ছোটাচ্চু জিজ্ঞেস করল, কোথায় রেখেছিলে? নানি বললেন, এই তো। এইখানে, জানালার কাছে।
খুঁজে দেখা গেল জানালার কাছে কিছু নেই। টুনি গম্ভীর গলায় বলল, চোর টাকা, মোবাইল কিংবা সোনার হার নেয় নাই কিন্তু নানির পানের বাটা নিয়ে গেছে।
ছোটাচ্চু কোনো উত্তর না দিয়ে কেমন যেন ভ্যাবাচেকা খেয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার দামি ভিডিও ক্যামেরাটার দুঃখ সে এখনো ভুলতে পারছে না। টুনি কিছুক্ষণ ছোটাচ্চুর দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ছোটাচ্চু।
কী হলো?
কী হচ্ছে তুমি বুঝতে পারছ?
না। কী হচ্ছে?
টুনি হতাশভাবে মাথা নেড়ে বলল, কী হচ্ছে দেখতে পাচ্ছ না? জানালার কাছে কিছু থাকলেই সেটা চুরি হচ্ছে। নানির পানের বাটা, তোমার ভিডিও ক্যামেরা, মেজো চাচির কানের দুল, ছোট খালার মোবাইল টেলিফোন, বড় মামার মানিব্যাগ, এর প্রত্যেকটা ছিল জানালার কাছে। তার অর্থ জানালার বাইরে থেকে কেউ এগুলো নিচ্ছে।
ছোটাচ্চু মুখ খিচিয়ে বলল, গাধার মতো কথা বলিস না। জানালার ওই পাশে দাঁড়ানোর জায়গা আছে? খাড়া দেয়াল!
টুনি মাথায় টোকা দিয়ে বলল, ব্রেনটাকে ব্যবহার করো। থিংক। থিংক। থিংক। ডিটেকটিভদের চিন্তা করতে হয়। তোমার সমস্যা হলো, তুমি চিন্তা করো না।
ছোটাচ্চু আরও রেগে গিয়ে বলল, বড় বড় কথা বলিস না। ভাগ এখান থেকে।
কাজেই টুনি সরে পড়ল।
দিনটা ছুটির দিন ছিল, তাই বাচ্চারা ঘুম থেকে উঠে হাত-মুখ ধুয়ে নাশতা করেই বাসা থেকে বের হয়ে গেল হাজি গুলজার খানের বাসায় মেলা দেখতে। আজকের মেলা খুবই জমেছে। রনপা লাগিয়ে দশ ফুট উঁচু একজন মানুষ ঘুরে বেড়াচ্ছে, তার হাতে লজেন্স, ছোট বাচ্চারা গেলেই ওপর থেকে তাদের দিকে লজেন্স ছুঁড়ে দিচ্ছে। ছোট ছোট কিছু কুকুরের খেলার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কুকুরগুলো একটা ছোট ড্রামের ওপর দাঁড়িয়ে ড্রামটাকে গড়িয়ে গড়িয়ে নিচ্ছে, ভারি মজা দেখতে। মাঠের এক কোনায় পর্দা দিয়ে ঢেকে একটা জায়গায় নর রাক্ষসের আসর করা হয়েছে। প্রতি ঘণ্টায় একবার করে নররাক্ষস এসে জ্যান্ত হাঁস-মুরগি-ছাগল খেয়ে ফেলে, তখন তাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা যায় না। এখানে ছোট বাচ্চাদের ঢোকা নিষেধ, তাই তারা বাইরে ঘোরাঘুরি করছে। সাপের খেলার সাথে এখন একটা বেজি আনা হয়েছে। বেজি আর সাপ একে অন্যের সাথে মারামারি করে-রীতিমতো ভয়ংকর দৃশ্য। বানরের খেলা তো আছেই।
