ছোটাচ্চু মুখটা সুচালো করে খানিকক্ষণ চিন্তা করে বলল, একটা কাজ করা যায়।
কী কাজ?
অপরাধীকে আরেকবার ক্রাইম করার সুযোগ করে দেওয়া যাক। এবার যখন ক্রাইম করবে, তখন হাতেনাতে ধরা হবে।
বড় মামা এতক্ষণ কোনো কথা না বলে চুপচাপ শুনে যাচিছল, এবার বলল, এটা অনৈতিক কাজ। একজন মানুষকে অপরাধ করতে প্ররোচনা দেওয়া অপরাধ করার মতোই অন্যায়-
বড় মামি বলল, রাখো তোমার নীতিকথা! আমাদের সোনা গয়না মোবাইল মানিব্যাগ হাওয়া হয়ে যাচ্ছে আর তোমার বড় বড় কথা।
এই বাসায় যখনই বড়রা কথা বলে তখন সব সময়ই আশপাশে বেশ কিছু বাচ্চাকাচ্চা থাকে। এখানেও তারা আছে আর গভীর মনোযোগ দিয়ে সব কথা শুনছে। সবচেয়ে মনোযোগ দিয়ে শুনছে টুনি। এখানে যে বাচ্চাকাচ্চা আছে তারা সবাই ঝুমু খালার ভক্ত, কেউ চিন্তাই করতে পারে না যে ঝুমু খালার মতো মানুষ এ রকম কাজ করতে পারে। হঠাৎ করে ছোটাচ্চুর খেয়াল হলো বেশ কিছু বাচ্চাকাচ্চা তার কথা শুনছে, সাথে সাথে খুব ব্যস্ত হয়ে ছোটাচ্চু সবাইকে ঘর থেকে বের করে দিল, বলল, যা ভাগ। ভাগ এখান থেকে।
একজন আপত্তি করে বলল, কেন? ভাগতে হবে কেন?
ছোটাচ্চু হুংকার দিয়ে বলল, আবার মুখে মুখে তর্ক করে? বের হ বলছি।
কাজেই বাচ্চাকাচ্চাদের বের হয়ে আসতে হলো, তারা খুব মনমরা হয়ে হেঁটে যাচ্ছিল, তখন একজন বলল, ঝুমু খালাকে সাবধান করে দিতে হবে।
টুনি বলল, কোনো দরকার নাই।
সবাই একসাথে টুনির দিকে তাকাল, বলল, কেন?
ঝুমু খালা মোটেও এইগুলো চুরি করে নাই।
তাহলে কে করেছে?
টুনি উত্তরটা জানে না, তাই চুপ করে রইল। ত্যাঁদড় টাইপ জিজ্ঞেস করল, তুই কেমন করে জানিস ঝুমু খালা চুরি করে নাই।
ঝুমু খালার অনেক বুদ্ধি। বুদ্ধিমান মানুষ বোকার মতো চুরি করে না।
তাহলে কে চুরি করেছে?
চুরি করেছে বাইরের কেউ।
বাইরের কেউ বাসার ভেতরে কেমন করে ঢুকেছে?
