আমি যে রূপ দেখে অভ্যস্ত, দীর্ঘদিন পর এই দেশটির রূপ আমাদের নতুন প্রজন্ম নতুন করে দেখার সুযোগ পেয়েছে। যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার বিচারের রায় কার্যকর করার পর প্রথমে তাদের একজন মন্ত্রী প্রতিবাদ করেছে, তারপর তাদের পার্লামেন্ট থেকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব নিয়েছে। নিন্দা প্রস্তাবের সময় আলোচনার বিষয়বস্তু অত্যন্ত চমকপ্রদ। তারা জোর গলায় বলেছে, কাদের মোল্লা হচ্ছে একজন ‘সাচ্চা পাকিস্তানী’ একাত্তরে সাচ্চা পাকিস্তানী থাকার জন্যেই তাকে ফাঁসি দেয়া হয়েছে। শাহবাগের তরুণ ছেলেমেয়েরা দিনের পর দিন এই কথাটি বলে শ্লোগান দিয়েছে: জামাতে ইসলাম: মেড ইন পাকিস্তান। যাদের মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছিল জামাতে ইসলাম একাত্তরে এই দেশে কী করেছিল, এখন তাদের কারো ভেতরে কী আর কোনো সন্দেহ আছে?
পাকিস্তান থেকে বক্তব্য দেয়ার সময় তারা ইনিয়ে-বিনিয়ে বলেছে একাত্তরে “ঢাকা পতন” হওয়ার এতোদিন পর সেই পুরানো “ক্ষত” নতুন করে উন্মোচন করার কোনো প্রয়োজন নেই। আমার “ঢাকা পতন” কথাটি নিয়ে আপত্তি আছে, একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর মোটেও ঢাকার পতন হয়নি, পাকিস্তানের পতন হয়েছিল। ঢাকা কিংবা বাংলাদেশের সেদিন উত্থান হয়েছিল। “ক্ষত” কথাটি নিয়েও আমার গুরুতর আপত্তি আছে, এটি আমাদের জন্য ক্ষত নয়, এটি পাকিস্তানের জন্য “ক্ষত”—শুধু ক্ষত নয় এটি হচ্ছে দগদগে ঘা, চল্লিশ বছরে সেই ঘা শুকায়নি, শত বছরেও সেই ঘা শুকাবে না। পৃথিবীর ইতিহাসে পাকিস্তানকে পরাজয়ের এই দগদগে ঘা নিয়ে আজীবন বেঁচে থাকতে হবে। মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, গণহত্যা এবং সবশেষে পরাজয়ের এই দগদগে ঘা তাদের অবশ্যই লুকিয়ে রাখতে হবে, কিন্তু আমাদের কেন সেটি লুকিয়ে রাখতে হবে? ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বরের সেই বিজয় দিবস আমাদের ক্ষত নয় সেটি আমাদের গৌরব, আমাদের অহংকার, আমরা শত সহস্রবার সেটি দেখতে চাই। তাই প্রত্যেক বছর এই বিজয় দিবস আমাদের কাছে আগের চাইতেও বেশি উদ্দীপনা নিয়ে ফিরে আসে।
পাকিস্তানের সাথে আমার কোনো যোগাযোগ নেই, যদি থাকতো তাহলে অবশ্যই আমি তাদের কিছু উপদেশ দিতাম। আমি তাদের বলতাম, তোমরা তোমাদের দগদগে ক্ষত দেখতে চাও না, খুব ভালো কথা, তোমরা চোখ বন্ধ করে থেকো। কিন্তু আমরা কী করব সেটি নিয়ে ধৃষ্টতা দেখাতে এসো না। ১৯৭১ সালে এই দেশ থেকে তোমাদের বিতাড়ন করে আমরা অনেক দূর এগিয়ে এসেছি, অনেক বিষয়ে আমরা সারা পৃথিবীর মডেল। একটু ধৈর্য ধর—যখন দেখবে আমরা ঠিক ঠিক ভাবে যুদ্ধাপরাধীর বিচার করে রায় কার্যকর করে সারা পৃথিবীকে দেখাব, কীভাবে সেটি করা যায়, তখন সেটিও সারা পৃথিবীর একটা মডেল হয়ে যাবে। আপাতত তোমরা নিজেদের নিয়ে মাথা ঘামাও। মিলিটারীর বি-টিম হয়ে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো যা করছে সেখান থেকে বের হতে পার কী না দেখো। লেখাপড়া করতে চাইলে মেয়েদের মাথায় গুলি যেন করতে না পারে সেটা খেয়াল করো। সারা পৃথিবীতে সন্ত্রাস রপ্তানি করার যে সুনামটুকু কুড়িয়েছ সেই সুনাম থেকে মুক্ত হতে পার কীনা দেখো।
পাকিস্তানের সাথে আমার কোনো যোগাযোগ নেই যদি থাকতো তাহলে এই তালিকাটি আমি আরো দীর্ঘ করে দিতাম!
