ত্যাঁদড় টাইপের ছেলেটা হাঁ করে ঝুমু খালার দিকে তাকিয়ে রইল, একজন মানুষ যে এ রকম আজগুবি একটা গল্প এ রকম বিশ্বাসযোগ্য করে বলতে পারে, সে নিজের কানে না শুনলে বিশ্বাস করত না। আমতা আমতা করে বলল, ভূতের বাচ্চাটা এখনো জেলির বোতলে আছে?
ঝুমু খালা মাথা নাড়ল, হ্যাঁ। আছে।
আমাকে দেখাবা?
দিনের বেলা তো দেখানো যায় না। রাতে দেখতে হয়।
রাতে দেখাবা?
ঝুমু খালা তখন চিন্তিত মুখ করে বলল, দেখি! তোমরা ছোট পোলাপান। ভয় পেয়ে প্যান্টে পিশাব করে দিলে ঝামেলা।
ত্যাঁদড় টাইপের ছেলেটা মুখ কালো করে ফিরে এল, সে যথেষ্ট বড় হয়েছে, এই বয়সে সে প্যান্টে পেশাব করে দেবে সে জন্য তাকে ভূতের বাচ্চা দেখানো যাবে না, বিষয়টা তার পক্ষে হজম করা খুব কঠিন।
দেখা গেল ঝুমু খালা যে শুধু বানিয়ে বানিয়ে ভয়ংকর আজগুবি গল্প বিশ্বাসযোগ্যভাবে বলতে পারে তা না, এলাচি-দারুচিনি দিয়ে পায়েসের মতো একধরনের চা বানাতে পারে, খুব অল্প তেল দিয়ে অসাধারণ পরোটা বানাতে পারে, লাল মরিচ দিয়ে ঝাল করে চ্যাপা শুটকির ভর্তা বানাতে পারে। তার সবচেয়ে বড় প্রতিভা হচ্ছে স্বপ্নের অর্থ বলে দেওয়া—হাতি স্বপ্ন দেখলে কী হয়, জাহাজ স্বপ্ন দেখলে কী হয়, এমনকি তেঁতুলগাছে বাদুড় বসে আছে স্বপ্ন দেখলে কী হয়, সেটাও বলে দিতে পারে। ছোট বাচ্চাকাচ্চারা তাকে খুব পছন্দ করল, বড়রা আগে বাচ্চাদের দিয়ে যে কাজগুলো করাতে পারেনি, ঝুমু খালা প্রথম চব্বিশ ঘণ্টার মাঝেই সেটা করিয়ে ফেলল। নানি (কিংবা দাদি) জোবেদা খানমও তাকে খুব পছন্দ করলেন, কারণ দিনের কাজ শেষ করে ঝুমু খালা নানির পায়ের কাছে বসে তার পায়ে ঝাঁজালো সরিষার তেল মাখিয়ে মালিশ করতে করতে টেলিভিশনে সিরিয়াল দেখতে লাগল এবং সিরিয়ালের বিভিন্ন চরিত্রের সমালোচনা করতে লাগল। সমালোচনাগুলো বেশির ভাগই নানির সাথে মিলে গেল বলে নানি খুব খুশি।
ঝুমু খালা নানির কাছে মাত্র এক সপ্তাহ থাকার অনুমতি চেয়েছিল। এর মাঝে বাড়ি থেকে লোক এসে তাকে নিয়ে যাবে। সবাই মিলে ঝুমু খালাকে হয়তো পাকাঁপাকিভাবে রেখেই দিত কিন্তু একদিন পরেই তাকে বিদায় করে দেওয়ার প্রস্তুতি নিতে হলো, তার কারণ ঝুমু খালা যেদিন এসেছে, সেদিনই বড় মামার মানিব্যাগ, মেজো চাচির এক জোড়া কানের দুল আর ছোট খালার একটা মোবাইল ফোন চুরি হয়ে গেল। এই বাসায় বাইরের কোনো মানুষ আসে না, কাজেই কোনো কিছু চুরি হলে বাসার ভেতরের কাউকেই চুরি করতে হবে। মানুষটা ঝুমু খালা ছাড়া অন্য কেউ হতে পারে না—শুধু সে ই এই বাসার নতুন মানুষ।
চুরির খবরটা শোনার পর বাসার সবার খুব মন খারাপ হলো। এ রকম কমবয়সী হাসিখুশি একজন মেয়ে দেখে বোঝাই যায় না তার এ রকম একটা অভ্যাস রয়েছে, সেটা মেনে নেওয়া খুবই কঠিন।
যখন ঝুমু খালা আশপাশে নেই তখন বড় মামা বলল, এত চমৎকার মসলা চা বানায় অথচ চুরির অভ্যাসটা ছাড়তে পারল না।
মেজো চাচির এক জোড়া কানের দুল গিয়েছে, তাই তার খুব মেজাজ খারাপ। মেজো চাচি বলল, একে তো বিদায় করেই দিতে হবে। কিন্তু বিদায় করার আগে আমার কানের দুল জোড়া উদ্ধার করে দেবে না?