টুনি কোনো কথা না বলে নিঃশব্দে হাঁটতে থাকে। বাইরের কেউ বাসার ভেতরে কেমন করে ঢুকেছে সে জানে না। হয়তো ঢোকেনি। বাসার ভেতরে ঢুকেই কীভাবে বাসার ভেতরের জিনিস চুরি করে নেওয়া যায়, টুনি সেটা এখনো চিন্তা করে বের করতে পারল না। সে অবশ্য চিন্তা করা থামাল না, চিন্তা করতে লাগল। টুনি জানে ছোটাচ্চু এটা বের করতে পারবে না, তাকেই এটা বের করতে হবে।
ছোটাচ্চু চোরকে হাতেনাতে ধরার জন্য খুব গোপনে একটা ব্যবস্থা নিল। তার মোটা কলমের মতো ভিডিও ক্যামেরাটা নানির ঘরের জানালার সাথে বেঁধে দিল। বাঁধল অনেক উঁচুতে যেন ঘরের ভেতরে কেউ থাকলে সেটা সহজে চোখে না পড়ে। নানির বিছানার কাছে টেবিলে বেশ কিছু লোভনীয় জিনিস ছড়িয়ে রাখা হলো। লোভনীয় জিনিসগুলো হলো কিছু টাকা, একটা মোবাইল ফোন এবং একটা গলার হার। হারটা দেখে সোনার মনে হলেও এটা আসলে ইমিটেশন, চোরের পক্ষে সেটা জানার কোনো উপায় নেই। ছোটাচ্চু তার ডিটেকটিভ এজেন্সির পুরো কাজটা করল খুব গোপনে, যেন কেউ সেটা টের না পায়। কিন্তু বাচ্চারা সবাই সেটা জেনে গেল কিন্তু সবাই ভান করল তারা জানে না। বাসার বড় মানুষদের শান্ত রাখার জন্য তাদের সবারই মাঝে মাঝে এ রকম কিছু করতে হয়। বড় মানুষদের নানা কাজকর্ম দেখেও না দেখার ভান করতে হয়, বুঝেও না বোঝার ভান করতে হয়।
ছোটাচ্চু মোটামুটি নিঃসন্দেহ ছিল পরদিন ভোরের মধ্যে চোরের সব কাজকর্ম ভিডিও ক্যামেরায় ধরা পড়ে যাবে। এভাবে হাতেনাতে ধরা পড়ার পর চোরকে শায়েস্তা করার কাজটা হবে পানির মতো সোজা।
ছোটাচ্চু কখনোই ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠতে পারে না কিন্তু পরদিন সে অ্যালার্ম ছাড়াই ঘুম থেকে উঠে পড়ল। ঘুম থেকে উঠেই সে নানির ঘরে ছুটে এল, বিছানার কাছে টেবিলে টাকা, মোবাইল ফোন কিংবা ইমিটেশন সোনার হার কেউ ধরে দেখেনি, সেটা যেখানে ছিল সেটা সেখানেই আছে। ঘরের মাঝখানে টুনি দাঁড়িয়েছিল, সে আঙুল দিয়ে জানালার ওপরে দেখিয়ে বলল, নিয়ে গেছে।
কী নিয়ে গেছে?
তোমার ভিডিও ক্যামেরা।
ছোটাচ্চু চমকে উঠল, জানালার দিকে তাকিয়ে বলল, কে নিয়েছে?
মনে হয় চোর।
ছোটাচ্চু প্রায় হাহাকার করে বলল, আ-আ-আমার এত দামি ভিডিও ক্যামেরা নিয়ে গেছে?
টুনি কোনো কথা বলল না, সে অপ্রয়োজনীয় কথা বলে না। ছোটাচ্চু তখন আরও জোরে হাহাকার করে বলল, কেমন করে নিল?
টুনি এবার উত্তর দিল, বলল, তুমি চেয়ারের ওপর একটা মোড়া রেখে তার ওপর দাঁড়িয়ে তোমার ভিডিও ক্যামেরা ফিট করেছিলে।
তু-তুই কেমন করে জানিস?
সবাই জানে। তোমরা মনে করো তোমরা কী কর সেটা ছোটরা জানে। ছোটরা সবকিছু জানে। এই বাসার বড় মানুষেরা একটু হাবা টাইপের।
হ-হাবা টাইপের?
টুনি এই প্রশ্নের উত্তর দিল না, বলল, তুমি অনেক উঁচুতে ভিডিও ক্যামেরাটা লাগিয়েছ, সেটা খুলে নিতে হলে চোরটাকে অন্তত আট ফুট লম্বা হতে হবে। এই বাসায় আট ফুট লম্বা কোনো মানুষ নাই, বাইরে থেকে এই বাসায় কোনো মানুষ ঢুকে নাই।
তাহলে?
টুনি বলল, তুমি ডিটেকটিভ, তুমি বের করো।
এ রকম সময় নানি ঘরে ঢুকলেন, তার ঘরে এত কিছু হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু সেটা নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা আছে বলে মনে হলো না। নানি এদিক সেদিক কিছু একটা খুঁজতে লাগলেন। ছোটাচ্চু জিজ্ঞেস করল, কী খুঁজছ, মা।
আমার পানের বাটা।
নানিকে একজন খুব ছোট—প্রায় সিগারেটের বাক্সের সাইজের একটা পানের বাটা এনে দিয়েছিল। নানি বাইরে কোথাও গেলে সেটাতে পান সুপারি ভরে ব্যাগে করে নিয়ে যান। মনে হলো নানি সেটা খুঁজে পাচ্ছেন না।
