্যে এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরেক বিশ্ববিদ্যালয়ে পাগলের মতো ঘুরে বেড়াবে। খাওয়া ঘুম বিশ্রাম দূরে থাকুক, অনেক জায়গায় তাদের একটা বাথরুমে যাওয়ার সুযোগ পর্যন্ত থাকবে না।
অথচ এর কোন প্রয়োজন ছিল না। খুব সহজেই ছাত্রছাত্রীদের এই ভয়ঙ্কর অমানবিক ভোগান্তি থেকে মুক্তি দেওয়ার সুযোগ ছিল। বাংলাদেশের সব কয়টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় যদি রাজি হত তাহলে খুব সহজেই সবাই মিলে একটি (হ্যাঁ মাত্র একটি) চমৎকার মানসম্মত ভর্তি পরীক্ষা নিয়েই এই দেশের সব ছাত্রছাত্রীকে নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্যে বিবেচনা করতে পারত।
এই সরকার আসার পর শিক্ষা মন্ত্রনালয় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে ডেকে সম্মিলিত ভর্তি পরীক্ষার একটি উদ্যোগ নিয়েছিল। সেখানে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ভাইস চ্যান্সেলর ছিলেন এবং আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বিষয়টির সম্ভাব্যতা নিয়ে একটা বক্তব্য দিতে। আমি একটু গাধা প্রকৃতির মানুষ, তাই সরল বিশ্বাসে সকল তথ্য উপাত্ত নিয়ে হাজির হয়েছিলাম। বক্তব্য শুরু করার আগেই অবশ্য টের পেয়েছিলাম, আমার সেখানে হাজির হওয়া বড় ধরনের নির্বুদ্ধিতা হয়েছে! সেখানে বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলররা আসেন দেরি করে এবং চলে যান সবার আগে। যাবার আগে বলে যান যে, তাদের বহুল পরীক্ষিত একটা ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি চালু আছে সেটা নড়চড় করার কোনো ইচ্ছা তাদের নেই। গুরুত্বপূর্ণ ভাইস চ্যান্সেলররা বলেন যে, তারা কঠিন নিরাপত্তার মাঝে ভর্তি পরীক্ষা নেন। সবাই মিলে পরীক্ষা নিলে তাকে কে সেই নিরাপত্তার গ্যারান্টি দেবে? একজন ভাইস চ্যান্সেলর খোলাখুলি বলেই ফেললেন, তিনি যদি সম্মিলিত ভর্তি পরীক্ষার মতো একটা প্রস্তাব নিয়ে তার বিশ্ববিদ্যলয়ে ফিরে যান, তাহলে তার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তার বারোটা বাজিয়ে ছাড়বে। বেশিরভাগ ভাইস চ্যান্সেলররা অবশ্য আমার বক্তব্যের মাথামুন্ড কিছু বুঝতে পারলেন না কিংবা বোঝার চেষ্টাও করলেন না। আমার ছেলেমানুষী বক্তব্য শুনে হতাশভাবে মাথা নাড়তে থাকলেন।
শেষ পর্যন্ত কিছুই হলো না, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজের মতো করে ভর্তি পরীক্ষা নিতে থাকল। আমার ধারণা বিষয়টা আরো খারাপ হলো। বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মনে হয় প্রায় রাগ করেই ছোট ছোট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্যে নির্ধারিত পরীক্ষার দিনগুলোতে ইচ্ছেমতো তাদের ভর্তি পরীক্ষার তারিখ ফেলতে লাগল। এতে বাধ্য হয়েই ছোট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শেষ মুহুর্তে তাদের পরীক্ষার তারিখ পাল্টালো। আমি জানি আমাদের পরপর দুই বছর কুয়েট (খুলনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়) -এর সাথে একই দিন পরীক্ষা নিতে হয়েছে। যে সব ছেলেমেয়েদের এই দুটি বিশ্ববিদ্যালয়েই পরীক্ষা দেয়ার আগ্রহ ছিল তারা মন খারাপ করে, ক্ষুদ্ধ হয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশা ছেড়ে অন্য একটিতেই পরীক্ষা দিতে বাধ্য হলো।