মেজো চাচা মাথা চুলকে বলল, কেমন করে? জিনিসপত্র সার্চ করলেই বের হয়ে যাবে।
বড় মামা বলল, শুধু সন্দেহের বশে একজনের জিনিসপত্র সার্চ করা যায় না। এতে মানুষকে অসম্মান করা হয়।
অসম্মান? মেজো চাচি বলল, যে চুরি করতে পারে তাকে সম্মান করতে হবে?
বড় মামা দার্শনিকের মতো একটা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, সবাইকে সব সময় সম্মান করতে হয়। তা ছাড়া আমরা তো হান্ড্রেড পার্সেন্ট শিওর যে ঝুমুই চুরি করেছে।
আর কে করবে? জানালার ওই পাশে খাড়া দেয়াল, বাইরে থেকে কেউ নিতে পারবে না। নিতে হলে ভেতরের কাউকে নিতে হবে। ভেতরে ঝুমু ছাড়া আর কে আছে?
বড় মামা মাথা নাড়ল, বলল, তবু তো আমরা নিশ্চিত না। যদি হাতেনাতে ধরা যেত তাহলে একটা কথা ছিল।
তখন সবাই একসাথে ছোটাচ্চুর দিকে তাকাল, সবার একসাথে মনে পড়ল যে ছোটাচ্চুর একটা ডিটেকটিভ এজেন্সি আছে। মেজো চাচি ছোটাচ্চুকে বলল, তোমার না এত বড় ডিটেকটিভ এজেন্সি। এই চোরকে হাতেনাতে ধরে দাও।
ছোটাচ্চু মাথা চুলকে বলল, আঁ, আঁ, আঁ—
ছোট খালার পুরানো মোবাইল ফোনটা গিয়েছে, সে একটু খুশিই হয়েছে, নতুন আরেকটা স্মার্টফোন কিনতে পারবে, কিন্তু চুরি হওয়া ফোনে সবার টেলিফোন নম্বর ছিল, সেটাই হয়েছে সমস্যা। তাই ছোট খালা বলল, হ্যাঁ। আমার মোবাইলটা উদ্ধার করে দাও। তোমাকে একটা পুরস্কার দেব।
ছোট চাচা আবার মাথা চুলকে বলল, ইয়ে মানে হয়েছে কী– কিন্তু কী হয়েছে সেটা আর বলল না।
ছোট খালা তখন জানতে চাইল, কী হয়েছে?
মানে- ছোট চাচা ইতস্তত করে বলল, হাতেনাতে ধরতে হলে ক্রাইমটা যখন ঘটে তখন থাকতে হয়। কিন্তু ক্রাইমটা তো ঘটে গেছে এখন তো আর হাতেনাতে ধরার সুযোগ নাই।
মেজো চাচি ঠোঁট উল্টে বলল, তাহলে তুমি কিসের ডিটেকটিভ হলে?
ছোটাচ্চু মাথা চুলকে বলল, ডিটেকটিভের কাজ হচ্ছে অপরাধীকে ধরা। এই কেসে সেটা তো ধরাই হয়ে গেছে। কাজেই আমার তো কোনো কাজ নাই।
মেজো চাচি বলল, কোথায় অপরাধীকে ধরা হয়েছে? আমি একটু আগে দেখেছি ঝুমু হি হি করে হাসতে হাসতে আনন্দে গড়াগড়ি খাচ্ছে। ওকে ঠিক করে ধরতে হবে। দরকার হলে পুলিশে দিতে হবে।
