আমার এই দীর্ঘ জীবনে আমি অনেক মানুষকে দেখেছি, অনেকের সঙ্গে আমার কাজ করার সুযোগ হয়েছে, সবাইকে নিয়ে আমি অনেক কিছু করেছি। আমার এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে আমি খুব সোজাসাপ্টা একটা বিষয় আবিষ্কার করেছি; সেটি হচ্ছে পৃথিবীর মানুষ দুই রকম! এক ধরনের মানুষের সবকিছুতে উৎসাহ, সবসময়ই তারা নতুন কিছু করার জন্যে ব্যস্ত। সবসময়ই তারা কিছু না কিছু করছে, একশ’টা জিনিস করতে গিয়ে তারা অনেক সময়েই ঘোট পাকিয়ে ফেলছে, সমস্যায় পড়ে যাচ্ছে– তারপরও তাদের উৎসাহের কোনো অভাব নেই। অন্য ধরনের মানুষের কোনো কিছুতে উৎসাহ নেই, তারা নিস্পৃহ, তাদের তাপ-উত্তাপ নেই। তারা নতুন কিছু করে না, তাই তাদের জীবনে ভুলও হয় না। তাদের নিস্তরঙ্গ জীবনে উত্তেজনা নেই, উচ্ছ্বাস নেই।
আমি তোমাদের আরও একটি সত্যের সন্ধান দিয়ে যাই– এই পৃথিবী, দেশ কিংবা সমাজটাকে চালায় প্রথম গোষ্ঠী যাদের সবকিছুতে উৎসাহ! পৃথিবীর যত বড় কাজ সব করেছে এই উৎসাহী প্রজন্ম। তোমাদের ভেতর যারা এই উৎসাহীদের দলে আমি জানি তোমাদের অতিউৎসাহের কারণে অনেক সময় তোমাদের ক্ষতি হয়েছে, অনেক গুরুজন তোমাদের নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে নিষেধ করেছেন, ভূল সিদ্ধান্ত নিয়ে তোমরা অনেকবার বিপদে পড়েছ।
আমি তোমাদের আশ্বস্ত করতে চাই, দেখবে তোমরাই কিন্তু সবকিছুতে নেতৃত্ব দেবে, তোমার অঙ্গুলিহেলনে সবাই তোমাদের পিছনে এসে দাঁড়াবে। তোমাদের ভিতর যারা উৎসাহকে রাশ টেনে নামিয়ে সতর্কভাবে পা ফেলেছে, উৎসাহী বন্ধুদের একশ রকম কাজ দেখে বিরক্ত হচ্ছে, সমালোচনা করেছে তাদেরকে বলে রাখি– এই উৎসাহটুকুই কিন্তু সফল আর অসফল মানুষের মাঝখানে বিভাজন। তোমরা ঠিক কর মাপা উৎসাহ নিয়ে বিভাজনের নিচে দাঁড়াবে নাকি তীব্র উৎসাহের বান ডাকিয়ে বিভাজনের উপরে গিয়ে দাঁড়াবে।
আজ তোমাদের একটি ছাত্রজীবনের সমাপ্তি হয়েছে। মেধার মূল্যায়ন করতে গিয়ে তোমাদেরকে অসংখ্যবার পরীক্ষা দিতে হয়েছে, সেই পরীক্ষায় তুমি তোমার সহপাঠীর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমেছ, সেই প্রতিযোগিতায় তোমরা কেউ কেউ তোমাদের সহপাঠীদের পেছনে ফেলে এগিয়ে গিয়েছ।
আমি তোমাদের মনে করিয়ে দিতে চাই সত্যিকারের জীবন কিন্তু প্রতিযোগিতার জীবন নয়। যেখানে কিন্তু কাউকে ঠেলে পেছনে ফেলে তোমায় এগিয়ে যেতে হবে না। সত্যিকারের জীবন হচ্ছে সহযোগিতার। সত্যিকার জীবনে তুমি যখন সত্যিকারের কাজ করবে তখন একে অন্যের সঙ্গে পাশাপাশি থেকে সাহায্য করবে। সেখানে কোনো প্রতিযোগিতা নেই।
প্রতিযোগিতা শুধু একটি জায়গায় থাকে– সেটি হচ্ছে নিজের সঙ্গে প্রতিযোগিতা। তুমি এখন যা, দেখি তুমি এক বছর পর সেখান থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে আরও অনেক দূর এগিয়ে যেতে পার কিনা।
তোমরা এই দেশের নতুন একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়ে যাচ্ছ, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মশালটি এখন তোমাদের হাতে। তোমরা কর্মজীবনে কী কর তার উপর নির্ভর করবে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম। তাই তোমাদের আকাশছোঁয়া স্বপ্ন দেখতে হবে। বড় স্বপ্ন না দেখলে বড় কিছু অর্জন করা যায় না!