বাচ্চারা ঘুরে ঘুরে সব খেলা দেখছে, টুনি ছাড়া। সে সেই সকাল থেকে বানরওয়ালার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সে ধৈর্য ধরে বানরের খেলা দেখেই যাচ্ছে বারবার একই খেলা। টুনি অপেক্ষা করে থাকে খেলার শেষটা দেখার জন্য। তখন বানরটা সন্ত্রাসী গডফাদার হয়ে মোবাইল ফোন দিয়ে ফোন করে। টুনি তখন তীক্ষ দৃষ্টিতে মোবাইল ফোনটা লক্ষ করে। বানরওয়ালা তার ঝোলার ভেতরে হাত ঢুকিয়ে একেকবার একেকটা ফোন বের করে দেয়। এই বানরওয়ালার কাছে অনেকগুলো মোবাইল ফোন। টুনি বানরওয়ালার ঝোলাটা লক্ষ করল, লাল রঙের একটা ঝোলা। এক টুকরা লাল সালুর চারকোনা বেঁধে একটা ঝোলা তৈরি করা হয়েছে। এই ঝোলার ভেতরে শুধু মোবাইল ফোন না, মনে হয় আরো অনেক কিছু আছে।
টুনি, দশ টাকা ধার দিবি? গলার স্বর শুনে টুনি ঘুরে তাকাল, ত্যাঁদড় টাইপ তার কাছে টাকা ধার চাইতে এসেছে। তার চোখে-মুখে উত্তেজনা। অনেকগুলো বাচ্চাকাচ্চা বলে এখন পর্যন্ত টুনি ছাড়া অন্য কারও নাম বলা হয়নি, এখন মনে হয় ত্যাঁদড় টাইপের নামটা বলা যায়। তার নাম হচ্ছে শান্ত, যদিও নামকরণটি একেবারেই ঠিক হয়নি। দুর্দান্ত হলে ঠিক হতো, অন্ততপক্ষে অশান্ত হওয়া উচিত ছিল। শান্ত টুনির থেকে দুই বছরের বড় কিন্তু তার বাড়ন্ত শরীর দেখে তাকে আরও বড় মনে হয়।
শান্ত টুনির কাছে মুখ এনে বলল, দিবি? কালকেই ফেরত দিয়ে দেব।
শান্তকে টাকা ধার দিয়ে এখন পর্যন্ত কেউ কোনো টাকা ফেরত পায়নি কিন্তু টুনি শান্তকে সেটা মনে করিয়ে দিল না। জিজ্ঞেস করল, কী জন্য?
নররাক্ষসের খেলা দেখব। বাচ্চাকাচ্চাদের ঢোকা নিষেধ তাই আমাকে ঢুকতে দিচ্ছে না। গেটে যে মানুষটা আছে তার সাথে কথা বলেছি। দশ টাকা ঘুষ দিলে আমাকে ঢুকতে দেবে।
শান্তকে কেউ কখনো টাকা ধার দেয় না, দেওয়া উচিত না কিন্তু টুনি তার পকেট থেকে দুইটা দশ টাকার নোট বের করে বলল, আমি তোমাকে দশ টাকা না, পুরো বিশ টাকা দেব। ধারও না, একেবারে দিয়ে দেব। এই টাকা তোমার ফেরত দিতে হবে না। কিন্তু তোমাকে একটা কাজ করে দিতে হবে।
শান্তর চোখ চকচক করে উঠল, কী কাজ?
সেটা তোমাকে একটু পরে বলব। ঠিক আছে?
শান্ত মাথা নাড়ল, ঠিক আছে। কী কাজ তার জানার প্রয়োজন নেই। দশ টাকার জন্য সে যেকোনো কাজ করতে রাজি আছে। এর অর্ধেক টাকা বাজি ধরে সে একবার একজনের জুতার তলা চেটে দিয়েছিল।
টুনি শান্তকে দশ টাকার একটা নোট দিল, বলল, দশ টাকা। অ্যাডভান্স। কাজ শেষ হলে বাকি দশ টাকা।
কী করতে হবে বল।
একটু পরে বলব, তুমি এখন নররাক্ষসের খেলা দেখে এসো।
শান্ত দশ টাকার নোটটা হাতে নিয়ে নররাক্ষসের খেলা দেখতে ছুটে গেল, টুনি রওনা দিল বাসার দিকে। কী করবে সেটা ঠিক করে ফেলেছে। এখন সবকিছু ভালয় ভালয় শেষ করতে পারলে হয়।
বাসার সিঁড়িতে টুনির সাথে ঝুমু খালার দেখা হলো। সে সিঁড়িতে গালে হাত দিয়ে বসে আছে। মুখ দেখে মনে হলো একটু আগে হয়তো কেঁদেছে। টুনি জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে ঝুমু খালা?