কাদের মোল্লার পক্ষে বাংলাদেশের বিপক্ষে পাকিস্তান রাষ্ট্রীয়ভাবে যে নিন্দা প্রস্তাবটি নিয়েছে সেটি আমার কাছে এই রাষ্ট্রটির সাথে মানানসই একটি কাজ বলে মনে হয়েছে। এই দেশে তাদের যে অনুচরেরা আছে তাদের চেহারাটি মনে হয় বেশ ভালোভাবে উন্মোচন করা হয়েছে। আমাদের নতুন প্রজন্ম এর মাঝে ভয়ানকভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে—আমি ঠিক এ ধরনের প্রতিক্রিয়াই আশা করেছিলাম। তারা আমাকে নিরাশ করেনি।
৪.
১৬ ডিসেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লক্ষ মানুুষের মাঝে দাঁড়িয়ে আমি বিকাল ৪টা ৩১ মিনিটে জাতীয় সঙ্গীত গেয়েছিলাম। সৃষ্টিকর্তা আমার গলায় কোনো সুর দেননি, আমার মাঝে মাঝে সেজন্য খুব দুঃখ হয়। আমার মনে হয়, যদি আমার গলায় একটু সুর থাকতো তাহলে ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি আমি না জানি কতো সুন্দর করে গাইতে পারতাম। যতো বেসুরো গলাতেই গাই না কেন এই গানের চরণগুলো উচ্চারণ করার সময় প্রতিবার আমার চোখ ভিজে আসে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বেসুরো গলায় আমি যখন গানটি গাইছিলাম তখন একটি একটি করে চরণ গাওয়া হচ্ছিল। আর আমার মনে হচ্ছিল, ‘আহা আরো একটি লাইন শেষ হয়ে গেল! আমার মনে হচ্ছিল, আহা! যদি অনন্তকাল এই গানটি গাওয়া যেতো! যদি কোনোদিন এই গানটি শেষ না হতো।
জাতীয় সঙ্গীত শেষ হবার পর সাবধানে আমি আমার চোখ মুছেছি। আমাদের প্রজন্মের কাছে এটি তো শুধু একটি সঙ্গীত নয়, এটি আমাদের অস্তিত্ব, এটি আমাদের দুঃখ কষ্ট বেদনা। আমাদের আনন্দ আমাদের উল্লাস।
আমার পাশে কমবয়সী একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। জাতীয় সঙ্গীত শেষ হবার পর আমাকে বলল, “স্যার, জানেন, যতবার আমি আমার সোনার বাংলা গান গাই আমার চোখে পানি চলে আসে!”
আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমাদের নতুন প্রজন্ম কেমন করে আমাদের সকল স্বপ্ন, আমাদের সকল ভালোবাসা সকল মমতাকে এমনভাবে গ্রহণ করতে পারল?
গ্লানিমুক্ত বাংলাদেশ (জুলাই ১৭, ২০১৩)
গত সোমবার যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের বিচারের রায় হওয়ার পর পুরো দেশে আশাভঙ্গের একটি দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শোনা গেছে। তরুণ প্রজন্মের প্রতিক্রিয়াটি ছিল সবচেয়ে তীব্র। প্রথমে ক্রোধ, তারপর ক্ষোভ আর দুঃখ এবং সব শেষে হতাশা। আমার সঙ্গে পরিচয় আছে এ রকম অনেকের সঙ্গে ফোনে কথা বলে তাদের সান্ত্বনা দিতে হয়েছে, উৎসাহ দিতে হয়েছে।