এই দেশটি তরুণদের দেশ। বায়ান্ন সালে তরুণেরা এই দেশে মাতৃভাষার জন্যে আন্দোলন করেছে, রক্ত দিয়েছে, একাত্তরে সেই তরুণেরাই মাতৃভূমির জন্যে যুদ্ধ করেছে, অকাতরে রক্ত দিয়েছে। আমাদের দেশটি এখন যখন পৃথিবীর বুকে মাথা তুলে দাঁড়াতে যাচ্ছে আবার সেই তরুণেরাই সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখবে। তোমরা সেই তরুণদের প্রতিনিধি– তোমাদের দেখে আমি অনুপ্রাণিত হই, আমি ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখি।
তোমাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা– ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখার জন্যে আমাকে নতুন একটা সুযোগ করে দেওয়ার জন্যে!
আগস্ট ২, ২০১৩
গ্লানি মুক্তির বাংলাদেশ
গত সপ্তাহটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি সপ্তাহ। একাত্তরের এই সপ্তাহে বাংলাদেশকে মুক্ত করার যুদ্ধটি শুরু হয়েছে। আকাশে যুদ্ধ বিমান, বোমা পড়ছে, শেলিং হচ্ছে, গুলির শব্দ। আকাশ থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর উদ্দেশ্যে হ্যান্ডবিল বিলি করা হচ্ছে, ভারতীয় বাহিনী সেখানে লিখেছে, মুক্তিবাহিনীর হাত থেকে রক্ষা পেতে হলে আমাদের কাছে আত্মসমর্পণ কর। আমরা বুঝতে পারছি আমাদের বিজয়ের মুহূর্তটি চলে আসছে, তারপরেও বুকের ভেতর শংকা, আমেরিকার সপ্তম নৌবহর পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে বঙ্গোপসাগর দিয়ে এগিয়ে আসছে। গত নয় মাসে এই দেশে কতো মায়ের বুক খালি হয়েছে তার হিসাব নেই। মানুষের প্রাণের কোনো মূল্য নেই। যখন খুশী যাকে ইচ্ছা তাকে নির্যাতন করা যায়, হত্যা করা যায়। চারদিকে শুধু মৃতদেহ আর মৃতদেহ। আগুনে পোড়া ঘরবাড়ি। বিধ্বস্ত জনপদ, মানুষের হাহাকার। তার মাঝে জায়ামাতে ইসলামীর তৈরি করা বদর বাহিনী খুঁজে খুঁজে এই দেশের কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিক্ষক ও ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারদের বাড়ি থেকে তুলে নিচ্ছে। তারা অত্যাচার করছে, চোখের ডাক্তারের চোখ তুলে নিচ্ছে, হূদরোগের ডাক্তারদের হূিপণ্ড বের করে আনছে, তারপর হত্যা করে মৃতদেহ ছুঁড়ে ফেলছে। দেশটি যেন কোনোদিন মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে তারা সেটি নিশ্চিত করতে চায়।
সেই হত্যাকারীদের বিচার করে বিচারের রায় হয়েছে। প্রথম রায় কার্যকর হয়েছে সেই একই সপ্তাহে, ডিসেম্বরের ১২ তারিখ। আমি ৪২ বছর থেকে এই দিনটির জন্য অপেক্ষা করেছিলাম। শুধু আমি নই, আমার মত স্বজন হারানো অসংখ্য মানুষ অপেক্ষা করেছিল। মুক্তিযোদ্ধারা অপেক্ষা করেছিল, নির্যাতিতেরা অপেক্ষা করেছিল। মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের মানুষেরা অপেক্ষা করেছিল, আর অপেক্ষা করেছিল এই দেশের নতুন প্রজন্ম। আমাদের প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্ম, আমরা মুক্তিযুদ্ধকে তীব্র আবেগ দিয়ে অনুভব করি, আমি কখনো কল্পনা করিনি এই দেশের নতুন প্রজন্মও মুক্তিযুদ্ধকে ঠিক আমাদের মতই তীব্রভাবে অনুভব করবে। তাদের জন্মের আগে ঘটে যাওয়া মুক্তিযুদ্ধের সেই অবর্ণনীয় কষ্ট আর অকল্পনীয় আনন্দ তারা এতো তীব্রভাবে অনুভব করতে পারে সেটি আমাদের জন্য এক অবিশ্বাস্য স্বপ্ন পূরণ।
